মন মাতাল করা রাতের আকাশ আমি অনেক দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলছি, পিন ভ্যালির সগনমের রাতের আকাশ আমি অন্তত আর এক বারও দেখিনি। এর বিচিত্র রূপের কাছাকাছি বর্ণনা করতে গেলেও সর্বোচ্চ মানের লেখক সত্তা থাকার দরকার হয় যা আমার অন্তত নেই। তবু বলি, আমরা কালীপুজোর রাতের যে আকাশ দেখি তাকে অযুত সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে কল্পনাতে যে আকাশ দেখতে পাওয়া যাবে তা আমি বাস্তবে প্রত্যক্ষ করেছিলাম ওই রাতে। যেখানে আমরা নাগরিক আকাশের বাসিন্দারা একটা উল্কাপাত দেখলে উত্তেজিত হয়ে পড়ি সেখানে ওই আকাশের কোণে কোণে উল্কাপাত আর এত বিচিত্র রকমের তারার উজ্জ্বল  প্রদর্শনী দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কালীপুজোর রাতের আকাশও হার মানবেই।

এই মুগ্ধতায় এমন মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম যে ওই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার রাতেও দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাককে সঙ্গী করে অনেক রাতে হোটেলের ঘরে ফিরেছিলাম। ওখানকার নির্মল আকাশ অতুলনীয়। আর হবে নাই বা কেন? যেখানে ৬৫-৭০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে হাতে গোনা মাত্র ৪-৫টা বসতি আর ওই সব জনবসতির কোনওটায় ১৫০ তো কোনওটায় বড় জোর ৫০০-৬০০ মানুষের বাস এবং তার পরেই তিব্বত সীমান্তের রাস্তা। যেখানে বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ বলতে হাতে গোনা আ্যডভেঞ্চারার্স বাইকার্স আর আমাদের মতো কালেভদ্রে আসা কিছু মানুষজন, সেখানে এটাই তো স্বাভাবিক।

প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চলে আসুন কাজায়।

‘লোনলি প্ল্যানেট’ শব্দটা আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করি, তবে এই সগনম গ্রামে এসে প্রতিটি মুহূর্তে এই বিশেষণের যথার্থতা অনুভব করেছি। শুধু রাতই বা কেন? পড়ন্ত বিকেলে শুনশান হিমালয়ের বুকে উদ্দাম হাওয়ার শব্দও যে কী মুগ্ধতা এনেছিল, কনকনে ঠান্ডাতেও প্রকৃতির নৈঃশব্দ যে উষ্ণতা এনেছিল, তা-ই বা ভুলি কী করে? অথচ, এই আবেশ মাখানো প্রকৃতির কাছে থাকার জায়গা বলতে কার্যত কিছু নেই, পূর্ত দফতরের একটি বাংলো, যেটা সরকারি অতিথিদের জন্যই বরাদ্দ থাকে, যদি সেটি ফাঁকা থাকে তবেই থাকার অনুমতি পাওয়া যায়। যেমন আমরা পেয়েছিলাম। আর ব্যবস্থা বলতে কয়েকটা হোম স্টে যেগুলো খুব গোছালো নয়। কিন্তু প্রকৃতির ও হিমালয়ের এই অপার সৌন্দর্য আর স্থানীয় মানুষের অবাক করা আতিথ্য মন কেড়ে নেয়।

