ধরমশালা: হিমাচলের অনবদ্য ছোট্ট পাহাড়ি শহর। দলাই লামার উদ্যোগে এ শহরেই গড়ে উঠেছে তিব্বতি শরণার্থীদের উপনিবেশ। ধরমশালা নামেই এ শহরের খ্যাতি।

যা দেখবেন: আপার আর লোয়ার, দু’ভাগে শহরের বিস্তার। আপার ম্যাকলয়েডগঞ্জে দলাই লামার আবাস। বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন কিমি দূরে ভাগসুনাথ মন্দির। অন্দরমহলে রয়েছে পবিত্র কুণ্ড। কাছেই দলাই লামার বুদ্বমন্দির। তিব্বত ছাড়ার সময় সঙ্গে এই বুদ্ধমূর্তিটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। রয়েছে সুন্দর মিউজিয়াম। মঙ্গল থেকে রবিবার খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। কাতুয়ালি বাজারের কাছে কাংড়া মিউজিয়ামটি দেখতে ভুলবেন না। আপার ম্যাকলয়েডগঞ্জের ৫ কিমি চড়াই ভেঙে পৌঁছে যান নাড্ডি। পাহাড়ঘেরা অপরূপ নিসর্গ ধরা দেবে। আরও এক কিমি হাঁটাপথে পৌঁছে যান তালানি গ্রাম। এখানকার শিবমন্দির সংলগ্ন ডাল লেকটি অসাধারণ। লেকের বুকে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি মুগ্ধ করবে। এ ছাড়াও এখানকার স্টেডিয়ামটি এক অন্যতম আকর্ষণ।

কী ভাবে যাবেন: শিমলা থেকে সড়কপথে ধরমশালার দূরত্ব ৩২০ কিমি। গাড়ি অথবা বাসে চলে আসা যায়।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য রয়েছে হিমাচল পর্যটন দফতরের ক্লাব হাউস, ম্যাকলয়েডগঞ্জ, ধরমশালা (০১৮৯২-২২০৮৩৪), ভাড়া ১,৮০০-৩,২০০ টাকা। দ্য বাগসু, ম্যাকলয়েডগঞ্জ (০১৮৯২-২২১০৯১/৯২), ভাড়া ১,৪০০-৩,০০০ টাকা।

ডালহৌসি: পাহাড়ি এই শহরের সঙ্গে ব্রিটিশরা স্কটল্যান্ডের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। এক দিকে ধৌলাধার ও অন্য দিকে পিরপাঞ্জাল পর্বতমালার ঢেউ। সারিবদ্ধ পাইনের আস্ফালন। ছবির মতো শৈলশহর ডালহৌসি।

যা দেখবেন: এখানে পাহাড়ের ঢালে প্রচুর চার্চ দেখতে পাবেন। প্রতিটি গির্জার গথিকশৈলী, গ্লাস পেন্টিংয়ের অনুপম নিদর্শন মন ছুঁয়ে যায়। এই শৈলশহরের সৌন্দর্যের টানে সেই ছোট্টবেলায় ছুটে এসেছিলেন বালক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজও তাঁর বসতবাড়িটি রয়ে গিয়েছে। তবে আজ এই বাড়িটি সীমান্তরক্ষীদের থাকার জায়গা। দীর্ঘ দিন জেলবন্দি থাকার পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এখানে এসে দীর্ঘ দিন কাটিয়ে গিয়েছেন। বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে তাঁর সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আর পাইনের ছায়ামাখা ‘সুভাষ বাউলি’ প্রস্রবণটি আজও রয়ে গিয়েছে। ডালহৌসির সবচেয়ে সেরা আকর্ষণ পঞ্চপুলা। পাঁচ সেতুর সমাহার। এখান থেকে চানমারি গ্রাম, ২ কিমি দূরের সাতধারা ঝর্না, ১০ কিমি দূরের ডাইনকুণ্ড দেখতে দেখতে পৌঁছে যান ডালহৌসির হিলটপে। এখান থেকে পিরপাঞ্জাল ও মণিমহেশ পর্বতমালার প্যানোরামিক ফ্রেম মন ভুলিয়ে দেবে।

ছবির মতো শৈলশহর ডালহৌসি

ডালহৌসি পাহাড়ের মাথায় কালাটপ স্যাংচুয়ারি আরও এক অন্যতম আকর্ষণ। ৮০৫৪ ফুট উচ্চতায় এক অসাধারণ জঙ্গলমহল। পাখির কলতান মুখর। কপাল ভাল থাকলে নানা বন্যপ্রাণে ঠাসা এই জঙ্গলমহলে হরিণ, হিমালয়ান ব্ল্যাকবিয়ার, চিতার দর্শন মিলতে পারে। এ জন্য হাতে একদিন আলাদা সময় ও অনুমতির প্রয়োজন হয়।

