Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বদলায়নি, তাই বদলের যুগে কোণঠাসা অ্যাম্বি

সমকালীন না হতে পারার জন্যই এখন প্রাক্তন হওয়ার মুখে চার চাকার অ্যাম্বাস্যাডর বা ‘অ্যাম্বি’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কালের নিয়মে বদল এসেছে সর্বত্র।

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ২৬ মে ২০১৪ ০৩:৪৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

সমকালীন না হতে পারার জন্যই এখন প্রাক্তন হওয়ার মুখে চার চাকার অ্যাম্বাস্যাডর বা ‘অ্যাম্বি’।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কালের নিয়মে বদল এসেছে সর্বত্র। কিন্তু কার্যত বদলায়নি অ্যাম্বি। প্রায় পাঁচ দশক ধরে একই জায়গায় নিজেকে ধরে রেখেছিল ভারতে তৈরি প্রথম এই যাত্রী-গাড়িটি। গাড়ি বিশেষজ্ঞদের মতে, সে জন্যই বাজার হারাতে হারাতে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে সেটি। শনিবার উত্তরপাড়ায় হিন্দুস্তান মোটরসের কারখানায় কাজ বন্ধের নোটিস অ্যাম্বি-র ফিরে আসার ক্ষেত্রে সম্ভবত কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিল বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

এ দিকে, গোটা ঘটনায় রাজনীতির ছাপ পড়তে শুরু করেছে। রবিবার কারখানার গেটের সামনে পথসভার পরে বিজেপি-র জেলা নেতৃত্ব জানিয়েছেন, কারখানা খুলতে প্রয়োজনে কেন্দ্রের কাছে দরবার করবেন তাঁরা। সিটু, এসএসকেইউ, আইএনটিইউসি-র মতো শ্রমিক ইউনিয়নগুলির দাবি, ঐতিহ্যবাহী কারখানাটি অধিগ্রহণ করুক রাজ্য সরকার। পাশাপাশি প্রশাসন সূত্রের খবর, দু’একদিনের মধ্যেই সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসতে পারেন রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু। পাশাপাশি এক প্রশ্নের জবাবে ই-মেল বার্তায় অবশ্য সংস্থাটি এ দিন জানিয়েছে, সংস্থার জন্য নতুন লগ্নিকারী এখনও পাওয়া না গেলেও আলোচনা চলছে।

Advertisement

গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে ব্রিটিশ মডেল ‘মরিস অক্সফোর্ড’-এর আদলে উত্তরপাড়ায় অ্যাম্বাস্যাডর তৈরি শুরু করেছিল বিড়লা গোষ্ঠীর হিন্দুস্তান মোটরস। অ্যাম্বাস্যাডরের ভিতরের প্রশস্ত জায়গা, মাটি থেকে গাড়ির বাড়তি উচ্চতা, ভারতীয় রাস্তার অবস্থা ইত্যাদির নিরিখে গ্রাহকদের কাছে এটির চাহিদা ভালোই ছিল। এবং অবশ্যই লাইসন্স-রাজের যুগে বাজারে প্রতিযোগিতা কার্যত না থাকার সুবিধা পুরোমাত্রায় পেয়েছিল অ্যাম্বি।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন না করে শুধু একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন বাজারে টেকা যায় না। গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন একান্ত জরুরি শর্ত। তার অভাবেই ’৮০-এর দশকেও যেখানে বার্ষিক প্রায় ২৪ হাজার অ্যাম্বাস্যাডর বিক্রি হয়েছিল, ২০১৩-’১৪-তে তা নেমে আসে ২৫০০-তে। সংস্থা সূত্রের খবর, মাসে ১৫০০টি গাড়ি তৈরির ক্ষমতা থাকলেও সম্প্রতি কারখানাটিতে মাত্র ১৫০টি গাড়ি তৈরি হচ্ছিল।

প্রতিযোগী সংস্থাগুলি ক্রমাগত পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যখন নতুন গাড়ির চাবি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে, তখন নামমাত্র অদল বদল ছাড়া প্রায় একই গাড়ি নিয়ে ক্রেতার দরবারে হাজির হয়েছে সংস্থাটি। যার নিট ফল, ব্যক্তিগত গাড়ির তালিকা থেকে ছিটকে গিয়ে মূলত ট্যাক্সি বা সরকারি আনুকূল্যে বাণিজ্যিক গাড়ি হিসেবেই কোনও মতে জায়গা খুঁজে নিয়েছে অ্যাম্বি।

