একদা মল্লভূম রাজ্যর রাজধানীর নাম, বিষ্ণুপুর। মল্লভূম বলতে বাঁকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, কিছুটা মুর্শিদাবাদ আর বিহারের ছোটনাগপুরের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চিত্রকর যামিনী রায় এই দেশেই জন্মেছিলেন। লালমাটির পথের বাঁকে বাঁকে শুধুই ইতিহাস আর মন্দির। মন্দিরনগরী বললেও ভুল হবে না। শুধু মন্দির কেন? রয়েছে দিঘিও। এখানকার প্রতিটি মন্দিরে অসাধারণ টেরাকোটার কাজ দেখতে সারা বিশ্বের প্রচুর পর্যটক ছুটে আসেন। স্টেশনে নেমে অটো অথবা রিকশায় চলে আসা যায়। শহর আধুনিক হয়েছে। বেড়েছে কলেবর। সাবেক গ্রাম উধাও। উধাও লালমাটির মোরাম বিছানো পথ। যদিও রাস্তার দু’পাশে তা আজও উঁকি দেয়।

প্রথমেই চলে আসুন রাসমঞ্চে। রেলিং ঘেরা কেয়ারি করা বাগান। সবুজের মাঝে নানা রঙিন ফুলের মেলা। আর তারই নীচে বিশাল বেদী। সেই বেদীর উপর মঞ্চ। চুড়ো ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে, অনেকটা পিরামিডের আকারের। পোড়া ইটের ইমারত। ১৬০৭ সালে মল্লরাজ বীর হাম্বির ৩৫ ফুট উঁচু ও ৮০ ফুট চওড়া এই অনবদ্য রাসমঞ্চের নির্মাণ করেন। অন্দরমহলের খিলান আর গলিতে আজও যেন ইতিহাস ফিসফিস করে। একসময় এখানেই অনুষ্ঠিত  হত রাস উৎসব। বড়ই জৌলুস ছিল সে সময়। আজ পড়ে রয়েছে শুধুই এক ইমারত।

ইতিহাসের চিহ্ন বহন করছে ২৯৬ মণ ওজনের দলমাদল কামান

এর পর দেখে নেওয়া যায় দলমাদল কামানটি। রাসমঞ্চের দক্ষিণে, ২৯৬ মণ ওজনের মাকড়া পাথর গলানো লোহা দিয়ে তৈরি কামানটিতে এত বছর পরেও এতটুকু মরচে পড়েনি। কথিত আছে, বর্গি হামলার সময়, মল্ল রাজাদের কুলদেবতা স্বয়ং মদনমোহনের নির্দেশে কামান থেকে গোলবর্ষণ হত।

দলমাদল কামানের থেকে অল্প দূরে ছিন্নমস্তা মন্দিরে লালপাথরে দেবী ছিন্নমস্তার মূর্তি দেখে নিন।

পিরামিডে আকারের এই রাসমঞ্চেই একসময় অনুষ্ঠিত  হত রাস উৎসব

বাঁকুড়াকে ভাল ভাবে জানতে হলে চলে আসুন আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবনে। আদপে মিউজিয়াম। পাল, সেন যুগের নানান মূর্তি, মোগল আমলের শিল্পকলা, প্রাচীন পুঁথি, আরও বহু মূল্যবান নথি না দেখলে অনেক কিছুই অদেখা থেকে যায়।

বিশাল লাল ইটের স্তূপ এখন জঙ্গলে ঢাকা। এক সময় গুমঘর নামে পরিচিত ছিল। সামান্য এগিয়ে আরও এক মন্দিরের সামনে। পাঁচচূড়া শ্যামরাই মন্দিরে। রেলিং দিয়ে ঘেরা, চারদিকে সবুজের আস্ফালন। মাঝে টেরাকোটার আশ্চর্য কারুকাজ করা পাঁচচূড়া বিশিষ্ট মন্দির। দৈঘ্য ও প্রস্থে ১১.৪ মিটার ও উচ্চতায় ১০.৭ মিটার। সূর্যের সোনারঙে ঝলসে ওঠে পোড়ামাটির অলংকরণ। যার মধ্যে রামায়ণ, মহাভারতের বেশ কিছু চিত্রপট ফুটে উঠেছে। ১৬৮৩ সালে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ এই মন্দির নির্মাণ করেন।

পরশুরা গ্রাম

আরও কিছুটা গেলেই রাধাশ্যাম মন্দির। লালচে মাকড়া পাথরের মন্দিরটি ১৭৫৮ সালে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ নির্মাণ করেন। মন্দিরের মুখে সুন্দর নহবতখানা পেরিয়ে প্রবেশ করুন। এই নহবতখানায় একসময় নিত্য গানবাজনার আসন বসত। চতুষ্কোণ ছাদবিশিষ্ট মন্দিরের চুড়োয় গম্বুজআকৃতি বিষ্ণুপুরের বাকি মন্দিরের থেকে অনেকটাই আলাদা। মন্দিরের অন্দরমহলে তুলসীমঞ্চ, রান্নাঘর ও নাটমঞ্চ। রয়েছে রাধেশ্যাম, গৌড়নিতাই ও জগন্নাথের মূর্তি । আজও পূজাপাটের চল আছে।

মল্লরাজ জগতমল্ল ৯৯৭ সালে দৈবযোগে স্বপ্নাদেশ পান এবং গঙ্গামাটি দিয়ে মৃন্ময়ীমাতা ও তার মন্দির নির্মাণ করেন। আজও অষ্টমীতে তোপধ্বনি দেবীর পুজো হয়। গুমগড় থেকে পাশ দিয়ে খানিক এগিয়ে উত্তরমুখী মৃন্ময়ীমাতার মন্দির।

