Advertisement
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

স্বজন না-হলেই ব্রাত্য, অভিযোগের কোরাস

বিক্ষিপ্ত ভাবে অভিযোগটা ছিলই। এ বার সেটাই যেন দাবানলের আকার নিয়েছে। ‘স্বজনপোষণ’-এর নালিশ নিয়ে মুখ খুলছে জেলার একের পর এক নাট্যদল। তাদের আঙুল তৃণমূলপন্থী বলে পরিচিত নাট্যসংগঠন নাট্যস্বজন-এর দিকে। জেলাশহরগুলির মধ্যে নাটকের জন্য আলাদা পরিচিতি রয়েছে বালুরঘাটের। সবার আগে সরব হয়েছে তারাই। সঙ্গে গলা মিলিয়েছে নদিয়া, বীরভূমও। অন্যান্য জেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বহু দলও একই নালিশ জানিয়েছে।

অনুপরতন মোহান্ত ও গৌতম চক্রবর্তী
কলকাতা শেষ আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৩:৪০
Share: Save:

বিক্ষিপ্ত ভাবে অভিযোগটা ছিলই। এ বার সেটাই যেন দাবানলের আকার নিয়েছে। ‘স্বজনপোষণ’-এর নালিশ নিয়ে মুখ খুলছে জেলার একের পর এক নাট্যদল। তাদের আঙুল তৃণমূলপন্থী বলে পরিচিত নাট্যসংগঠন নাট্যস্বজন-এর দিকে।

Advertisement

জেলাশহরগুলির মধ্যে নাটকের জন্য আলাদা পরিচিতি রয়েছে বালুরঘাটের। সবার আগে সরব হয়েছে তারাই। সঙ্গে গলা মিলিয়েছে নদিয়া, বীরভূমও। অন্যান্য জেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বহু দলও একই নালিশ জানিয়েছে। সকলেরই অভিযোগ, নাট্যস্বজনে নাম না লেখালে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। কী ধরনের বৈষম্য? নাট্যদলগুলির অভিযোগ নাট্যোৎসবে ডাক পাওয়া থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত শো, এমনকী আর্থিক অনুদানের ক্ষেত্রেও ‘স্বজনপোষণ’ চলছে।

এই অভিযোগ অবশ্য এ রাজ্যে একেবারে নতুন নয়। দীর্ঘদিন অবধি রাজ্যের নাট্যদলগুলির অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বাম-ঘেঁষা বলে পরিচিত ছিল। তখনও কিছু কিছু দল শাসক দলের বেশি কাছাকাছি থাকার সুবাদে বেশি সুবিধা পায় বলে অভিযোগ উঠত। নন্দীগ্রাম পর্ব থেকে ধীরে ধীরে নাট্যদলগুলির মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন আসে। পালাবদলের পরে ব্রাত্য বসু, অর্পিতা ঘোষেদের নেতৃত্বে তৈরি হয় নাট্যস্বজন সংস্থা, যা মূলত তৃণমূলপন্থী দলগুলির সংগঠন বলেই পরিচিত। এখন অভিযোগ উঠছে, যাঁরা নাট্যস্বজনে নাম লিখিয়েছেন, তাঁরাই সব সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন!

যেমন? সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত একের পর এক নাট্যমেলায় ডাক পায়নি বালুরঘাটের কোনও দল। উত্তরবঙ্গ উৎসব থেকে শুরু করে নাট্যমেলা বা অন্তর্বঙ্গ নাট্য উৎসব কোথাওই তাঁদের ঠাঁই হয়নি বলে দাবি। ঘটনাচক্রে এই দলগুলি নাট্যস্বজনের সদস্য নয়। নাট্যদল তূণীরের সম্পাদক জিষ্ণু নিয়োগী জানাচ্ছেন, পরিবর্তনের সরকারের আমলে কোনও উৎসবে শহরের কোনও নাটকের দলকে নেওয়া হয়নি। শহরের নাট্যকর্মী সংস্থার সম্পাদক অমিত সাহার কথায়, “সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই যে সরকারি উৎসবে বালুরঘাটের দলগুলিকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে, তা অবিশ্বাস করার জায়গা নেই।” শপথ নাট্যগোষ্ঠীর তরফে তুহিনশুভ্র মণ্ডলের অভিযোগ, “নাট্যস্বজনের সদস্য না হলে সুযোগ মেলায় সমস্যা হচ্ছে।”