কলকাতায় ‘ভিন্টেজ’ গাড়ি সংগ্রাহক তথা গাড়ি বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় ঘোষের মতে, পাঁচ দশক ধরে প্রায় একই গাড়ি ব্যবসা করছে, এমন নজির বিশ্বে অনন্য। হিন্দুস্তান মোটরস অবশ্য মাঝেমধ্যেই কিছু না কিছু নতুনত্বের দাবি করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, তাতে প্রযুক্তিগত উন্নতি খুব কিছু হয়নি। সঞ্জয়বাবু জানিয়েছেন, যে মরিস অক্সফোর্ডের আদলে গাড়িটি তৈরি হয়েছিল, তখনই সেই প্রযুক্তি পুরনো হতে শুরু করেছিল। যথেষ্ট সময় পেলেও নিজেকে আধুনিক করে তুলতে পারেনি অ্যাম্বি। তাঁর কথায়, “গোড়ায় মোটোরোলার যে মোবাইল ফোন এসেছিল তা কি এখন চলবে? সামাজিক পরিকাঠামোর বদল মেনে ক্যাসেট বা বড় রেকর্ড-প্লেয়ার-ও এখন অতীত। বাজার এখন কমপ্যাক্ট ডিস্ক বা সিডি-র।”

বাহ্যিক কিছু বদলও হলেও প্রযুক্তির উন্নতি হয়নি, দাবি কলকাতায় পুরানো গাড়ি নিয়ে চর্চা করা রাহুল সরকারেরও। ভারতীয় আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে অ্যাম্বি-র গুরুত্ব মানলেও তিনি স্পষ্ট বলছেন, গাড়িটির সার্বিক গুণগত মানোন্নয়নে তেমন চেষ্টাই হয়নি। তাঁর দাবি, আজকের

আধুনিক গাড়িগুলির তুলনায় অ্যাম্বাস্যাডরে যন্ত্রাংশ অনেক বেশি। ফলে গাড়ি তৈরির জন্য শ্রমিক পিছু খরচ যেমন বেশি, তেমনই বেশি গাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের খরচও।

ইঞ্জিন বা বৈদ্যুতিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বাদে গোটা বিশ্বে সব গাড়ি সংস্থাই অধিকাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি করায় সহযোগী সংস্থাদের দিয়ে। তারপর সেগুলি গাড়ি সংস্থার কারখানায় জোড়া হয়। এতে গাড়ি সংস্থার শ্রমিক-খরচ বাঁচে। পাশাপাশি যন্ত্রাংশের মানও উন্নত হয়। কিন্তু রাহুলবাবুর দাবি, হিন্দুস্তান মোটরস নিজেরাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করত। ফলে গাড়ি তৈরির খরচ বাড়ে। চাপ পড়ে সংস্থার আর্থিক অবস্থার উপরেও। তাঁর আরও দাবি, অন্য অনেক গাড়ি সংস্থায় কম কর্মী দিয়ে বেশি গাড়ি তৈরি হয়। কিন্তু উত্তরপাড়ার কারখানায় উল্টো ছবি। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে খরচ-আয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনি সংস্থাটি।

তবুও এত দিন ধরে ব্যবসা চালানোর পরেও কেন পিছিয়ে পড়ল অ্যাম্বি? সংশ্লিষ্ট মহলের যুক্তি, দেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ। ’৮০-এর দশকে প্রথমে মারুতি-সুজুকি এসে বদলে দেয় দেশের গাড়ি শিল্পকে। ছোট ও কম দামি গাড়ির চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকে ভারতীয়দের মধ্যে। পরের ধাক্কা আসে ১৯৯১-তে আর্থিক সংস্কারের পরে। একের পর এক বিদেশি গাড়ি সংস্থা পা রাখে ভারতের মাটিতে। আধুনিক প্রযুক্তির বিশেষ সুবিধা-সহ নানা সুবিধে এবং জ্বালানী সাশ্রয়কারী গাড়ির সরবরাহ যত বাড়তে থাকে, ততই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে অ্যাম্বাস্যাডর। এমন কী ট্যাক্সি-র মতো বাণিজ্যিক বা সরকারি গাড়ির ক্ষেত্রেও ঢুকে পড়ে দেশি-বিদেশি একাধিক সংস্থা। কোণঠাসা হয়ে পড়ে অ্যাম্বি।

তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক আগেই ‘মৃত্যু’ ঘটেছিল অ্যাম্বি-র। সরকারি ভাবে তা ঘোষণা হল শনিবার। এবং যদি ফের কারখানা চালুও হয়, গোটা ব্যবস্থার খোলনলচে না বদলালে ফিরে আসার পরীক্ষাটা আরও কঠিন দেশের প্রথম গাড়ির সামনে।

কারখানা খুলতে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি

হিন্দ মোটরস কারখানা অবিলম্বে খোলার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করলেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য। কংগ্রেস সমর্থিত আইএনটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি হিসাবে প্রদীপবাবু রবিবার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন, কারখানা খুলতে দ্রুত ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যবস্থা করা হোক। মুখ্যমন্ত্রী নিজে মধ্যস্থতা করে কারখানাটি খোলার ব্যাপারে উদ্যোগী না হলে তা বাংলার পক্ষে লজ্জাজনক হবে বলে প্রদীপবাবুর বক্তব্য।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement