ক্যানিং স্ট্রিট আর ব্রাবোর্ন রোডের ক্রসিং, ধূলিধূসরিত রাজপথ। বিরাট বিরাট ত্রিপল খাটিয়ে পুরোদমে চলছে দোকানপাট। কলকাতা-হাওড়াগামী অজস্র গাড়ি আর ভিড়ের কোলাহল। ঠেলাওয়ালা আর মুটেদের চিৎকার। বহুপরিচিত এই কলকাতার বুকে লুকিয়ে থাকে কত টুকরো ছবি, আর হারানো স্মৃতি। পাশ দিয়ে বেখেয়ালে হেঁটে যাওয়া ভুলে যদি ত্রিপলের মাথা ছাড়িয়ে উঁকি দেওয়া টকটকে লাল এক তিনকোণা মিনারের উপর কখনও দৃষ্টি পড়ে, বোঝা যায় কত কিছু রোজ চোখের আড়ালে থেকে যায় আমাদের।

ইতালিয় রেনেসাঁসের সময়ের স্থাপত্যের আদলে তৈরি ইহুদিদের উপাসনালয় মাগেন ডেভিড সিনাগগ এমনই এক জায়গা। কলকাতায় ইহুদিদের হাতে গোনা কয়েকটি উপাসনাস্থলের মধ্যে অন্যতম এটি। ভারত তো বটেই, এমন সুন্দর সিনাগগ সমগ্র প্রাচ্যে দুর্লভ। একটু দূরেই পোলক স্ট্রিটে ইহুদিদের আর একটি উপাসনালয় বেথ এল সিনাগগ। সৌন্দর্য আর স্থাপত্যে এটিও অনন্য।

ব্রিটিশ শাসনকালে কলকাতা যখন বাণিজ্যনগরী হিসেবে ফুলেফেঁপে উঠেছিল সেই সময় বাগদাদি ইহুদিরা এ দেশে আসেন। বলা হয় সিরিয়ার আলেপ্পা থেকে ১৭৯৮-এ শালোম ওয়াদিয়া কোহেন নামে এক ইহুদি সুরাত হয়ে প্রথম কলকাতায় পা রাখেন। সেই শুরু।

আরও পড়ুনসাবেক চিৎপুর রোড, অধুনা রবীন্দ্র সরণি যেন স্মৃতির সরণি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ বহু ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। তবে শুধু এসেছিলেন বলাটা বোধহয় ভুল হবে। এঁরা এসেছিলেন এবং জয় করেছিলেন। রিয়াল এস্টেট, চলচ্চিত্র আর গ্ল্যামারের দুনিয়া ঝলমলে হয়ে ওঠে এঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে। শিক্ষা বা নারীদের প্রগতিশীলতাতেও এঁদের অবদান কম ছিল না। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের নামী অভিনেত্রী আরতি দেবী আসলে ছিলেন ইহুদি। তাঁর নাম ছিল রাচেল সোফাইয়ার। এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম, যিনি প্রমীলা নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম ‘মিস ইন্ডিয়া’ ছিলেন। ১৯৬৭-তে তাঁর মেয়েও ‘মিস ইন্ডিয়া’ হন। রিয়েল এস্টেট এবং কিছু কিছু ব্যবসায় ইহুদি এজরাদের সেই সময় একচেটিয়া প্রতিপত্তি ছিল। কলকাতার এজরা স্ট্রিট, মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে এজরা বিল্ডিং, চৌরঙ্গি ম্যানসন সমেত আরও বেশ কিছু বাড়ি এজরারা তৈরি করেন। এজরা স্ট্রিটের সমস্ত বাড়ির মালিক ছিলেন এজরারাই। অর্থ আর প্রতিপত্তিতে এর পরেই নাম আসে গাব্বেদের। আলিপুর চিড়িয়াখানায় গাব্বে হাউস এদেরই অবদান। নিউ মার্কেটের নাহুম, যার কেক কলকাতায় এখনও বড় প্রিয়, সেটিও ইহুদিদেরই। স্বাধীন ইজরায়েল গঠন এবং আরও নানা কারণে একসময় দলে দলে ইহুদি ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যেতে থাকেন। একসময় পাঁচ হাজারেরও বেশি ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। এখন সংখ্যাটা মেরেকেটে ২০। যে ক’জন এখনও এই শহরে, এই শহরটাকে ভালবেসে রয়ে গিয়েছেন তাঁরা কিন্তু শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, ভালবাসা। এই উদ্দেশ্যেই সময়ের ছাপ পড়ে যাওয়া মাগেন ডেভিড সিনাগগ এবং বেথেল এল-এর সংস্কার শুরু করা হয়। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সিনাগগ দু’টি খুলে দেওয়া হয়েছে।

