আমার দাদামশাই ভূপেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এক সাচ্চা মার্কসবাদী| আমার দেখা এক আদর্শবান সৎ চিকিৎসক| হাওড়া কাসুন্দিয়া এলাকায় তিনি দু’টাকার ঠাকুর ডাক্তার বলে পরিচিত ছিলেন| মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন| নকশাল আন্দোলনের সময় হাওড়ার ওই এলাকায় নিষিদ্ধ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে| অনেক সময় নকশালপন্থী ছেলেরা চিকিৎসার জন্য আসতেন দাদামশাইয়ের কাছে| বোমা বানাতে গিয়ে বোমা ফেটে কেউ আহত হয়েছে| কেউ হয়তো পুলিশের গুলি খেয়েছে! পার্টি তখন দাদামশাইয়ের ওপর চটে যায়| পার্টি তাঁকে কারণ দর্শাতে বলেন, কেন তিনি নকশালপন্থীদের প্রোটেকশন দিচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেছেন, ওরা নকশাল হিসেবে নয়, রোগী হিসেবে আসেন আমার কাছে!

পার্টির এ ধরনের অনমনীয় মনোভাব দেখে তিনি দুঃখ পাচ্ছিলেন, কিন্তু কখনও কাউকে বলেননি! হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় আমাকে শুধু এক বার বলেছিলেন, মার্কস মানে ভাবনার অবরোধ নয়। মার্কস মানে মুক্তচিন্তা। কার্ল মার্কসের জন্মের ২০০ বছর পরেও যে ভাবে তাঁকে নিয়ে বিশ্ব জুড়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে, তা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির শক্তি কমতে কমতে আজ এক শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছলেও কার্ল মার্কসের ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু থেকেই গেছে | শুধু সমস্যা একটাই, মার্কসের ভাবনা নিয়ে কত রকমের মাতপার্থক্য! রসিকতা করে আমরা বলতাম, যত জন মার্কসবাদী তত রকমের মার্ক্সবাদ। মার্কস নিজেই দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘থ্যাঙ্ক গড! আই অ্যাম নট আ মার্কসিস্ট! মার্কসকে কি লেনিন যথাযথ ভাবে অনুসরণ করেছিলেন?

২০১৭ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ডিলেমাস অব লেনিন’ গ্রন্থে লেখক তারিক আলি দেখিয়েছেন, লেনিন নিজেও মৃত্যুর আগে শেষ দু’বছর তাঁর ভুলভ্রান্তি নিয়ে খুব ভাবছিলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল, সন্ত্রাস কি সঠিক রণকৌশল? সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে সমর্থন কি উচিত ছিল? দল ছাড়া কি রাজনীতি হয়? ১৯১৭-য় জারদের হত্যা করে ক্ষমতা দখল করা কি উচিত ছিল? আবার রোজা লুক্সেমবার্গ থেকে ট্রটস্কি যে ভাবে বলশেভিক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেন, সে সব নিয়ে আজ দলীয় স্তরে কোনও কমিউনিস্ট পার্টি খোলামনে আলোচনা করছেন না!

কলকাতায় বামেদের মিছিল। ফাইল চিত্র। 

আমরা যখন কলেজে পড়ি তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সেনা পাঠানোয় আমরা খুব হতাশ। আলোচনা শুরু হয়েছে, এ-ও কি এক নয়া সাম্রাজ্যবাদী, নয়া উপনিবেশবাদী মনোভাব নয়? এই সময় আমরা ‘অন্য চোখে’ নাম দিয়ে একটা পত্রিকা প্রকাশ করি। আমাদের বক্তব্য ছিল, আমরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করি। মার্কস তো নিজেই বলেছিলেন যে কোনও কিছুই স্থির নয়, চরম নয়। তা হলে সময়ের হাত ধরে মার্কসের দর্শন ও নতুন করে মন্থন হবে না কেন? দু’টি সংখ্যা প্রকাশের পর দেখলাম সিপিএমের এক যুবনেতা ভয়ানক চটে গেছেন। তাঁর বক্তব্য, এটা করলে ভাবনার নৈরাজ্য আসবে। এটা প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাপার।

এখন কী দেখছি? দেখছি জার্মানিতে মার্কসের গ্রামে চিন থেকে বিশাল মার্কসের মূর্তি নিয়ে সে দেশে হইচই চলছে। দুই জার্মানির মিলনের পরেও দেখুন সে দেশে মার্কস নিয়ে কত আলোচনা। বিংশ শতাব্দী থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে নিও লেফট শব্দবন্ধ নিয়ে। ইউরোপ, মূলত ফ্রান্সে আলোচনা শুরু হয়েছে ক্রিটিক্যাল থিওরি নিয়ে! দেখা যাচ্ছে, ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি খাবি খাচ্ছে, কিন্তু বামপন্থী পপুলিজম প্রতিষ্ঠিত বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলি গ্রহণ করছে। ওবামার সকলের জন্য স্বাস্থ্য যেমন বামপন্থা, সনিয়া থেকে মোদী সকলেই যে আর্থিক নীতির কথা মুখে বলেছেন তা মূলত বামপন্থা।

লন্ডনে কার্ল মার্কসের সমাধি দেখতে গেছিলাম ! হাইগেটে ইস্টার্ন সেমেটারিতে মার্কসের সমাধি ঘিরে অনেক মানুষ, অনেক টুরিস্ট, কত পুস্পস্তবক। অবাক হয়েছিলাম আজও এই উৎসাহ দেখে। মানুষ পাউন্ড দিয়ে টিকিট কেটে দেখতে আসছে বাজার অর্থনীতির বিরোধী এই মানুষের সমাধি! আমাদের দেশেও বহু মানুষ বহু কথা লিখছেন | কিন্তু আমাদের দেশের কমিউনিস্ট নেতারা কি সাহসের সঙ্গে এই কথা বলতে পারবেন, আমরা মার্কসের ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে প্রস্তুত? আমরা লেনিন স্তালিনের অন্ধ পুজো থেকে বেরিয়ে মার্কসকে আজকের দিনের প্রেক্ষিতে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাই! গতিশীলতাই তো সত্য | সে তো মার্কসেরই কথা! দুশো বছর পর সেটাই হবে মার্কসের প্রতি সেরা শ্রদ্ধার্ঘ্য|