জরুরি অবস্থার অবসানের পর থেকেই ভারতে সুপ্রিম কোর্টের সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। অনেকেই আশা প্রকাশ করতে থাকেন, বোধহয় এই অতি সক্রিয়তা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বিপদের ঘণ্টা। সংবিধান প্রণেতাগণ চেয়েছিলেন বিচার, শাসন ও আইন— এই তিনটি বিভাগের স্বাতন্ত্র্য থাকবে, আবার তিনটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্যও থাকবে। বিচারবিভাগীয় সক্রিয়তা এই ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিতে পারে এমন দুর্ভাবনা শাসক-বিরোধী, দু’পক্ষের মনেই এসেছিল।

তবু এ সবের মধ্যেও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের স্বাধিকার নিয়ে এতটাই সচেতন ছিল যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার যখন আবার কলেজিয়ামের পরিবর্তে নতুন আইন করে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা ফের শাসন ব্যবস্থার এক্তিয়ারে আনতে তত্পর হয় তখন সুপ্রিম কোর্ট আবার রে-রে করে ওঠে এবং এই আইনের সম্ভাবনাকে খারিজ করে দেয়।

কলেজিয়াম, অর্থাত্ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের একটি প্যানেলই যে বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষমতা রাখবে সেই সিদ্ধান্তেই বিচারব্যবস্থা অটল থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবী এই কলেজিয়ামেরই পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এই কলেজিয়ামের মাধ্যমে আদালতের ঐক্যকে অটুট রাখেন।

সম্প্রতি চার বিচারপতির সাংবাদিক বৈঠক এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধেই পক্ষপাতের অভিযোগ আনা এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে, কিছু মনোনীত বিচারপতির মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি বিশেষ বিশেষ মামলায় সরকারকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। রোস্টার ডিউটি দেওয়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির। এই ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ। সুপ্রিম কোর্টের এই অভূতপূর্ব ঘটনার কোনও মীমাংসা এখনও হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, কোনও মীমাংসা হওয়ারও নেই। প্রধান বিচারপতিও নিজের অবস্থান বদলে সব রোস্টার অ্যাসাইনমেন্টের খোলনলচে-তে পরিবর্তন আনছেন এমন কোনও ইঙ্গিত নেই। তবে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবী চাইছেন এই টালমাটাল পরিস্থিতির চাপে যদি কলেজিয়ামের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে নেওয়া যায়। তবে সুপ্রিম কোর্টের বহু আইনজীবীই চান না যে কলেজিয়াম প্রথা উঠে গিয়ে সরকারের হাতেই ফের ক্ষমতা এসে যাক। ন্যাশনাল জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন বিল সংসদে পাশ হয়েছে ২০১৪ সালে, তখন কিন্তু শুধু শাসক নয়, বিরোধী ও অন্য সব রাজনৈতিক দলই এই বিলকে সমর্থন করেছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্ট বিলটি খারিজ করে দেয়। মামলা করেছিল শীর্ষ আদালতের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন।

মুখোমুখি: (বাঁ দিক থেকে) বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ, বিচারপতি জাস্তি চেলমেশ্বর, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ও বিচারপতি মদন বি লোকুর। নয়াদিল্লিতে। ফাইল চিত্র।