Advertisement

এই অভিযোগকে নস্যাৎ করছেন যাঁরা, তাঁরা ঘটনাচক্রে প্রায় সকলেই শাসক দলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। যেমন, কুশমণ্ডির দিনাজপুর থিয়েটার কোম্পানি দলের উদ্যোক্তা তৃণমূলের সুনির্মলজ্যোতি বিশ্বাস। তাঁর দাবি, “এই অভিযোগ ঠিক নয়। যোগ্য দলকে সুযোগ দেওয়া হয়।” তৃণমূলের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সভাপতি বিপ্লব মিত্রর মন্তব্য, “রাজনীতির কোনও বিষয় নেই। বালুরঘাটে সে রকম ভাল নাটক হচ্ছে না বলে হয়তো সমস্যা হতে পারে।”

যোগ্যতার প্রশ্নই যদি ওঠে, বালুরঘাটের সবচেয়ে নামী নাট্যব্যক্তিত্ব হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ও কিন্তু ইদানীং ডাক পাচ্ছেন না। হরিমাধবের বালুরঘাট ত্রিতীর্থ দলটি ‘জল’ বা ‘দেবাংশী’-র মতো নাটক করে কলকাতাতেও বারংবার সমাদৃত হয়েছে। হরিমাধবের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন দেবশঙ্কর হালদার, সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। হরিমাধব এখন বলছেন, “আমাদের নাটক হয়তো দেখানোর যোগ্য মনে করেন না ওঁরা। অথবা আমরা অচ্ছুৎ।”

কে ঠিক করেন যোগ্যতার মান? পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির এক আধিকারিকের বক্তব্য, নাট্য আকাদেমি থেকে গঠিত ছ’জনের নির্বাচকমণ্ডলী নাটকের দল ঠিক করেন। এতে নাট্য আকাদেমির হাত নেই। আর, নাট্যজগতের অন্দরমহলে কান পাতলে অধিকাংশই দাবি করছেন, নাট্য আকাদেমির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নামেই। রিংমাস্টারের কাজটি করছে নাট্যস্বজন, যারা নাট্য আকাদেমিতেও সংখ্যাগুরু। আকাদেমির নাট্য নির্বাচক কমিটির আহ্বায়ক তথা দক্ষিণ দিনাজপুরের সাংসদ অর্পিতা ঘোষ যেমন নাট্যস্বজনেরও সম্পাদক। নাট্যস্বজনের সভাপতি, নাট্য আকাদেমিরও চেয়ারম্যান রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী ব্রাত্য বসু। বালুরঘাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে অর্পিতাদেবীর বক্তব্য, “নাট্যমেলায় ‘দিনাজপুর থিয়েটার কোম্পানি’ নাটক করেছে। ফলে বালুরঘাটের অভিযোগ ঠিক নয়।”

পাল্টা জবাবে বালুরঘাটের সমবেত নাট্যকর্মী সংস্থার পরিচালক প্রদোষ মিত্র বলেন, “ওই দলে তো অর্পিতা ঘোষ ও দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ই নেতৃত্ব দেন। তা ছাড়া দলটি ঠিক বালুরঘাটেরও নয়। কলকাতা আর বৃহত্তর কলকাতা কি এক হল?”

