×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১১ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

শিল্পের সম্ভাবনা জাগিয়েও আখেরে আশাভঙ্গ

বিতান ভট্টাচার্য
নৈহাটি ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪ ০২:১৩
জেনসন অ্যান্ড নিকেলসন কারখানাতেও বন্ধ উৎপাদন।

জেনসন অ্যান্ড নিকেলসন কারখানাতেও বন্ধ উৎপাদন।

শিল্পতালুক হতে পারত নৈহাটি। এ দাবি তার বহু প্রাচীন। কারণ, বৃটিশ শিল্পপতি ম্যাকলিন বেরির হাত ধরে প্রথম যে বড় কারখানাটি তৈরি হয়েছিল অধুনা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে, সেই গৌরীপুর জুটমিল ছিল নৈহাটিতেই। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বর্ধিষ্ণু জনপদ হয়ে উঠতে পারলেও শিল্পের সেই সুদিন আর নেই নৈহাটির।

সিপাহী বিদ্রোহের ধাক্কা সামলেও বৃটিশ সাম্রাজ্যের তখন একচ্ছত্র আধিপত্য। নৈহাটির ‘গৌরীভা’ বা ‘গরিফা’ গ্রামের গঙ্গার ঘাটে বেরি সাহেবের বজরা থেমেছিল। তুখোড় শিল্পপতির মনে হয়ে থাকবে, এই হল কারখানা তৈরির আদর্শ জায়গা। বেরি সাহেব যোগাযোগ করেন ভারতের তদানীন্তন বড়লাট লর্ড ক্যানিংয়ের সঙ্গে। নৈহাটি যে শিল্পে সোনা ফলানোর ক্ষমতা রাখে, তা বুঝতে দেরি করেননি বড়লাটও। সরকারি ছাড়পত্র মিলতেই নৈহাটির গরিফায় রাম ঘাটের কাছে তৈরি হয় জেটি ঘাট। বড় বড় বজরায় আসতে শুরু করে লোহার থাম, যন্ত্রপাতি, ইট, কাঠ। গঙ্গার ধারে ৬০০ একর জমিতে ভূতাত্ত্বিক আর নির্মাণকর্মীদের দিনভর মাপজোক, ইমারত গড়া দেখতে নিস্তরঙ্গ আশপাশের গ্রামগুলি থেকে মানুষের ঢল নামত, এমনটাই জানা গেল পুরনো ইতিহাস ঘেঁটে। বৃটিশ স্থপতিদের সঙ্গে হাত লাগান প্রখ্যাত বাঙালি স্থপতি, গরিফার রায়সাহেব বলরাম সেন।

সেটা ছিল ১৮৬২ সাল। কলকাতা থেকে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া পর্যন্ত ১১১ মাইল পথে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির ট্রেন চালু হয়। আর ওই বছরই মাথা তুলে দাঁড়াল ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের প্রথম চটকল গৌরীপুর জুটমিল। শুরু হল পাটের আঁশ থেকে সোনালি সুতো বের করার কাজ। গৌরীপুর জুটমিলের বস্তা জাহাজে চেপে পাড়ি দিল বিদেশে। নৈহাটির আদি বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি ছিল বিস্ময়ের। তবে মানসিক ভাবে নৈহাটিবাসী চটশিল্পে শ্রমিক হওয়ার কথা ভাবতে পারেননি। কাজেই ডাক পড়ল ভিন প্রদেশের মানুষজনের। তারই সূত্রে সংস্কৃতিসম্পন্ন নৈহাটির আদি রূপ পরিবর্তিত হয়ে শুরু হল ‘কসমোপলিটন’ শহরের পথচলা।

Advertisement

ম্যাকলিন অ্যান্ড মেগর গ্রুপের চটকলের জায়গা ক্রমেই বাড়তে লাগল ১০৪০ একর জমি নিয়ে (বর্তমানে যা গোয়ালাপাড়া ঘাট থেকে গরিফা রামঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত)। চটকলের ব্যবসায় দেদার মুনাফা আসার পরে প্রতিষ্ঠিত চটকলকে ঘিরে একে একে গড়ে উঠেছিল আরও তিনটি কারখানা। যার একটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লিন্সেড অয়েল বা রেড়ির তেল তৈরি হত। এই কারখানার পোশাকি নাম ছিল ‘গৌরীপুর অয়েল’ আর প্রচলিত নাম, ‘তেল কারখানা’। এক সময়ে গোটা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের পথে ঘাটে সাঁজবাতি জ্বলত এই তেলে। রাজভবন থেকে সরকারি দফতর, সেরেস্তা, এমনকী গৃহস্থের বাড়িতেও অন্ধকার নামলে এই তেল কারখানার রেড়ির তেলই ছিল ভরসা।

