Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

পাড়ুইয়ের বধূকে নিগ্রহের তদন্ত নিয়ে উষ্মা কোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদন
২১ জানুয়ারি ২০১৫ ০৩:২০

পাড়ুইয়ের বধূর উপরে নির্যাতনের তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। এমন একটি গুরুতর অভিযোগের তদন্ত কেন জেলার খোদ পুলিশ সুপারকে দিয়ে করানো হচ্ছে না, তুলল সেই প্রশ্নও। পাশাপাশি নির্যাতিতার নিরাপত্তা ও চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেওয়ার জন্য হাইকোর্ট মঙ্গলবার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসনকে।

বীরভূমের পাড়ুইয়ের সাত্তোর গ্রামের ওই গৃহবধূর উপরে অত্যাচারের অভিযোগটির দিকে সোমবার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ সোমবারই জানিয়ে দেয়, আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি গ্রহণ করছে। এ দিন হাইকোর্ট বসতে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। এবং সরকারপক্ষের সঙ্গে বিচারপতিদের কথোপকথনেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ঘটনার তদন্তে পুলিশ যথোচিত গুরুত্ব দিয়েছে বলে আদালত মনে করছে না।

এ দিন মামলাটিতে সরকারপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল লক্ষ্মী গুপ্ত। শুনানির শুরুতেই প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর তাঁর কাছে জানতে চান, এত বড় একটা অপরাধের তদন্ত কেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি)-কে দিয়ে করানো হচ্ছে? এসপি স্বয়ং কেন তদন্ত করছেন না?

Advertisement

লক্ষ্মীবাবু তখন সরাসরি জবাব দিতে পারেননি। তবে পুলিশ যে ব্যাপারটাকে মোটেই লঘু ভাবে দেখছে না, তা বোঝাতে গিয়ে তিনি আদালতকে বলেন, “বীরভূম জেলা পুলিশ ইতিমধ্যে ওই ঘটনার জেরে জেলার স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি)-এর ওসি-কে ক্লোজ (জেলা পুলিশ লাইনে বসিয়ে রাখা) করেছে।” শুনে প্রধান বিচারপতির পাল্টা প্রশ্ন, “ওসি-কে সাসপেন্ড করা হয়নি কেন?”

ঘটনা হল, এ দিন সকালেই বীরভূম জেলা পুলিশ এসওজি’র সংশ্লিষ্ট ওসি কার্তিকমোহন ঘোষকে সাসপেন্ড করেছে। কার্তিকবাবু-সহ আরও দুই কনস্টেবলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ হয়েছে। এসডিপিও (বোলপুর) অম্লানকুসুম ঘোষ-সহ সে দিনের অভিযানে সামিল বাকি নয় পুলিশকর্মীকেও ‘শো-কজ’ করা হয়েছে। বীরভূম জেলা পুলিশের নেওয়া ব্যবস্থার কথা বেলা ১১টার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমের কাছে পৌঁছে গেলেও হাইকোর্টে সরকার পক্ষের কাছে কিন্তু তখনও সে বার্তা পৌঁছয়নি। ফলে, অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল শুনানির সময়ে আদালতকে তা জানাতে পারেননি। বরং আদালতের পাল্টা প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে তিনি বলেন, “পুলিশ সুপারকে দিয়েও তদন্ত করানো যেতে পারে।”



শুনে ফের তোপ দাগে আদালত। ডিভিশন বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেলকে জিজ্ঞাসা করেন, “কোর্টের চাপে পড়ে এখন বলছেন যে, এসপি’কে দিয়েও তদন্ত করানো হতে পারে! আগে এ কথা বলেননি কেন?” লক্ষ্মীবাবুকে নিরুত্তর দেখে প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, “রাজ্য সরকার জেলা পুলিশের উপরেই বা এত নির্ভর করে আছে কেন?” অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল জবাব দেন, “ইতিমধ্যে স্থির হয়েছে, সিআইডি-কে দিয়ে তদন্ত করানো হবে। তদন্তের ভার শীঘ্র সিআইডিকে দেওয়া হবে।”

