বিশ্বের প্রথম কার্বনমুক্ত দেশ হতে পেরেছে ভুটান। সেই দেশ তো পিকচার পোস্টকার্ডের মতো সুন্দর হবেই। এখানে প্রকৃতি অকৃপণ। এখানে ইমারতও ছন্দেবদ্ধ। বাড়ি থেকে পোস্ট অফিস, পেট্রল পাম্প থেকে সুলভ শৌচালয়— সবেরই নকশা এক রকম!  এখানে অধিকাংশ হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকান মহিলাকর্মী দ্বারা পরিচালিত। ভুটানি মেয়েরা যেমন সুন্দরী, তেমনই স্বাধীনচেতা। ভুটানিরা মিশুকে ও নম্র। সকলেরই পরনে জাতীয়পোশাক। এখানকার প্রকৃতি আপনাকে মুগ্ধ করবেই। কিন্তু তার মধ্যে সোনালি ধানখেত, ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া নদী, নানা রঙের অর্কিড, পাখি, প্রজাপতি, নীল আকাশ, ছোট ছোট বাড়ি নিয়ে পারো যেন অনন্য! রাজধানী না হলেও পারো ভুটানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানের এক মাত্র এয়ারপোর্ট যে এখানে। পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এই এয়ারপোর্টকেই বলে দ্য মোস্ট ডিফিকাল্ট কমাশির্য়াল এয়ারপোর্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড!

সময়টা ছিল অক্টোবরের শেষ। ভারতের সীমানা পেরিয়ে প্রথম গন্তব্য ভুটানের রাজধানী থিম্পু। তার পর পুনাখা। পুনাখা থেকে পারো। সকাল সকাল পারো পৌঁছে দেখা হয়ে গেল মিউজ়িয়াম, জং (বৌদ্ধগুম্ফা ও সরকারি দফতর) ও বৌদ্ধমঠ। ভুটানে আসা ইস্তক ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনারে মেনু ছিল বাথআপ (হাতে তৈরি নুডলস দিয়ে তৈরি থুকপা), এমা দাশি (চিজ় ও লঙ্কার পদ), মোমো ইত্যাদি স্থানীয় খাবার। পারোতেওঅন্যথা হল না। পারোয় দ্বিতীয় দিন পুরোটাই রাখা ছিল উত্তর পারো থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত বৌদ্ধমঠ তাকসাং বা টাইগার নেস্ট মনাস্ট্রি দেখার জন্য। স্থানীয়দের মতে, ভুটানের অন্যতম পবিত্র ও জাগ্রত এই মঠ। শুধু মাত্র তাকসাংয়ে যাওয়ার জন্য বিদেশ থেকে উড়ে আসেন অনেকেই।

 কথিত আছে, বহু বছর আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পদ্মসম্ভব এক বাঘিনীর পিঠে চড়ে তিব্বত থেকে সোজা উড়ে এসেছিলেন এই পাহাড়ে। দীর্ঘ তিন মাস পাহাড়ের এক গুহায় তপস্যার পরে ভুটানের দুরাত্মাদের পরাস্ত করে পদ্মসম্ভব ফিরে যান তিব্বতে। ভুটানকে দিয়ে যান বৌদ্ধধর্ম। তিব্বতি ভাষায় তাকসাং মানে বাঘের গুহা বা টাইগার নেস্ট। তিব্বতের মতো ভুটানিরা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উপাসক। শুধু ধর্ম নয়, পোশাক, খাদ্য,সংস্কৃতি... ভুটানে তিব্বতের ছোঁয়া স্পষ্ট। ১৬৯২ সালে তেনজিং রাবগে ওই গুহায় তাকসাং বৌদ্ধমঠটি তৈরি করেছিলেন। ভুটানিদের বিশ্বাস, তেনজিংই পূর্বজন্মে ছিলেন পদ্মসম্ভব।

আরও পড়ুন: জলে কুমির ডাঙায় জাগুয়ার​

পাহাড়ের গা ধরে মঠে যাওয়ার প্রায় বারো কিলোমিটার পথ তৈরি হয়েছে মানুষের পায়ে পায়ে! বেশ চড়াই, এবড়োখেবড়ো, সংকীর্ণ রাস্তা। এক দিকে খাদ। চলার পথে এমন কিছু বাঁক আছে যে, আগে থেকে দেখা যায় না! ঘোড়ায় করে যাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। যে দেশের সরকার প্রকৃতি নিয়ে এত সচেতন, যে মঠ দেখতে রোজ শয়ে শয়ে পর্যটক আসেন, সেখানে ঠিকঠাক রাস্তা নেই কেন? প্রশ্নের উত্তর দিলেন স্থানীয় এক গাইড, ‘‘কষ্ট করে না গেলে পুণ্য মিলবে কেমন করে!’’