সিনাগগের অভ্যন্তর আজও অপেক্ষা করে প্রার্থনার। ছবি: লেখিকা।

এলিয়াস ডেভিড এজরা তাঁর বাবা জোসেফ এজরার স্মৃতিতে ১৮৮৪-তে তৈরি করেন মাগেন ডেভিড সিনাগগ। দেখার মতো সুন্দর সিনাগগটি। ইতালিয় রেনেসাঁর আদলে লাল ইট দিয়ে তৈরি বহিরঙ্গ। ভিতরে ঢুকলে মনে হয় বাইরের হট্টগোল আর শব্দকে ঢেকে দিয়েছে নৈঃশব্দ্য। বহু পুরনো কোনও এক শহরের গন্ধ তার ঐতিহ্য, সাবেকিয়ানা দিয়ে যেন মুড়ে দিয়েছে সিনাগগটির প্রতিটি কোণ। উঁচু জানলা আর ছাদে লাগানো বহু রংয়ের কাচের টুকরো থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে সিনাগগের থামগুলি ঝিলমিল করছে। বিরাট হলের মাঝখানে মঞ্চের মতো উঁচু জায়গা। এখানে রাবাই, অর্থাৎ ইহুদি পুরোহিতরা বিশিষ্টদের নিয়ে দাঁড়াতেন প্রার্থনার সময়। হলের শেষ প্রান্তে গ্যালারির মতো একটি জায়গা রয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় এখানে। সিনাগগগুলির এই জায়গাটি সব থেকে সুন্দর। কারুকার্যময় কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা। এখানে রয়েছে তিনটি দরজা। এর ভিতরে রক্ষিত রয়েছে ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তোরা। ইহুদিদের ধর্মশাস্ত্রের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের সমাহার ‘তোরা’। গ্যালারিতে ওঠা গেলেও এই ঘরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয় না। এর ওপরে রয়েছে একটি হাফ ডোম বা অর্ধ গম্বুজ। ঘন নীল দেওয়ালে সাদা সোনালী তারাগুলি ভারি সুন্দর। মাঝের দরজার উপর রয়েছে ইহুদি ধর্মের প্রতীক মেনোরা বা বাতিদান আর মাগেন ডেভিড। মেনোরা-র দুই দিকে তিনটি করে মোট ছটা শাখা বা ব্রাঞ্চ থাকে। মেনোরা-র পাশে থাকে ছটি মুখের তারা। একে বলে মাগেন ডেভিড বা ইহুদি শিল্ড অব ডেভিড। এই ছয় মুখের তারার অর্থ, ঈশ্বর পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ উপর এবং নীচ— এই ছয় দিক দিয়ে ভক্তকে রক্ষা করেন। মাঝের দরজার ঠিক ওপরে রয়েছে একাধিক হিব্রু ইনস্ক্রিপশন। এরই সঙ্গে রয়েছে টেন কম্যান্ডমেন্টস বা আসেরেত হাদিব্র। ৬১৩টি নির্দেশের মধ্যে প্রথম ১০টি নির্দেশ যা ইহুদিরা পালন করে। প্রতিটি দরজার পরদাতেও টেন কম্যান্ডমেন্টস রয়েছে। সিনাগগের মূল হল থেকে উপরে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। ব্যালকনির মতো এই জায়গায় মহিলারা প্রার্থনা করতেন।

আরও পড়ুন: উইলিয়াম সিমসনের আঁকা ঝুলবারান্দার স্মৃতিচিহ্ন স্মরণ করায় ট্রাডিশনের কথা

পোলক স্ট্রিটে বেথ এল সিনাগগের জন্য ১৮৫৬-তে জমি কেনেন ডেভিড জোসেফ এজরা এবং ইজিকিয় জুডা। তৈরিও করা হয় সিনাগগটি। কিন্তু ১৮৮৫-তে মাগেন ডেভিড তৈরির পর যখন সেটাই মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় তখন এলিয়াস সালোম গাব্বে ঢেলে সাজান বেথ এল সিনাগগটি। সেই সময় এর জন্য খরচ হয়েছিল লক্ষাধিক টাকা। বেথ এল-এর মানে হল ঈশ্বরের ঘর। মার্বেলের সিঁড়ি পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে মনে হয় সার্থক নামকরণ। বিরাট হলঘরে দেখার মতো সুন্দর ঝাড়লণ্ঠন। মাগেন ডেভিডের মতোই সিঁড়ি দেওয়া মঞ্চ রাবাইদের দাঁড়ানোর জন্য। একই রকম ওপরে ব্যালকনি ঘেরা জায়গা মেয়েদের প্রার্থনা করার জন্য। কলকাতায় একসময় প্রচুর তোরা ছিল। এখন আর তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। এর মধ্যে মাত্র দু’টি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে বেথ এল সিনাগগে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি আর মুসলমানদের সম্পর্কে টানাপড়েন থাকলেও তার বিন্দুমাত্র ছাপ কোনওদিন কলকাতায় পড়েনি। এখানে সব ক’টি সিনাগগ দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন মুসলমানরা। এমনকি, তোরা যে ঘরে রক্ষিত আছে সেখানেও ঢুকতে পারেন এঁরা। প্রার্থনার সময় ইহুদিরা টুপির মতো যে আবরণ দিয়ে মাথা ঢাকেন সেই কিপা নিজেরা তো পড়েনই, যাঁরা সিনাগগগুলি দেখতে আসেন তাঁরা মাথায় রেখেছেন কি না সে দিকেও কড়া নজর থাকে এঁদের। জুয়িশ গার্লস স্কুলেও মুসলিম মেয়েরাই পড়ে এখন।

ইহুদি নিয়মে প্রার্থনা করার জন্য কমপক্ষে দশ জন পুরুষ দরকার, যাকে হিব্রুতে মিনইয়ান বলা হয়। লোকের অভাবে তাই বহু দিন বন্ধ হয়ে গিয়েছে নিয়মিত প্রার্থনা। কিন্তু আজও কেউ কেউ নিয়মিত সিনাগগে আসেন। প্রথামতো শুক্রবার এসে জলে ভাসমান মোম জ্বালিয়ে যান। শনিবার প্রার্থনায় বসেন। এখন এই শহর ওঁদেরই। কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে চান না এঁরা। যত দিন বেঁচে আছেন এই শহরেই নিজেদের মতো করে ভক্তি আর প্রেম উৎসর্গ করেন ঈশ্বরকে।

আরও পড়ুন: শনিবারের জিপিও কেন সংগ্রাহকদের কাছে সোনার খনি?