উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল তখন রমেশ ভান্ডারী| আমি প্রায়ই তখন লখনউ যেতাম| রাজীব গাঁধীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি| দিল্লিতে গুজরাল প্রধানমন্ত্রী| উত্তরপ্রদেশে এক টালমাটাল অবস্থা| আর রমেশ ভান্ডারী রাজভবনে বসে নানা রকম প্যাঁচ কষছেন| রাজভবনের ভেতর ছিল বিশাল লন| সেখানে তিনি গল্ফ কোর্স বানিয়েছিলেন| মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংহ সরকারের পতন হল| সংখ্যা না থাকা সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন কংগ্রেস নেতা জগদম্বিকা পালকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের জন্য ডাকেন| এক দিনের জন্য তিনি কুর্সিতে বসেন| তার পর রাজ্যপাল সে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের জন্য সুপারিশ করেন|

ব্যস! তার পর কী হয়েছিল হয়তো প্রবীণ মানুষজনের মনে আছে! বিজেপি রাজ্যপালের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল| দিল্লির রাজপথে নেমে পড়ল বিজেপি| অটলবিহারী বাজপেয়ী অনশনে বসলেন| আডবাণী-সহ সব শীর্ষনেতা রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে ধর্নায় বসলেন| রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ গণতন্ত্রকে হত্যা করছে| রাজ্যপাল বিরোধী অভিযান চলছে| তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত| তিনিও রাজ্যপালের সুপারিশ মানলেন না| শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন হল না| কল্যাণ সিংহ আবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন! সে দিন বাজপেয়ী বললেন, জয় হল গণতন্ত্রের! আর আজ আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! এ বার বিজেপি শাসক দল। বাজপেয়ী বা আডবাণী নয়, এখন নেতা হলেন নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ! এখন কংগ্রেস কর্নাটকে রাজ্যপালের ভূমিকার বিরুদ্ধে! শাসক দল বিজেপি যেন তেন প্রকারেণ অন্য দল ভেঙে ইয়েদুরাপ্পাকেই মুখ্যমন্ত্রী বানাতে চাইছেন! আরএসএস নেতা মোদী ঘনিষ্ঠ গুজরাতি রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সোচ্চার কংগ্রেস!

আজকাল রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে খুব একটা তফাৎ অনুভব করি না| মনে হয়, রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থা মূলত দু’ভাগে বিভক্ত| শাসক দল আর বিরোধী দল| বিরোধী দল গণতন্ত্রের কথা বলে! আর শাসক দল বলে, তারা যা করছে সেটাই নাকি কৌটিল্য করতে বলে গিয়েছেন| সরোজিনী নাইডু বলেছিলেন, ভারতীয় রাজনীতিতে রাজ্যপাল হলেন এক সোনার খাঁচায় থাকা পাখি! কিন্তু ইন্দিরা গাঁধীর সময় থেকে রাজ্যপালের ভূমিকা অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে| এমনকী মনমোহন সিংহের সময়েও হংসলাল ভরদ্বাজ রাজ্যপাল হয়ে যে অবস্থান নেন তারও সমালোচনা হয়| এই কর্নাটকে দেবগৌড়ার সরকার নিয়ে কংগ্রেস রাজ্যপাল কি করেছিলেন তার সমালোচনাও করতেই হবে| কিন্তু আজ বিজেপি যা করছে গতকাল কংগ্রেস তাই করেছে বলে সমর্থনযোগ্য হয় না! বরং বলব, বিজেপি বলেছিল তারা আলাদা! পার্টি উইথ ডিফারেন্সেস! আজ বিজেপি যা করছে সেটা দেখে বিজেপি-কে কি আলাদা বলে মনে হয়?

মোদী-শাহ জুটি অপরাজেয়, এই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়ে দিল কর্নাটক। ফাইল চিত্র।

কর্নাটকে বিজেপির শেষরক্ষা না হওয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহর হল। আমার মনে হয়, ২০১৪-র পর থেকে এই যে ধারণা হয়েছিল, মোদী এবং অমিত শাহ, এই দ্বৈত শক্তি অপরাজেয়। অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সেই চলতি ধারণায় এ এক মস্ত বড় ধাক্কা। মোদী জনপ্রিয় নেতা। এ কথা আজও আমি বলব দ্বিধাহীন ভাবেই। কিন্তু ২০১৪ সালের জনপ্রিয়তা কি ২০১৮ সালের শেষবেলায় আছে? তা যে নেই সে-ও তো বড় কঠিন কঠোর সত্য। জিনিসপত্রের দাম কমছে না। চাকরিবাকরি নেই। উন্নয়ন নেই। শিলায়ন অদৃশ্য। বিদেশি বিনিয়োগের ছবিটি দুঃখজনক। কৃষক আত্মহত্যা হচ্ছে আজও। নোটস্থগিত-জিএসটির ফলে ক্ষুব্ধ দোকানদার, ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা বিজেপিরও জনপ্রিয় বৈশ্যভোট। তা হলে কি মোদী কোনও ভাল কাজই করেননি? নিশ্চয়ই করেছেন। ক্ষমতায় এসে দ্রুত প্রকল্প রূপায়ণের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ সরকারেও লাল ফিতের বাঁধন ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে আজ। মোদীর শক্তিশালী ‘হিন্দুহৃদয় সম্রাট’-এর ভাবমূর্তির পাশাপাশি আমরা জানতাম, অমিত শাহ হলেন নরেন্দ্র মোদীর চিফ অপারেটিং অফিসার, যাকে বলা হয় সিওও। অমিত শাহ মানেই ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট। তিনি হলেন এ যুগের কৌটিল্য, যেন তেন প্রকারেণ জেতাই তাঁর ধর্ম। তিনি হারতে শেখেননি। হারতে ভালবাসেন না তিনি। কর্নাটককের পরাজয় সেই গৌরবকেও ভূলুণ্ঠিত করল।

অবিজেপি আঞ্চলিক দলগুলি কর্নাটকের পর এই কারণেই আরও আশান্বিত হয়ে একত্রিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তেলুগু দেশম এবং কংগ্রেসের মধ্যে বিরোধ যা-ই থাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে রাজ্যস্তরে বিবাদ যা-ই থাক, অখিলেশ ও মায়াবতীর মতোই এই রাজ্যস্তরের স্ববিরোধী শক্তিগুলি মোদী হঠাও অভিযানে একত্রিত হবেই। এমনকী এখনও এনডিএ থাকলেও কংগ্রেস-জেডি(এস) জোট বেঁধে সরকার গঠনের চেষ্টাকে সমর্থন করে শিবসেনা প্রশ্ন তোলে, গোয়ার জন্য এক রকম নির্দেশ আর কর্নাটকের জন্য রাজ্যপালের পরামর্শ অন্য রকম হবে কেন?

এ কথা বলতে পারি, ২০১৯ লোকসভা ভোট নরেন্দ্র মোদীর জন্য এর ফলে কঠিন হয়ে গেল। একে তো রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীশগঢ়ের মতো রাজ্যগুলিতে আসন্ন ভোটে বিজেপি খুব ভাল ফল করে এমনিতেই সম্পৃক্ত হয়ে বসে আছে। এ সব রাজ্যে শাসকবিরোধী জনমত এখন তীব্র।

ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এ জন্য আরও আক্রমণাত্মক হয়ে আসন সংখ্যা বাড়াতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু এ সব রাজ্যেও এগোতে সুবিধে হত যদি বিজেপি কর্নাটকে জয়লাভ করত। দক্ষিণ ও পূর্ব-ভারতে চেষ্টা যতই করুক কতটা সাফল্য বিজেপি পেতে পারে তা এখনও সংশয়াচ্ছন্ন।