 ফোবজিখা উপত্যকা যাওয়ার পথে ছোট্ট ভুটানি গ্রাম।

চড়াই-উতরাই পথ পেরোবার কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দেয় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি। নাম না জানা গাছের লাল, হলুদ, সবুজ পাতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার নানা রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রায় আড়াই কিলোমিটার আগে টাইগার নেস্ট কাফেটেরিয়া। সাড়ে ৯ হাজার ফুট উপরে কাফের টেরেসে বসে দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতেই ক্লান্তি ভ্যানিশ। প্রায় সকলেই গন্তব্যে পৌঁছনোর আগে এখানে এসে চুমুক দিয়ে যান গরমচা-কফির পেয়ালায়। এখান থেকেই পাওয়া যায় মঠের গোটা ভিউ। তাই হয়তো থামতে চায় না শাটারের শব্দও। কখনও কখনও মেঘ নেমে এসে আংশিক ঢেকে দিচ্ছে মঠকে। বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা শুরু। কাফে থেকে মঠের দূরত্ব বেশি নয়। কিন্তু এখানেই সর্বোচ্চ চড়াই। যাত্রা শুরুর আগেই নীচে কাউন্টার থেকে কেটে নিতে হয় মঠে ঢোকার টিকিট। মঠের ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। ব্যাগ, ক্যামেরা, মোবাইল জমা দিয়েপ্রবেশ করতে হয়ে। ভিতরে বৌদ্ধ মূর্তি, মুগ্ধ করা পেন্টিং। জ্বলছে প্রদীপ। ভাল লেগেছিল মঠের পরিবেশ। কেউ এখানে উচ্চস্বরে কথা বলছেন না। সকলেরই মুখে প্রশান্তি। ভিতরে গিয়ে মনে হল, কষ্ট করে আসা সার্থক। ফিরে আসার পথে কাফেতে সেরে নেওয়া  যায় লাঞ্চ। লাঞ্চেও মিলবে সুস্বাদু স্থানীয় খাবার। তাকসাংয়ের জন্য পথ চলা শুরু করার আগে অবশ্যই কিনবেন লাঠি। হাঁটুর সমস্যা থাকলে নি-ক্যাপ। ওঠার চেয়েও হাঁটুর উপরে চাপ পড়ে বেশি নামার সময়ে। মনে রাখবেন, সূর্য ডোবার আগেই নেমে আসতে হবে  কিন্তু।

পারো আসার আগে পুনাখা থেকে গিয়েছিলাম ফোবজিখা উপত্যকায়। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ফোবজিখায় তিব্বত থেকে আসে ব্ল্যাক নেকড ক্রেনের দল। তিন-চার মাস কাটিয়ে ফিরে যায় নিজ ভূমে। এই তো কয়েকটা মাস থাকবে তারা। কিন্তু তাদের জন্য রাজকীয় ব্যবস্থা করেছে ভুটান সরকার। ১৯৯৯ সালে এই পরিযায়ী সারসদের সংরক্ষণের কথা ভেবে আরএসপিএন-এর (রয়্যাল সোসাইটি ফর প্রোটেকশন অবনেচার) একটা অফিস তৈরি করে ফেলেছে ফোবজিখায়। ফোবজিখার পাশের গ্রাম গ্যাংতেং-এর প্রাচীন বৌদ্ধমঠের চাতালে নভেম্বর মাসে হয় বার্ষিক ব্ল্যাক নেকড ক্রেন ফেস্টিভ্যাল। সারসদের আসা শুরু হলেই পর্যটকেরও ভিড় বাড়ে দুই গ্রামে। হোমস্টে আছে দু’একটি। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারসদের জন্য বিস্তৃত চারণভূমিতে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। নিয়ন্ত্রণ করা হয় কুকুর ও গৃহপালিত পশুদের। আইন অমান্য করলে শাস্তি অনিবার্য! সারসদের চারণভূমি থেকে আরএসপিএন-এ অফিসও দূরে। অফিসের কাচের জানালায় দূরবিনে চোখ লাগিয়ে দেখতে হয় সারসদের উড়ান।

আরও পড়ুন: ফিনিক্সের আর এক নাম কিউবা: পরমব্রত​

ভুটানের প্রকৃতি ও মানুষজন দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, এ শুধু মাত্র কোনও টুরিস্ট স্পট নয়। এ দেশ শেখায়, প্রকৃতির অংশ নয়— প্রকৃতি হয়েই বেঁচে থাকতে।

(মনে রাখুন—ভুটানে শপিং করতে গিয়ে অবশ্যই দরদাম করবেন।তাকসাং মঠের টিকিট কাউন্টারের কাছে ছোট বাজারে ভুটানের জিনিস তুলনামূলক সস্তা। ভারতীয় মুদ্রা চললেও ৫০ শতাংশ টাকা ভুটানি মুদ্রায় পরিবর্তন করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পর্যাপ্ত ক্যাশ সঙ্গে রাখুন রাস্তায় ধূমপান করলে বা জ়েব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করলে মোটা টাকা জরিমানা দিতে হবে)