সামাটার

সিকিমের নতুন, অচেনা আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এই সামাটার। নীলাভ সবুজ-রঙা রঙ্গিত নদীর তীরেই অবস্থান সামাটারের। উচ্চতা ১৪৬০ ফুট। দুর্বার স্রোতের রঙ্গিত এখানে দেখবার মতো। অপূর্ব নৃত্যবিভঙ্গে এঁকেবেঁকে তার পথচলা। চারপাশে নিবিড় গাছপালায় ঠাসা উচ্চকিত পাহাড়ি ঘেরাটোপে। নুড়ি-পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে সফেন ঢেউ ওঠে নদীর বুকে। নদীর জল এখানে স্পর্শ তো করতেই পারেন, ইচ্ছে করলে মন খুলে দু-দণ্ড গল্পও করতে পারেন তার সঙ্গে। থাকার জায়গাটির অবস্থান একদম নদীর ধারেই। মাচান ঘরে বসে চা-কফি সহযোগে নদীর ঢেউয়ের ওঠানামা, কুলকুল শব্দে নিমগ্ন হয়েই কাটিয়ে দিতে পারেন বহু সময়।

পায়ে হেঁটে ঘুরে নিতে পারেন কাছের শিবমন্দিরটি। নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে (নদী এখানে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাঁক নিয়েছে) চলে যেতে পারেন অনেকটা দূর পর্যন্ত। নদীতে মাছশিকারিদের সঙ্গে হয়তো দেখাও হয়ে যাবে আপনার। নদীর ওপরেই এখানে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু (পা দিলেই দোলে) রোথক, যার এ পার, মানে সামাটার হল দক্ষিণ সিকিম, আর ও পারটা হল পশ্চিম সিকিম।

নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে যাঁরা দীর্ঘ গাড়িযাত্রা করে পেলিং হি-পাতাল রাবংলা এক দিনে পৌঁছতে চাইবেন না, তাঁদের পক্ষে আদর্শ জায়গা হবে রাস্তার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই সামাটার। সুন্দরী রঙ্গিতের নিবিড় সান্নিধ্যে একটা রাত কাটিয়ে পর দিন পাড়ি দিতে পারেন অন্য গন্তব্যে। আবার বহু পর্যটক নিখাদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মজে গিয়েই হয়তো দুটো দিন কাটিয়ে দিতে পারেন এখানে। যাদের নামচিতে রাত্রিবাসের পরিকল্পনা নেই, তাঁরা এখানে থেকে নামচির (দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার) দর্শনীয় স্থানগুলি দেখে নিয়ে চলে যেতে পারেন অন্য গন্তব্যে।


যাত্রাপথ

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে থেকে সামাটারের দূরত্ব ৮৬ কিলোমিটার। গাড়িতে সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টার মতো। পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে ২৮০০-৩০০০ টাকা। কম খরচে আসতে চাইলে শিলিগুড়ি এসএনটি থেকে শেয়ার জিপে চলে আসুন জোরথাং (ভাড়া মাথাপিছু ২০০ টাকা)। বাসও চলে জোরথাং অবধি। জোরথাং থেকে সামাটারের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। পুরো গাড়ি ভাড়া পড়বে ২০০-৪০০ টাকা।

রাত্রিবাস

একটিই থাকার জায়গা। ‘রিভার ওয়াচ রিসর্ট’।

দ্বিশয্যা কটেজের ভাড়া ১৮০০-২৫০০ টাকা।

পর্যটকদের কাছে এখানকার আর এক আকর্ষণ হতে পারে রিসর্টের সুন্দর সুইমিং পুলটি। যাঁরা এই রিসর্টে রাত্রিবাস করবেন, তাঁরা নিখরচায় (অন্যদের ক্ষেত্রে ভাড়া লাগে ২০০ টাকা মাথাপিছু) আনন্দস্নান করতে পারেন এই সুইমিং পুলে।

যোগাযোগ

পাসাং লেপচা— ৯৭৩৪০-৪৯২২৩, ৮৬৭০৬-২৮৯৯৯।

 