বস্তুত ৭-১৩ ডিসেম্বর গঙ্গারামপুরে সাত দিনের নাট্যমেলায় ৭টি নাটকই ছিল ব্রাত্য বসু, অর্পিতা ঘোষ-সহ কলকাতার দেবেশ চট্টোপাধ্যায় (নাট্যস্বজনের যুগ্ম সম্পাদক), অনীশ ঘোষ (নাট্যস্বজনের যুগ্ম সম্পাদক), বিজয় মুখোপাধ্যায় (নাট্যস্বজনের কোষাধ্যক্ষ) ও অভিজিৎ করগুপ্ত (নাট্যস্বজনের কমিটি-সদস্য) নির্দেশিত। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির প্রশাসনিক অফিসার দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “জেলার নাটক দেখার জন্য তো অন্তর্বঙ্গ নাট্য উৎসবের আয়োজন রয়েছে।” ১৭ ডিসেম্বর আরামবাগ থেকে অশোকনগর, হলদিয়া, কল্যাণীর পর ২৪ ডিসেম্বর বহরমপুরে অন্তর্বঙ্গ উৎসব শেষ হবে। সেখানেও বালুরঘাটের দল নেই।

এ ব্যাপারে নাট্যস্বজনের সভাপতি ব্রাত্য বসুর বক্তব্য, “বালুরঘাটের ঘটনাটি ব্যতিক্রম। কলকাতায় নান্দীকার-থিয়েটার ওয়র্কশপ-সায়ক, বালিতে বিবেক, হরিপালে অন্য ভুবনের মতো অনেক দলই নাট্যস্বজনের সদস্য নন, কিন্তু সরকারি নাট্যোৎসবে অভিনয় করছেন। বরং নাট্যস্বজনে যাঁরা নেই, তাঁরা ফেস্টিভাল করলে স্বজনের কেউ ডাক পান না।”

কিন্তু ক্ষোভ যে একা বালুরঘাটেরই, তা তো নয়। নাট্যমেলায় বীরভূম থেকে পাঁচটি দলকে ডাকা হয়েছে। অথচ ৩১ বছর বয়সী সিউড়ির চিরন্তন থিয়েটার ডাক পায়নি। তাঁরা স্বজন নন। সংস্থার কর্ণধার দেবাশিস দত্ত বলছেন, “বীরভূমে ছড়িয়েছিটিয়ে যত পুরনো দল রয়েছে, তাদের অনেককেই গত তিন বছর ডাকা হয়নি।” অন্য দিকে অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন দল বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী পরপর তিন বছর আমন্ত্রণ পেয়েছে। তার কর্ণধার উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ও স্বীকার করছেন, “আমরা আমন্ত্রণ পেয়েছি বলে খুশি। পুরনো দলগুলিকেও সুযোগ দেওয়া হলে আরও বেশি খুশি হতাম।” নাটকের জগতের অনেকেই বলছেন, পুরনো নামী দলগুলির একটা বড় অংশ স্বজনে নাম লেখায়নি। ভিড় জমিয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট, দুর্বল দলগুলিই। তারাই এখন স্বজনের ছত্রছায়ায় ছড়ি ঘোরাতে চাইছে।

বীরভুমের ৩৭ বছরের পুরনো দল প্রবাহ নাট্যমের কর্ণধার প্রিয়তোষ প্রামাণিক দাবি করছেন, গত বছর নাট্য আকাদেমিতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আকাদেমি থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, নাট্যস্বজনের সদস্য হলে তবেই নাট্যমেলায় ডাক পাওয়ার সুবিধে আছে। প্রিয়তোষবাবু বলেন, “আমরা কোনও দিন কোনও দলকে তোষামোদ করিনি। আজও করছি না।” বহরমপুরে সন্দীপ ভট্টাচার্যের ‘রঙ্গাশ্রম’ দল কিছু দিন আগে মালদহের মালঞ্চ দলের নাট্যোৎসবে ডাক পেয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সেই আমন্ত্রণ নাকচ হয়ে যায়। সন্দীপদের সন্দেহ, স্বজনে না থাকাতেই এই দুর্ভোগ।