১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গাঁধী তিন জন বিচারপতিকে সরিয়ে বিচারপতি অজিত নাথ রায়কে প্রধান বিচারপতি করেন। সুপ্রিম কোর্টের ভিতর শুধু বিচারপতি নয়, আইনজীবীদের মধ্যেও তার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়। এই প্রতিক্রিয়াই সুপ্রিম কোর্টের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্র আরও বেশি প্রশস্ত করে। সত্যি কথা বলতে কি, সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আস্থা রাখে মানুষ। আজও মানুষ বিচার চাইতে শীর্ষ আদালতের দরজাই খট্খট্ করে। মানুষ কেন শীর্ষ আদালতে যায়? প্রথমত, মানুষ তার ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্য সব শেষে এই শীর্ষ আদালতের কাছ থেকেই বিচার চায়। দ্বিতীয়ত, জনসমাজে যারা ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘু তারাও বিচার চাইতে দ্বারস্থ হয় এই সর্বোচ্চ আদালতে। তৃতীয়ত, মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হলে রাষ্ট্রের নাগরিক আজও মনে করেন আদালতই শ্রেষ্ঠ জায়গা। মনে রাখতে হবে মৌলিক অধিকারকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই আমেরিকাতেও সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। চতুর্থত, সরকারের স্বৈরাচার, আইনভঙ্গের প্রতিবাদে ব্যক্তি বা যে কোনও সামাজিক গোষ্ঠী বিচার চাইবে কোথায়? পঞ্চমত, সাধারণ মানুষ কিন্তু আজও মনে করে, শীর্ষ আদালতের কাছে থেকে ন্যায় পাওয়া যায়। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সাম পিরোজ ভারুচা বলেছিলেন, সবাই নয়, তবে শতকরা ২০ ভাগ বিচারপতি দুর্নীতিগ্রস্ত। আর এক বিচারপতি শিবরাজ পাতিল বলেছিলেন, বিচারব্যবস্থাতেও মানের কিছুটা অবনতি হয়েছে। মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক এস পি শাঠের একটি চিত্তাকর্ষক মন্তব্য আছে। তিনি বলেছিলেন, মানুষ মনে করে বিচারপতিরা হবেন সিজারের স্ত্রীর মতো। শুধু তাঁরা দুর্নীতিমুক্ত হলে চলবে না, মানুষের মনের মধ্যে তাঁদের নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকলেও চলবে না।

সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেটাই সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। পরিবেশ ও উন্নয়নের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা একটু বেশি প্রতিষ্ঠান ঘেঁষা। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনকারীরা এবং অরুন্ধতী রায় সর্দার সরোবর বাঁধের অনুমতি দেওয়ায় শীর্ষ আদালতের তীব্র সমালোচনা করেন। তাতে আদালত অবমাননার দায়ে তাঁরা অভিযুক্ত হন। আবার উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা সুপ্রিম কোর্টের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানে অসন্তুষ্ট। বাবরি মসজিদের পাশের জমিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে শিলান্যাস করতে না দেওয়ায় সঙ্ঘ পরিবার ক্ষুব্ধ। শিক্ষাবিদেরা অসন্তুষ্ট শীর্ষ আদালত শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের ব্যাপারে সরকারকে সবুজ ঝাণ্ডা কেন দেখাল (২০০২/২০০৩ সালে পাই ফাউন্ডেশন বনাম কর্নাটক)? ২০০২ সালে অরুণা রায় বনাম ভারত সরকারের মামলায় নরম হিন্দুত্বের পক্ষে আদালত রায় দিয়েছে এই অভিযোগে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ক্ষুব্ধ হয়। বালকো-কে সরকারি ক্ষেত্র থেকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মামলা হলে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে সমর্থন করে। সে জন্য বামপন্থীরা ক্ষিপ্ত হন।

তা হলে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় বিভিন্ন দলীয় ক্ষেত্রকে ক্ষুব্ধ করেছে। এটা ভাল লক্ষ্মণ। এ ক্ষেত্রে আদালত রায় দিয়েছে মূলত আইন মেনে। কখনও কখনও জনমত বা ‘পপুলিজম’-এর প্রভাবও থাকতে পারে, কিন্তু কোনও একটি দল আদালতকে সম্পূর্ণ নিজেদের তাঁবেদার বানাতে পারেনি। ঠিক যেমন ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকেও কোনও দল বা সরকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

আজ যখন আবার সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তখন মনে হচ্ছে বোধহয় গণতন্ত্রের জন্য এই নৈরাজ্যটুকু একদিক থেকে ভাল। ‘বিদ্রোহী’ বিচারপতির সাংবাদিক বৈঠক আইনত অসিদ্ধ নয়। সংবিধানে কোথাও তো লেখা নেই যে বিচারপতি সাংবাদিক বৈঠক করতে পারবেন না। কিন্তু এটা অন্যায্য। না করাই শ্রেয়। এটা প্রথা ভাঙা। কিন্তু যে অভিযোগ উঠে এসেছে তার মীমাংসাও বিশেষ জরুরি। বাইরের কোনও শক্তির নাক গলানো অনাবশ্যক, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ভিতরেই এই সমস্যাগুলির মীমাংসার চেষ্টা হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।