ছালামথাং

দক্ষিণ সিকিমের এক নতুন আকর্ষণ, নতুন পর্যটনকেন্দ্র। এখনও পর্যটকদের কাছে ভীষণ ভাবে অপরিচিত এই জায়গাটি। তবে নির্মল প্রকৃতির অমোঘ টানে পর্যটক সমাগম বাড়াতেও সম্ভবত বেশি সময় লাগবে না। উচ্চতা ৫৮০০ ফুট। থাকাটা হোমস্টেতেই, যে হোমস্টে আবার উৎকর্ষতার বিচারে পুরস্কারও পেয়েছে এই বছর। 

চাঁদনি রাতে ছালামথাং।

পারিবারিক আতিথেয়তা, আন্তরিকতায় মুগ্ধ হবেন প্রতিটি মুহূর্ত। গ্রামের খেতের বেগুন, মিষ্টি আলু, চালকুমড়ো, আদা, মুলো, সিম, আলু, এলাচ, মিষ্টি কুমড়ো ইত্যাদি যে শুধু দেখেই আহ্লাদিত হবেন তাই নয়, সেগুলো যখন খাদ্য হিসেবেও পরিবেশিত হবে লাঞ্চ বা ডিনারে, তখন তো স্বাভাবিক ভাবেই আহ্লাদের মাত্রাও কিঞ্চিৎ বর্ধিত হবে।

খড়ের ছাউনি দেওয়া মাচান-ঘরটিও ভারি সুন্দর। সোফায় বসে অনেক দূর অবধি নজর যায়। দূরে অনেকটা নীচে সিংতাম ও রানিপুলের পাহাড়ি জনপদের ছবি। সবুজ উপত্যকার মধ্য দিয়ে তিস্তার আঁকাবাঁকা সর্পিল পথচলা, পাহাড়ের গায়ে সাং, পান্ডোম ইত্যাদি জায়গা, আরও উপরে নাথুলা অঞ্চলের বরফে ঢাকা পর্বতশ্রেণি— সব মিলিয়ে এক দারুণ ছবি ধরা পড়বে চোখে, চাইলে তাকে লেন্সবন্দিও করে রাখতে পারেন।

দুটো রাত থাকলে, পর দিন সকালে কিছু হাঁটা, কিছুটা গাড়িতে দেখে নিতে পারেন আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি। সদ্য উদ্বোধন হওয়া চমকপ্রদ ‘মঙ্গলধাম’ (বহু অর্থব্যয়ে নির্মিত বিশাল এই রাধাকৃষ্ণের মন্দির শিল্পনৈপুণ্যে সত্যিই তারিফযোগ্য), লাভদাঁড়া ভিউ পয়েন্ট, ঘন জঙ্গলে ঢাকা দুর্গম পাহাড়ি পথে লুকনো গুহা ‘বনঝকরি’, রামিতে ভিউ পয়েন্ট (তিস্তা উপত্যকার অনেকটা অংশ দেখা যায় পাখির চোখে), ১৬০ বছরের প্রাচীন ‘হেরিটেজ হাউস’ (লিম্বু সম্প্রদায়ের), দেওরালি ভিউ পয়েন্ট ইত্যাদি দেখে নিন হাতে সময় নিয়ে। আঁধার নামলে মাচান ঘরে বসে আবার অন্য এক রূপ দেখতে পাবেন। রানিপুল, সিংতাম জনপদের ঝলমলে আলো, পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত জনপদগুলির, বিজলি আলোর ঝলমলানি দেখতে দেখতে মনে হবে, নির্জন প্রকৃতির কোলে আলস্যমাখা এ অবকাশের স্বাদটা কিন্তু ভারী মিষ্টি।

 

সবুজ উপত্যকার মধ্য দিয়ে তিস্তার আঁকাবাঁকা সর্পিল পথচলা।

যাত্রাপথ

শিলিগুড়ি থেকে ৯৮ কিলোমিটার, গ্যাংটক থেকে ৪২ কিলোমিটার, সিংতাম থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই ছালামথাং। এনজেপি. বা শিলিগুড়ি থেকে পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে ২৫০০-৩০০০ টাকা। কম খরচে আসতে চাইলে এনজেপি স্টেশন থেকে শেয়ার জিপে আসুন সিংতাম (ভাড়া মাথাপিছু ২০০ টাকা), সিংতাম থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে পৌঁছন ছালামথাং-এ, ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা।