মৃণ্ময়ী মন্দিরের উত্তর ও পূর্ব কোণে লাল মাকড়ার প্রাচীরে ঘেরা রাধালালজিউর মন্দির। ১৬৫৮ সালে শ্রী রাধিকা ও কৃষ্ণের মন্দিরটি অসাধারণ।

জোড়বাংলা মন্দিরের পোড়ামাটির অলংকরণ অসাধারণ

বাইরে থেকে দেখলে অনেকটা দুর্গের তোরণদ্বার। বড়া পাথর দরজা নামে পরিচিত। এটাই প্রাচীন বিষ্ণুপুরের মাকড়া পাথরের খিলান। আর তার মাঝে মাঝে খোপ খোপ করা। এখান থেকেই অস্ত্রধারী সৈন্যরা কড়া নজর রাখতেন। বর্গী হানাদারদের রুখতেই এই দুর্গ তৈরি হয়েছিল। বড় পাথরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আরও এক মাকড়া পাথরের প্রবেশপথ। যা দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তার আভাস দেয়।

ছোট পাথরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে আসুন, এক সুন্দর এক ইমারতের সামনে। মাকড়া পাথরের দোতলা রথ। রাসমঞ্চের আদলে মঞ্চ আর তার উপর বসানো মন্দিরের আদলে পাথরের রথ এক কথায়, অসাধারণ।

দেখে নিন বিষ্ণুপুরের একমাত্র শিবমন্দির, মল্লেশ্বর।

এ বার দেখে নিন জোড়বাংলা। ১৬৫৫ সালে তৈরি দোচালা কুটিরের এক আশ্চর্য সংযুক্তির মধ্যস্থলে একটি চারচালা শিখর বিদ্যমান, তাই মন্দিরের নাম জোড়বাংলা। মন্দিরের গায়ে মহাভারতের নানা ঘটনা, শিকার দৃশ্যের পোড়ামাটির অলংকরণ অসাধারণ।

মাকড়া পাথরের দোতলা রথ

এখানকার বালুচরি, স্বর্ণচরী শাড়ির কদর জগৎবিখ্যাত।

বিষ্ণুপুরের আরও এক ঐতিহ্য দশাবতার তাস সংগ্রহ করতে ভুলবেন না। মল্ল রাজারা এই তাস খেলতেন। শাঁখারিবাজারের কাছে মনসাতলার ফৌজদার পরিবার বংশ পরম্পরায় এই তাস তৈরি করে আসছেন। গোলাকৃতি ১২০ সেট এই তাস আজ প্রায় লুপ্তপ্রায়। প্রতিটি তাসেই দশ অবতারের ১০টি প্রতীক নিয়েই এই তাস। সংগ্রহ করে রাখতে পারেন।

পোড়ামাটির শিল্পের জন্য বিখ্যাত পরশুরা গ্রামে চলে আসুন। এখান থেকে পোড়ামাটির নানা সামগ্রী কেনাকাটা করতে পারেন। বিষ্ণুপুর থেকে মাত্র ৩২ কিমি দূরে।

নজর কাড়বে শ্যামরাই মন্দির

এ ছাড়াও মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুরের সাতটি বাঁধ রয়েছে। তার মধ্যে লালবাঁধ দেখে নিতে ভুলবেন না। শুখামাটিতে প্রচণ্ড জলকষ্ট দূর করতে এই বিশাল দিঘি খনন করা হয়। এই লালবাঁধ ঘিরে রয়েছে এক মর্মস্পর্শী প্রেমকাহিনি।

কী ভাবে যাবেন

১২৮৮৩ রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস সাঁত্রাগাছি থেকে সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে ছাড়ে। ১২৮৮৩ আরণ্যক এক্সপ্রেস ছাড়ছে শালিমার থেকে সকাল ৭-৪৫ মিনিটে। ১২৮২৭ হাওড়া পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ছাড়ে বিকেল ৪-৫০ মিনিটে। ধর্মতলা থেকে বাসেও চলে আসা যায় বিষ্ণুপুর। কলকাতা থেকে দূরত্ব  প্রায় ১৪৫ কিমি।

কোথায় থাকবেন

এখানে থাকার প্রচুর হোটেল। রয়েছে রাজ্য পর্যটন দফতরের ট্যুরিস্ট লজ (০৩২৪৪-২৫২০১৩) ভাড়া ১,০০০-২,২৫০ টাকা। বেসরকারি হোটেলের মধ্যে উদয়ন লজ (২৫২২৪৩) ভাড়া ৫৫০-১,১০০ টাকা। মোনালিসা (২৫২৮৯৪) ভাড়া ৭৫০-১,০০০ টাকা। বিষ্ণুপুর লজ (২৫৩৭৪৯) ভাড়া ৮৫০-১,২৫০ টাকা।

লেখক পরিচিতি: ক্লাস নাইনে পড়াকালীন পাড়াতুতো মামার সঙ্গে মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে সান্দাকফু ট্রেক। সুযোগ পেলেই প্রিয় পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া। বছরে বার কয়েক উত্তরবঙ্গের অল্পচেনা ডেস্টিনেশনে যাওয়া চাই। কুয়াশামাখা খরস্রোতা নদী কিংবা চলমান জীবনছবিতে ক্লিক, ক্লিক। চলতি পথে মেঠো গানের সুর শুনলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া। লাদাখে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া মারমটের ছবি তুলতে ভিজে মাটিতে সটান শুয়ে অপেক্ষায় থাকা— এই নিয়েই ক্যামেরা আর কলম সঙ্গী করে ২২টা বছর। প্রকৃতির টানে ছুটে বেড়ানোটা থামেনি।

ছবি: লেখক