×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

হায়দরাবাদে সিআইডি জালে নেতাই-কাণ্ডের পাঁচ ফেরার

নিজস্ব প্রতিবেদন
৩০ এপ্রিল ২০১৪ ০৩:১২

দীর্ঘ তিন বছর ফেরার থাকার পর সিআইডি-র জালে ধরা পড়লেন নেতাই-কাণ্ডে অভিযুক্ত পাঁচ সিপিএম নেতা-কর্মী। সোমবার রাতে হায়দরাবাদে সিপিএমের দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে তাঁদের গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে সিআইডি। এডিজি, সিআইডি রামফল পওয়ার জানান, ধৃতদের মঙ্গলবার মেদিনীপুর আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের এক দিনের জন্য ‘ট্রানজিট রিমান্ড’-এ নিয়েছে সিআইডি।

গোড়ায় সিআইডি তদন্ত শুরু করলেও পরে হাইকোর্টের নির্দেশে নেতাই-কাণ্ডের তদন্তভার বর্তায় সিবিআইয়ের উপর। ২০ জন সিপিএম নেতা-কর্মীর নামে চার্জশিটও দেয় সিবিআই। ১২ জন গ্রেফতার হন। বাকি ৮ জন ঘটনার পর থেকে ‘ফেরার’ ছিলেন। তাঁদের মধ্যেই ৫ জনকে এ বার ধরল সিআইডি।

সিবিআই তদন্তের মধ্যেই সিআইডি-অভিযান কেন? অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সিআইডির স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট (এসএস) ভারতী ঘোষ বলেন, “অভিযুক্তদের ধরার জন্য সিবিআই আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল।” কিছু দিন আগেই ভারতীদেবীকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সুপারের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

Advertisement



সবিস্তার দেখতে ক্লিক করুন...

নেতাই-কাণ্ডে ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন সিপিএমের ধরমপুর লোকাল কমিটির সম্পাদক ডালিম পাণ্ডে, লালগড় লোকাল কমিটির সম্পাদক জয়দেব গিরি, বিনপুর জোনাল কমিটির সদস্য খলিলুদ্দিন, লালগড় লোকাল কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক তপন দে ও দলীয় কর্মী রথীন দণ্ডপাট। ভারতীদেবী মঙ্গলবার বলেন, “সোমবার রাতে হায়দরাবাদ শহরের ‘এম বি ভবন’-এর (অন্ধ্রপ্রদেশে সিপিএমের রাজ্য কমিটির অফিস) সামনে থেকে ৫ জনকে ধরা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে আমরা জেনেছি, এরা এত দিন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছিল।” সিপিএমের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ওয়াই ভি রাও অবশ্য দাবি করেন, “এখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছে, এমন খবর আমাদের কাছে নেই।” নেতাই মামলায় আরও তিন অভিযুক্ত সিপিএমের বিনপুর জোনাল সম্পাদক অনুজ পাণ্ডে, বেলাটিকরি লোকাল কমিটির সম্পাদক চণ্ডী করণ এবং জেলা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ফুল্লরা মণ্ডল এখনও ফেরার। তাঁদের হদিস পেতে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিআইডি। ধৃত ডালিমের সম্পর্কিত দাদা হলেন অনুজ।

সারদা-কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল যোগের অভিযোগ তুলে সিবিআই তদন্ত চেয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছে বিরোধীরা। এ দিন নেতাই-কাণ্ডে সিআইডির সাফল্যকে তুলে ধরে সেই সিবিআইকেই বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতার বড়বাজারে নির্বাচনী জনসভায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “নেতাইয়ে ৯ জনকে মেরেছিল বামেরা। সিবিআই এত দিন দোষীদের ধরতে পারেনি। আমাদের পুলিশ ধরল।” রায়দিঘি ও পাথরপ্রতিমার সভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ও বলেন, “নন্দীগ্রামে সিবিআই কী করেছে? বাংলার পুলিশ তো গিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে (নেতাই কাণ্ডে অভিযুক্তদের) ধরে আনল।”