রাত্রিবাস

‘ছালামথাং হোমস্টে’। দ্বিশয্যা ঘরের কটেজ ভাড়া ১২০০ টাকা।

যোগাযোগ

অমৃত শর্মা~৯৯৩৩৩-৬৭৬৮৩, ৮১৪৫৮-১৭৭৭১।

চেখে দেখতে পারেন ছালামথাং-এর স্থানীয় খাবার।

মনে রাখবেন

ছালামথাং হোমস্টে-র সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রীর স্বাদ অনেকটা মনে থাকবে। দেশি ঘি, ফিলুংগে (বাদাম আর কুমড়োবীজ পেস্ট করে বানানো), সেলরুটি (চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো পিঠে), গুন্দ্রুক (ফারমেন্টেড বাইশাক), ফাপর, নাকিমা প্রভৃতি আইটেম কিন্তু জমে যেতে বাধ্য।

 

রাবংলা

দক্ষিণ সিকিমের সর্বোচ্চ পর্যটনকেন্দ্র হল এই রাবংলা। উচ্চতা ৭০১৬ ফুট। সুউচ্চ মৈনাম পাহাড়ের পাদদেশেই অবস্থান রাবংলার। অবস্থানগত কারণে (মৈনাম পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মাঝেমধ্যেই জলভরা মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামে) বছরের বিভিন্ন সময়েই রোদ্দুর আর বৃষ্টির টানাপড়েন চলে এখানে। নরসিংহ, পান্ডিম খুব ভাল ভাবে দৃশ্যমান এখান থেকে। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ বাকি তুষারশৃঙ্গের খুব ভাল দৃশ্য পেতে গেলে একটু কষ্ট করে ঘণ্টা পাঁচেকের হাঁটায় উঠে আসতে হবে মৈনাম পর্বতচূড়ায় (উচ্চতা ১০৫৬০ ফুট)। এখান থেকে আরও ঘণ্টাখানেকের হাঁটায় ঘুরে আসতে পারেন ভালেদুঙ্গা থেকে। দু’জায়গা থেকেই হিমালয়ের যে অসাধারণ রূপ দেখতে পাবেন, তা ভোলার নয়। তবে এই ট্রেকিং-এ যেতে গেলে গাইড আবশ্যক, নয়তো পথ হারানোর আশঙ্কা থাকে। ট্রেকিং যদি না করতে চান, তবে গাড়ি ভাড়া করে দেখে নিন আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি। নবনির্মিত সুদৃশ্য বুদ্ধ-পার্ক, রালং মনাস্ট্রি (পুরনো ও নতুন দুটোই), টেমি টি গার্ডেন, হ্যান্ডিক্র্যাফটস সেন্টার, পবিত্র গুহা, রাবংলা মনাস্ট্রি ইত্যাদি দেখে নিন এক যাত্রায়।

রাবংলায় বুদ্ধ-পার্ক।

যাত্রাপথ

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে থেকে রাবংলার দূরত্ব ১৩০ কিলোমিটার। পুরো গাড়ি ভাড়া করলে খরচ পড়বে ৩৫০০-৪০০০ টাকা। কম খরচে আসতে চাইলে, শিলিগুড়ি এসএনটি থেকে বেলা বারোটায় রাবংলার শেয়ার জিপ ধরতে পারেন, ভাড়া মাথাপিছু ২৫০ টাকা। বাসও ছাড়ছে রাবংলার ওই জায়গা থেকেই বেলা একটায়, ভাড়া মাথাপিছু ১০০ টাকা। তা ছাড়া শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে নামচি (ভাড়া মাথাপিছু ১৫০ টাকা), নামচি থেকে আবার শেয়ার জিপে পৌঁছতে পারেন রাবংলা, দূরত্ব ৬৬ কিলোমিটার, পুরো গাড়িভাড়া পড়বে ২০০০-২৫০০ টাকা।