পরবর্তীকালে পাটের ব্যবসার দিকে আরও বেশি করে মন দিতে চেয়ে বেরি সাহেব লর্ড ইনচ্কেপকে এই তেল কারখানার মালিকানা স্বত্ব দেন। এর পাশেই মাথা তুলেছিল লন্ডনের পিলফার গ্রুপের ক্যাপ প্ল্যান্ট (পরে যার নামকরণ হয়, কন্টেনার অ্যান্ড ক্লোজার) ও বিখ্যাত রঙের কারখানা জেনসন অ্যান্ড নিকেলসন। স্বাধীনতার পরে বেরি সাহেব বৃটেনে ফিরে গেলে অত্যন্ত লাভজনক মিল অধিগ্রহণ করে আইআরসিআই। ১৯৭৫ সালেও গৌরীপুর যে আকাশছোঁয়া লাভের মুখ দেখিয়েছিল, কাগজে-কলমে তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন পরিচালনাই পতন ডেকে আনল। শুরু হল লোকসান। ১৯৭৯ সালে প্রথম লকআউট ছোঁয়া লাগল। গৌরীপুরের সব কারখানাগুলিতেও ছড়াল সেই রোগ। ১৯৭১ সালে ম্যাকলিন বেরির কাছ থেকে গৌরীপুর চটকল কিনেছিলেন খৈতানরা। অধিগ্রহণের গোড়াতেই মুখ থুবড়ে পড়ল পাঁচ হাজার শ্রমিকের পেটে ভাত জোগানো প্রথম সারির চটকলটি। ১৯৭৫ সালে ফের হাত বদল মহাবীরপ্রসাদ পোদ্দার কিনে নেন বেরি সাহেবের সাধের কারখানাটি। ১৯৮২ সাল থেকে একের পর এক লকআউটের কবলে পড়া গৌরীপুর চটকল চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর।

সার্ধ শতবর্ষ পেরিয়ে গৌরীপুর জুটমিল এখন ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের নিভন্ত চিতা। হানাবাড়ির চেহারা নেওয়া চটকলের ভুতুড়ে চিমনিতে শুধু আগাছার আধিপত্য। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির ১১১ মাইলের ট্রেন লাইনও হারিয়ে গিয়েছে। নৈহাটির শিল্প তালুকে অধুনা ‘শিল্পের ফসিল’ ছাড়া কার্যত আর কিছুই মেলে না।


বন্ধ গৌরীপুর জুটমিল। তাই চিমনি দিয়েও বেরোয় না ধোঁয়া।



নৈহাটি রেল স্টেশনের কাছে নদিয়া জুটমিল, হাজিনগরে নৈহাটি জুটমিল, আইপিপি কাগজ কল সব এখন শুধুই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ধুঁকে ধুঁকে চলছে একমাত্র নৈহাটি জুটমিল। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গৌরীপুরের জমিতে ১৩৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের খসড়া চুক্তি হয়েছিল। বিড়লা টেকনোলজিক্যাল সার্ভিস প্রারম্ভিক কাজও শুরু করে। কিন্তু শুরুতেই থমকে যায় এই প্রকল্প। নৈহাটির শিল্প-ভাগ্য এখনও ফেরেনি। স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত নৈহাটিতে শিল্পের বীজ যত বার বোনা হয়েছে, অঙ্কুরোদ্গম হতে না হতেই তা শুকিয়ে গিয়েছে। তার জলজ্যান্ত নজির এক্সপ্রেসওয়ের ধারে বর্তমান সরকারের করা ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল হাব (বঙ্গিক পার্ক)। ইতিমধ্যেই ৯৮ একর জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। চাষিরা আরও জমি দিতে ইচ্ছুক। সরকারও আগ্রহী। তবু দু’টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কারখানার বেশি কিছু হয়নি।

কেন? স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক পার্থ ভৌমিক বলেন, “দিন কয়েক আগেই কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে ৭০ একর জমিতে কারখানা করার ছাড়পত্র মিলেছে। কেন্দ্র ছাড়পত্র না দিলে এই ধরনের হাব-এ কোনও রকম কারখানা গড়া যায় না। রাজ্য সরকার সব সময়েই আগ্রহী। যে কারণে ইতিমধ্যেই ছাড়পত্র মেলা জমিতে ইলেকট্রনিক্স হাব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” বিশ্ব বাংলা সম্মেলনে এই ইলেকট্রনিক্স হাবের সিদ্ধান্তের কথা সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু সে সব যত ক্ষণ না বাস্তবে রূপ পাচ্ছে, তত ক্ষণ নৈহাটিতে ভেসে বেড়াচ্ছে বহু কাজ হারানো শ্রমিকের দীঘজ্ঞশ্বাস। খিদের জ্বালায় বাড়ির মেয়ে-বউদের বেপথু হয়ে পড়ার মতো অভিযোগও উঠেছে। অস্বাস্থ্যকর শ্রমিক মহল্লায় আরও নানা অসামাজিক কাজকর্মের শিকড় গজাচ্ছে। রেড়ির তেলের যুগ পেরিয়ে ঝাঁ চকচকে ত্রিফলার আলোতেও সেই দশা ঘোচেনি খেটে খাওয়া মানুষগুলোর।

(চলবে)

Advertisement