এর পরে সওয়াল করতে ওঠেন বিকাশবাবু। তিনি দাবি করেন, মহিলার উপরে অত্যাচারের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিক আদালত। নির্যাতিতার স্বামীর কৌঁসুলি ফিরোজ এডুলজি’র অভিযোগ, “মহিলার দু’হাতের আটটা আঙুল ভেঙে দেওয়া হয়েছে! হাতের তালুতে ধারালো ব্লেড চালানো হয়েছে!” এই সময়ে প্রধান বিচারপতি সরকারপক্ষের উদ্দেশে বলে ওঠেন, “মহিলার হাতের দিকে তাকান। দেখুন, কী অবস্থা হয়েছে!” চার সপ্তাহ বাদে মামলার ফের শুনানি হবে। রাজ্য সরকারের তদন্ত কত দূর এগোল, তা দেখে তিনি তখন পরবর্তী নির্দেশ দেবেন বলে এ দিন জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি চেল্লুর।

নির্যাতিতা বধূর স্বামী এ দিন আদালতে হাজির ছিলেন। তাঁর কৌঁসুলি ফিরোজ এডুলজি ও সঞ্জীব দাঁ ডিভিশন বেঞ্চকে জানান, তাঁদের মক্কেল পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে আলাদা মামলা দায়ের করতে ইচ্ছুক। ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশে বলা হয়, পৃথক মামলা দাখিল করার স্বাধীনতা ওঁর রয়েছে। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য: তিনি দেখতে চান, ঘটনা সম্পর্কে প্রশাসন আইনানুগ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর মধ্যে নির্যাতিতার স্বামী চাইলে পৃথক মামলা করতেই পারেন। নির্যাতিতার স্বামী আদালতের বাইরে জানান, রাজ্য পুলিশের উপরে তাঁর ভরসা নেই। তিনি চান, সিবিআই তদন্ত করুক। সেই আর্জি জানিয়ে তিনি আলাদা মামলা করবেন।

বীরভূমের পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া এ দিন বলেন, “অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওই ঘটনা নিয়ে আমাকে একটি তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছেন। তার ভিত্তিতেই এসআই কার্তিকমোহন ঘোষকে সাসপেন্ড করা হল।” তবে জেলা পুলিশের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নয় নির্যাতিতার পরিবার। উল্টে প্রশ্ন উঠেছে ঘটনায় পুলিশ যে সব ধারা দিয়েছে, তা নিয়ে। পুলিশ সূত্রের খবর, নির্যাতিতার স্বামীর দায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে পাড়ুই থানা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১ (অন্যায় ভাবে আটকে রাখা), ৩২৪ (মারধর), ৩৫৪ (শ্লীলতাহানি) এবং ৩৪ (একই উদ্দেশ্যে জড়ো হয়ে মিলিত ভাবে একই কাজ করা) ধারায় মামলা রুজু করেছে। একমাত্র ৩২৪ ছাড়া যার প্রত্যেকটিই জামিনযোগ্য। পরিবারের প্রশ্ন, মহিলার উপরে এমন আক্রমণের পরেও পুলিশ কেন ‘নরম’ ধারা দিল? ঘটনায় পুলিশ এবং শাসকদলের কর্মীরা অভিযুক্ত হওয়াতেই এমনটা হল বলে তাঁদের দাবি।

জেলা পুলিশের এই সিদ্ধান্ত প্রাথমিক ভাবে নির্যাতিতার অভিযোগকেই মান্যতা দিল বলে বিরোধীদের দাবি। পাশাপাশি, পুলিশ সুপারের এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে জেলার পুলিশকর্মীদের একাংশের মধ্যে।

তাঁদের কয়েক জনের ক্ষোভ, “এটা এক ধরনের আই-ওয়াশ! এসপি-র অজান্তে কি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় (বর্ধমানের বুদবুদ) গিয়ে এ ধরনের অপারেশন করা কারও পক্ষে সম্ভব? এ-ও বোঝা যাচ্ছে, সে দিনের অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন এসডিপিও-ই (বোলপুর)।” তাঁদের প্রশ্ন, “কেবল নিচুতলার আধিকারিককেই সাসপেন্ড করে পুলিশ-কর্তারা অন্যদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন না তো?” এই অভিযোগ মানতে চাননি জেলার পুলিশ সুপার।

আরও পড়ুন

Advertisement