 

রাত্রিবাস

‘দি হিমালয়ান রিসর্ট’ (বুদ্ধ পার্কের পাশেই অবস্থিত), ত্রিশয্যাঘরের ভাড়া ১৮০০-২২০০ টাকা প্রতিদিন। ডিলাক্স কটেজ ভাড়া ২৫০০ টাকা।

রালং মনাস্ট্রিতে দেখা যাবে এই ফ্রেস্কো।

যোগাযোগ

৯৮৩১১-৯৩২৫৬, ৮০১৭৩-৩৫৬৭৬

‘মাউন্ট নরসিং ভিলেজ রিসর্ট’ দ্বিশয্যাঘরের ভাড় ১৫০০-৩০০০ টাকা। যোগাযোগ: ৯৯৩৩০-৮৩৮৪৭

 

নামচি

৪৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নামচি হল দক্ষিণ সিকিম জেলার সদর শহর। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, হোটেল, রেস্তোঁরা ইত্যাদি নিয়ে বেশ জমজমাট শহরই বলা যায় নামচিকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা-সহ অন্যান্য তুষারশৃঙ্গের দৃশ্যও বেশ সুন্দর দেখা যায় এখান থেকে। গাড়িভাড়া করে অবশ্যদ্রষ্টব্য যে জায়গাগুলি দেখে নিতে হবে সাইট সিইং-এ, তার মধ্যে সামদ্রুপচে (১৩৫ ফুট উঁচু গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তির অবস্থান এখানেই), রক গার্ডেন, চারধাম (কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, রামেশ্বরম, দ্বারকা, গঙ্গোত্রী ইত্যাদি মন্দিরের সুদৃশ্য রেপ্লিকা তৈরি হয়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। আছে ১০৮ ফুট উচুঁ বিশাল এক শিবমূর্তিও), সাঁইবাবার মন্দির, ‘তারে ভির’ উল্লেখযোগ্য।

নামচিতে রয়েছে চারধাম।

যাত্রাপথ

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে নামচির দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। গাড়িতে সময় লাগবে তিন ঘণ্টার মতো। পুরো গাড়ি রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে ৩০০০-৩৫০০ টাকা। কম খরচে আসতে চাইলে শিলিগুড়ি এসএনটি স্ট্যান্ড থেকে ছাড়া শেয়ার জিপে পৌঁছতে পারেন নামচি। ভাড়া পড়বে মাথাপিছু ১৫০ টাকা। নামচি থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার, রাবংলার দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার।

রাত্রিবাস

‘মাউন্ট বোল হোমস্টে’, প্রতি দিন খাওয়া-থাকা নিয়ে মাথাপিছু ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা।

যোগাযোগ

৭৫৫০৯-৩৬২২১

কিছু জরুরি তথ্য

১) সিকিমের যে কোনও জায়গায় হোটেল, হোমস্টে বুকিং কিংবা যাতায়াতের জন্য গাড়ি বুকিংয়ের জন্য সিকিমে যোগাযোগ করতে পারেন নারায়ণ প্রধানের সঙ্গে। ফোন: ৮৪৩৬৬-৪৯০০১, ৭০৩১৩-০৮৫০৮

২) সিকিমে ঘোরার জন্য যে কোনও জরুরি তথ্যের ব্যাপারে যোগাযোগ: এম কে প্রধান (জয়েন্ট ডিরেক্টর, সিকিম ট্যুরিজম, গ্যাংটক), মোবাইল: ৯৮৩২০-৬৫৬১৭, ৮১১৬১-০৭০৭১

(লেখক পরিচিতি: ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখালেখি বছর কুড়ি। পেশা ভিন্ন হলেও ভ্রমণের টানে গোটা ভারত ঘুরে বেড়ান বছরভর। পছন্দের দিক থেকে পাল্লা ভারী পাহাড়ের। ভ্রমণ ছাড়াও প্যাশন রয়েছে অভিনয়ে। অভিনয় করছেন বড় পর্দা, ছোট পর্দা, মঞ্চ, বেতার— সব মাধ্যমেই।)