কী ভাবে যাবেন: ধরমশালা থেকে ডালহৌসির দূরত্ব ১১৪ কিমি। বাস অথবা গাড়িতে চলে আসতে পারেন। কলকাতা স্টেশন থেকে জম্বু-তাওয়াই এক্সপ্রেসে পাঠানকোট নেমে, বাসে অথবা গাড়িতে মাত্র ৮০ কিমি দূরের ধরমশালা চলে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য রয়েছে রাজ্য পর্যটন দফতরের দি গীতাঞ্জলি (০৮৯৯-২৪২১৫৫), ভাড়া ১,০০০-১,২০০ টাকা। দি মণিমহেশ (০৮৯৯৯-২৪২৭৯৩), ভাড়া ২,৪০০-৫,১০০ টাকা। বেসরকারি হোটেলের মধ্যে স্যাংগ্রিলা (০১৮-৯৯৫০-২৪০৬), ভাড়া ১,৫০০-১,৮০০ টাকা। তাজ প্যালেস (০১৮৯৯২৪-২৪০৬), ভাড়া ১,১০০-১,৩০০ টাকা। হোটেল গ্র্যান্ড ভিউ (০১৮-৯৯২৪-০৭৬০/২৪২৮২২৩), ভাড়া ২,০০০-৫,৫০০ টাকা। প্রতিটি হোটেলের ভাড়া সিজন অনুসারে বাড়ে কমে। 

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা

খাজিয়ার: হিমাচলের প্রকৃতির কোলে যেন আরও এক সাজানো বাগান। ডালহৌসি থেকে মাত্র ২৩ কিমি, যা খাজিয়ার নামে পরিচিত। অনেকে ভারতের সুইজারল্যান্ড বলে থাকেন।

যা দেখবেন: তরঙ্গায়িত মখমলি সবুজের চাদর বিছানো। মাথায় নীল আকাশের সুবিশাল শামিয়ানা। ঢেউখেলানো সবুজের ঢালে সুদীর্ঘ পাইনের আকাশ ছোঁয়া আস্ফালন। তারই মাঝে ছোট্ট লেক, পাহাড়ি উপত্যকার সমস্ত সৌন্দর্য শুষে নিয়ে নিজের স্বচ্ছ শরীরে ধারণ করেছে। এমনই স্বপ্নপুরীর নাম, খাজিয়ার। এখানে ১২ শতকের খাজিয়া নাগ মন্দির। সবুজের মাঝে হাঁটাপথে চলে আসুন জগদম্বা মন্দিরে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা পাখির চোখে খাজিয়ারকে দেখে নিতে ভেসে পড়ুন রোমাঞ্চকর প্যারাগ্লাইডিং-এ। শীতে সবুজ উধাও হয়ে গিয়ে বরফের বাগানে পরিণত হয় খাজিয়ার। এখান থেকেও কালাটপ স্যাংচুয়ারি দেখে নিতে পারেন।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য রয়েছে রাজ্য পর্যটন দফতরের দি দেওদার (০১৮৯৯-২৩৬৩৩), ভাড়া ২,০০০-২,৯০০ টাকা। বেসরকারি হোটেলের মধ্যে পারুল (০১৮৯৯-২৩৬৩৪৪), ভাড়া ১,৫০০-১,৮০০ টাকা। কান্ট্রি লজ (০১৮৯৯-২৩৬৩২৬), ভাড়া ৬০০-১,২০০ টাকা।

(লেখক পরিচিতি: ক্লাস নাইনে পড়াকালীন পাড়াতুতো মামার সঙ্গে মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে সান্দাকফু ট্রেক। সুযোগ পেলেই প্রিয় পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া। বছরে বার কয়েক উত্তরবঙ্গের অল্পচেনা ডেস্টিনেশনে যাওয়া চাই। কুয়াশামাখা খরস্রোতা নদী কিংবা চলমান জীবনছবিতে ক্লিক, ক্লিক। চলতি পথে মেঠো গানের সুর শুনলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া। লাদাখে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া মারমটের ছবি তুলতে ভিজে মাটিতে সটান শুয়ে অপেক্ষায় থাকা— এই নিয়েই ক্যামেরা আর কলম সঙ্গী করে ২২টা বছর। প্রকৃতির টানে ছুটে বেড়ানোটা থামেনি।)

ছবি: লেখক ও মৃত্যুঞ্জয় হালদার