সন্ধ্যায় মমতার সিবিআই-কটাক্ষের আগেই অবশ্য এ দিন কলকাতায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী মন্তব্য করেন, “এখন নেতাই-কাণ্ড নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখানোর চেষ্টা করছেন, সিবিআই যা করতে পারেনি, সিআইডি সেটাই করল। এর পরে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে বলবে, সিবিআই দিয়ে কী হবে! সিআইডি-ই পারে সব। সারদা-কাণ্ডে সিবিআই দেবেন না।”

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি লালগড়ের নেতাইয়ে রথীন দণ্ডপাটের বাড়িতে থাকা সিপিএমের ‘সশস্ত্র শিবির’ থেকে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছিল। নিহত হয়েছিলেন চার মহিলা-সহ ৯ জন নিরীহ গ্রামবাসী। আহত হন অন্তত ২৮ জন। তদন্তে নেমে ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে আদালতে উল্লেখ করে সিবিআই। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের পর নেতাই-কাণ্ড ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে বামেদের বিপর্যয়ের পথ প্রশস্ত করে বলে রাজনৈতিক মহলের মত। পরবর্তী কালে এই ঘটনায় ভুল স্বীকারও করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

রাজ্যে তৃতীয় দফা লোকসভা ভোটের মুখে নেতাই-কাণ্ডে সিপিএম নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের পর দলীয় নেতৃত্ব দাবি করেছেন, সারদা-কেলেঙ্কারি নিয়ে তৃণমূল যখন কোণঠাসা, তখন সকলের নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতেই এই গ্রেফতার। এ দিন হলদিয়ায় রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, “উনি (মুখ্যমন্ত্রী) মুখ ফেরানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু পারবেন না।” সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক দীপক সরকারের আবার দাবি, “এ সব মিথ্যা মামলা।”

ঠিক কী ভাবে এই পাঁচ জনকে ধরা হল?

সিআইডি সূত্রের খবর, হায়দরাবাদ শহরের চিক্কডপল্লিতে সিপিএমের রাজ্য কমিটির অফিসে অভিযুক্তরা রয়েছেন বলে নানা সূত্রে খবর এসেছিল। সেই মতো ভারতী ঘোষের নেতৃত্বে সিআইডির ৯ জনের দলটি রবিবার সকালে হাওড়া থেকে ট্রেনে হায়দরাবাদ রওনা দেয়। আগে থেকেই সিপিএম অফিসের অদূরে একটি হোটেলে ঘর নেওয়া হয়েছিল। সোমবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ এই হোটেলে পৌঁছয় দলটি। বিকেলে শুরু হয় অভিযান।

সোমবার সন্ধ্যায় পার্টি অফিস থেকে একা বেরোন জয়দেব গিরি। রাস্তায় আসতেই তাঁকে ধরেন সিআইডি অফিসাররা। হোটেলে এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিছুক্ষণ পরে খলিলুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে পার্টি অফিসের বাইরে বেরোন ডালিম পাণ্ডে। তাঁদেরকেও হোটেলে আনা হয়। পরে খলিলুদ্দিনকে দিয়ে তপন দে-কে ফোন করান সিআইডি অফিসাররা। ‘বিশেষ দরকার আছে’ বলে তপন ও রথীনকে স্থানীয় সিনেমা হলের কাছে ডাকা হয়। সেখানে এলে তাঁদেরকেও পাকড়াও করা হয়। সিআইডি সূত্রের খবর, এই অভিযানে ভবানী ভবনের কোনও গোয়েন্দাকে রাখা হয়নি। ভারতী ঘোষ মেদিনীপুরের গোয়েন্দাদের একটি দল তৈরি করে গোপনে অভিযান চালান। ধৃতদের নিয়ে মঙ্গলবার সকালে বিমানে কলকাতা পৌঁছয় সিআইডির দলটি।

দুপুর দেড়টা নাগাদ তাঁদের মেদিনীপুরের সিজেএম মঞ্জুশ্রী মণ্ডলের এজলাসে হাজির করা হয়। সিআইডির তরফে এক দিনের ‘ট্রানজিট রিমান্ড’-এর আবেদন করা হয়। বিচারক তা মঞ্জুর করেন।

এ দিন মেদিনীপুর আদালতে হাজিরার পর ধৃতদের ভবানী ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আজ, বুধবার তাঁদের ঝাড়গ্রাম আদালতে হাজির করা হবে।

Advertisement