‘লোনলি প্ল্যানেট’ সগনম

আরও পড়ুন: মোহময়ী অযোধ্যার হাতছানি

এমনিতে নাকোর পর থেকেই ‘কোল্ড ডেজার্ট’-এর যে শ্বাসরুদ্ধকর রূপান্তর প্রত্যক্ষ করছিলাম, ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ শব্দটার আক্ষরিক নমুনাগুলো দেখতে দেখতে এক ভয়মাখানো মুগ্ধতা এমনিই গ্রাস করে রাখে, রুক্ষ হিমালয়ের বুকে শত শত বছরের পুরনো মনেস্ট্রি, ধূসর পাহাড়ের গায়ে যুগ যুগ ধরে বয়ে যাওয়া হাওয়ার আনুগত্যে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক ক্যাসেল, নানা বিচিত্ররঙা পাথরের বিন্যাসে তৈরি হওয়া নানা আকারের প্রাকৃতিক কাঠামো এমনিই মনকে ভাললাগায় অবশ করে রাখে। কিন্তু এই সগনমে এসে নিজেদেরকে পুরোপুরি বহির্জগৎ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবা ছাড়া আর কিছুই মনে হওয়ার থাকে না। মানুষগুলোও আমাদের প্রচলিত ধারণার ‘নাগরিক সভ্যতা’র থেকে এতটাই আলাদা যে মাত্র একরাতের অতিথি হওয়া সত্ত্বেও আমরা চলে আসার সময়ে তাঁদের অন্তরের উষ্ণতাকে সঙ্গী করে আমাদের গাড়ির চারপাশে দাঁড়িয়ে সজল চোখে বিদায় জানাতে জানাতে বলে ওঠেন, ‘‘আপনারা এলেন তাই বাইরের মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হল। পারলে আবার আসবেন, চেষ্টা করব আপনাদের যেন আর কষ্ট না হয়।’’ আমরাও এই এক রাতেই এই প্রকৃতির আর এই মানুষগুলোকে এতটাই মনের কাছে এনে ফেলেছিলাম যে আজও শীতের কোনও স্তব্ধ বিকেলে মানসপটে ওঁদের কাছেই বার বার ফিরে যাই।

কখনও কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, কখনও সোনা রোদ, আশ্চর্য মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সগনমে

আরও পড়ুন: ঠিক যেন ভেনিস 

কখন যাবেন: এই অঞ্চলে বৃষ্টি প্রায় হয়ই না, কিন্তু বরফপাতের প্রাবল্য ভীষণ। তাই যাওয়ার সেরা সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। 

কী ভাবে যাবেন: সিমলা থেকে রামপুর, সারাহান, নাকো, টাবো, ঢাঙ্কার মনেস্ট্রি হয়ে স্পিতির সদর কাজা যাওয়ার পথে বাঁ দিকে ব্রিজ পার হয়ে পৌঁছনো যায় সগনম। আবার মানালি দিয়েও যাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে আগে কাজা পেরিয়ে সগনম পৌঁছতে হবে।

প্রকৃতির ও হিমালয়ের এই অপার সৌন্দর্য আর স্থানীয় মানুষের অবাক করা আতিথ্য মন কেড়ে নেয়

কোথায় থাকবেন: সগনম গ্রামে দু’-একটি হোমস্টে ছাড়া থাকার জায়গা আলাদা করে বিশেষ কিছু নেই যদি না আমাদের মতো ভাগ্য সঙ্গী হয়। সে ক্ষেত্রে আরও ১৫ কিলোমিটার উপরে মুধ গ্রামে থাকার কিছু ব্যবস্থা আছে।

সঙ্গে রাখুন: সগনম পৌঁছনোর জন্য কোনও প্রথাগত যানবাহন নেই, বরঞ্চ পথচলতি স্থানীয় মানুষজন আপনার গাড়ি দেখে কাতর হয়ে লিফট চাইবেন। তাই অবশ্যই গাড়ি সঙ্গে রাখবেন।

কী করবেন না: এখানকার মানুষগুলো কল্পনার থেকেও সরল, তাই আমাদের শহরসুলভ আদবকায়দা দেখাবেন না। ওই প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের আতিথেয়তা ও উষ্ণতা সব কষ্ট ভুলিয়ে দেবে।

 

(লেখক পরিচিতি: বাবার কোলে চড়েই প্রথম নেপাল ভ্রমণ। তার পর থেকে প্রায় প্রতি বছর হিমালয়ের টানে ছুটে গিয়েছেন তার নানা প্রান্তে। বেড়ানোর প্যাশন থেকেই ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখেলেখির শুরু। পাশাপাশি, মোহনবাগান অন্ত প্রাণ। তাঁকে মোহনবাগানের কট্টর সমর্থক বললেও কম বলা হয়।)