×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

সমঝোতা চুক্তি আর বাস্তবে শিল্পের ফারাক বুঝলেন মন্ত্রীও

নিজস্ব সংবাদদাতা
শিলিগুড়ি ১২ জানুয়ারি ২০১৫ ০৩:১৭
গৌতম দেব

গৌতম দেব

শিল্পের প্রস্তাবের জন্য সমঝোতা চুক্তি (মউ) এবং বাস্তবে শিল্প হওয়ার মধ্যে অনেক ফারাক। মেনে নিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী গৌতম দেব।

আপাতদৃষ্টিতে এতে মেনে নেওয়ার কিছু নেই। কারণ, এটাই বাস্তব! কিন্তু রাজ্যের নাম যখন পশ্চিমবঙ্গ এবং তার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন সহজ সত্য কবুল করাও ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে! মন্ত্রী গৌতমবাবুর কথাও তেমনই অর্থবহ হয়ে উঠছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই কলকাতায় বিশ্ব বাংলা শিল্প সম্মেলন করে এত এত টাকার শিল্প পরিকল্পনার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, যা চোখ কপালে তুলে দিয়েছে শিল্প ও বণিক মহলের! কোথাও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প, কোথাও বাম আমলের পুরনো প্রকল্পকে নিজেদের কৃতিত্ব বলে দাবি করে বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিরোধীরা তা-ই নিয়ে সরবও হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, পুরনো প্রকল্পের প্রস্তাবকে কুমিরছানার মতো ব্যবহার করা আর বাস্তবে শিল্প হওয়ার মধ্যে ফারাক মুখ্যমন্ত্রী আর কবে বুঝবেন?

সেই প্রেক্ষিতেই রবিবার গৌতমবাবুর মন্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী কি তবে অজান্তেই সত্য কবুল করে বসলেন? এবং তা করতে গিয়ে কি অস্বস্তিতে ফেললেন নিজের সরকারকেই? শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে কেউ অবশ্য এ দিন এই নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। তৃণমূলের এক রাজ্য নেতার কথায়, “কোন প্রসঙ্গে গৌতমবাবু কী বলেছেন, ভাল করে না জেনে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া উচিত নয়!”

Advertisement

উত্তরবঙ্গের জন্য আলাদা ‘শিল্প সম্মেলন’ করতে চলেছে রাজ্য সরকার। আগামী ১৯ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় হতে চলছে এক দিনের শিল্প সম্মেলন। শ’পাঁচেক শিল্পোদ্যোগী সেখানে যোগ দিতে পারেন বলে সরকারি সূত্রের খবর। সেই সম্মেলন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়েই এ দিন উত্তরকন্যায় মন্ত্রী গৌতমবাবুর মন্তব্য, “বাস্তবের শিল্পের সঙ্গে মউ (মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) চুক্তির অনেক তফাত থাকে। অনেকটা কোনও প্রকল্পের টেন্ডার আর ওয়ার্ক অর্ডারের মতো! বাস্তবে শিল্পকে সামনে এনে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য।” বাম আমলে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় যখন রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান, তখন একের পর এক শিল্প সমঝোতার প্রসঙ্গে তাঁকে ‘মউ-দা’ বলে কটাক্ষ করতেন বিরোধী শিবিরে থাকা মমতারা! এখন মুখ্যমন্ত্রী মমতার আমলে সেই মউ আর বাস্তবের ফারাকই চর্চায় ফিরে এসেছে। তারই মধ্যে এ দিন গৌতমবাবুর মন্তব্য তাই আলাদা করে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে।

মন্ত্রী জানান, গত বছরই উত্তরবঙ্গে দু’টি বড় মাপের শিল্প সম্মেলন হয়েছে। সেখান থেকে সামনে আসা অনেক প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে শিল্পপতিদের অনেক সমস্যাও থাকে। এ বারের শিল্প সম্মেলনে সরকারের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থা, সুবিধা সবই তুলে ধরা হবে। ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প থেকে চা, পর্যটন, তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে লগ্নির বিষয়ই সামনে আসবে। মুখ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন দফতরের সচিব পর্যায়ের আধিকারিকেরা আসছেন।

বণিক মহল এবং সরকারি সূত্রের খবর, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে শিলিগুড়ি এবং নভেম্বরে মালদহে শিল্প সম্মেলন হয়। দু’টি জায়গা মিলিয়ে প্রায় ১৭১টি ‘প্রস্তাব’ আসে। মোট বিনিয়োগের কথা বলা হয় প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০টির বেশি প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। বেশির ভাগই রয়ে গিয়েছে প্রস্তাব আকারে। আর পুরনো কিছু প্রকল্পের কাজ এখনও চলছে। সেখানে নতুন করে শিল্প সম্মেলন করে ফের কোটি কোটি টাকার লগ্নির ঘোষণা, মউ-এর পথে যাচ্ছে সরকার। এর যুক্তি নিয়ে বহু শিল্পপতি, ব্যবসায়ী একান্তে প্রশ্ন তুলছেন। মন্ত্রীর মন্তব্য সেই চর্চাই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে!

বণিক মহলের বক্তব্য, মউ-এর ঘোষণা হলেও বাস্তবে রাজ্যের জমি নীতি, জমির চরিত্র বদল, বিদ্যুৎ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন ছাড়পত্র নিয়ে নানা সমস্যা দেখা যায় প্রকল্প করার সময়। এর জন্য দীর্ঘদিন ধরে এক জানলা ব্যবস্থার দাবিও জানিয়ে আসছেন শিল্পোদ্যোগীরা। তবে দীর্ঘ দিন পরে এ বারের শিল্প সম্মেলন থেকে উত্তরকন্যায় ‘ইউনিট ক্লিয়ারিং ইউনিট’ বা ইউসিইউ চালুর পথে যাচ্ছে সরকার। রাজ্যে হাওড়ায় একমাত্র ওই ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবস্থা ঠিকঠাক ‘কার্যকরী’ হলে আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের শিল্প সম্ভাবনার পথে কাঁটা কিছুটা কমতে পারে।

শিল্প সম্মেলনে সরকারের সহযোগিতায় থাকছে সিআইআই। সংস্থার উত্তরবঙ্গ এবং সিকিম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান প্রবীর শীল বলেন, “আগে শিল্প সম্মেলনগুলি মূলত ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প নির্ভর ছিল। এ বার সব ধরনের শিল্পোদ্যোগীদের ডাকা হচ্ছে। সরকার সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান, ব্যবস্থা তুলে ধরবে। এর মধ্যে অন্যতম ‘ইউসিইউ’ ব্যবস্থা হতে পারে। তা হলে মউ এবং বাস্তবের মধ্যে যে ফারাক থাকে, তা ধীরে ধীরে মিটে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।”

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, এ বারের সম্মেলনে মূলত মোহিতনগরের ২০০ কোটি টাকার সিমেন্ট কারখানা, শিলিগুড়িতে ১৫০ কোটি টাকার বিনোদন পার্ক, নরম পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থার ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্প, নকশালবাড়িতে ৩০ কোটি টাকার রাইস মিল, পাথরঘাটার ২০ কোটি টাকার চাউমিন কারখানা, ২৪ কোটি টাকার হলদিবাড়ির ফল-সব্জি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ছাড়াও একটি গোষ্ঠীর ১২৫ কোটি টাকার তিনটি পর্যটন প্রকল্পে বিনিয়োগকে সামনে রাখা হচ্ছে। পর্যটনের আওতায় গজলডোবা ট্যুরিজম হাব এবং সাফারি পার্ককেও রাখা হচ্ছে।

Advertisement