নদিয়ায় শান্তিপুর সাংস্কৃতিক-এর কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ও একই সুরে কথা বলছেন। মিনার্ভা রেপার্টরিতে চন্দ্রগুপ্ত নাটক পরিচালনা করা কৌশিকের বক্তব্য, “অর্পিতা ঘোষ প্রথমেই বলেছিলেন, যারা স্বজন হবে তারা স্বজনকেই ডাকবে। আমরা স্বজন নই, তাই সে ভাবে ডাক পাচ্ছি না।” কৃষ্ণনগর অরণি-র সুজিত সাহা অভিযোগ করছেন, “রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা পাইনি। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না কারণ তাতে রাজ্য সরকারের একটা স্বীকৃতি লাগে। কিন্তু নাট্যস্বজনের যারা সদস্য নন তাঁদের সেটা দেওয়া হচ্ছে না।” কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের কিশোর সেনগুপ্ত বলেন, “আমি স্বজন নই। নাট্যমেলায় ডাক পাওয়ার প্রশ্নই নেই। তবে কল্যাণীতে আমরা নিজেরা যে নাট্যমেলা করি, তাতে পুরপ্রধানের যথেষ্ট সাহায্য পাই।”

বগুলার সূচনা নাট্যদলের সৃজন (পদবি ব্যবহার করেন না) নাট্যস্বজনে নাম লিখিয়েছেন। তিনি অবশ্য আলাদা করে সুবিধা পাচ্ছেন, এমনটা স্বীকার করলেন না। কিন্তু গলায় একটা সার্বিক হতাশার সুর। বললেন, “গ্রামাঞ্চলের নাটক আরও বেশি লোক দেখার সুযোগ পাবে এই আশাতেই স্বজনে যাওয়া। কিন্তু সে সব আর হল কই?”

হল না কেন? অরণি-র সুজিতের দাবি, তার কারণ, “স্বজনের প্রধান উদ্দেশ্য, যারা স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তাদের সব কিছু থেকে বঞ্চিত করে রাখা।” কৌশিকবাবুর মতে, স্বজন তৈরি হওয়ার পর মফস্সলের দলগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কেই ভাঙন এসে গিয়েছে। তাঁর কথায়, “কিছু লোককে নিজস্ব বৃত্তে আটকে রাখা ছাড়া স্বজনের উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ নেই।”

জেলার দলগুলির এই অভিযোগে সারবত্তা আছে বলে মানছেন কলকাতার সুমন মুখোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়রাও। সুমন-বিপ্লব দু’জনেরই বক্তব্য, ‘‘হ্যাঁ, এ রকম তো হচ্ছেই।’’

যদিও ব্রাত্যবাবুর দাবি, “কেউ কেউ আমার শিল্পীসত্তার থেকে রাজনৈতিক সত্তাকে বড় করে দেখছেন। তাঁরা কোনও উৎসবে সুযোগ না পেলেই নাট্যস্বজনকে দোষারোপ করছেন।” অথচ নাট্যস্বজনের সহসভাপতি পদ থেকে সদ্য ইস্তফা দেওয়া মনীশ মিত্ররও কিন্তু অভিযোগ, “দলে রাখো, পাইয়ে দাও এটাই সংগঠনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” কৌশিক সেন মনে করেন, “নাট্যজগতে এই দাদাগিরির সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের হয়তো প্রত্যক্ষ যোগ নেই। কিন্তু তৃণমূলের ছত্রছায়াকে ব্যবহার করে নাটকে জমি দখলের লড়াই চলছে।” কলকাতার বেশ কিছু নাট্যদলের অভিযোগ, জেলা বা মফস্সলের কোন নাট্যোৎসবে কলকাতার কে ডাক পাবে, সেখানেও নাট্যস্বজন ফতোয়া জারির চেষ্টা চালাচ্ছে। পুরবোর্ডগুলিও অনেক সময় দলগুলিকে ‘হল’ দেওয়ার সময় স্বজন-তালিকা মিলিয়ে নিচ্ছে। মহিষাদল থেকে কামারহাটি, চিত্রটা একই।

স্বজন না-হলেই ব্রাত্য!

সহ প্রতিবেদন: দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায়

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.