Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

খুনিদের যাবজ্জীবনে একটু শান্তি রিঙ্কুর

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০২:৩০
তখনও সাজা ঘোষণা হয়নি। আদালতে রিঙ্কু ও তাঁর মা। ছবি: সুদীপ ঘোষ।

তখনও সাজা ঘোষণা হয়নি। আদালতে রিঙ্কু ও তাঁর মা। ছবি: সুদীপ ঘোষ।

বিচারকের রায় শুনে আসামির খাঁচার মধ্যেই মাথায় হাত গিয়ে বসে পড়ল এক জন। আর এক জন তখন হাত জোড় করে বিড়বিড়িয়ে ইষ্টনাম জপছে। বাকি রইল এক। সে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে।

তিন মূর্তির নাম মিঠুন দাস, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় ও মনোজিৎ বিশ্বাস। চার বছর আগে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র রাতে দিদির সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে এদের হাতেই খুন হয় কিশোর রাজীব দাস। আর এক ভ্যালেন্টাইনস ডে-র ২৪ ঘণ্টা আগে, শুক্রবার বারাসতের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রবীরকুমার মিশ্র তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেন। সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছ’বছর জেল।

রাজীব হত্যা মামলায় বৃহস্পতিবার তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত বলেছিল, অভিযুক্তদের অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি। ফাঁসিই চেয়েছিলেন রাজীবের পরিবারও। রায়ের পরে রিঙ্কু আর তাঁর বাবা-মার মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে ক্লান্তির ছাপ। রিঙ্কু শুধু বলেন, “ফাঁসিই চেয়েছিলাম। তবে এতেই হয়তো ভাইয়ের আত্মা কিছুটা শান্তি পাবে।”

Advertisement

রায় ঘোষণার পরে এজলাস থেকে একে একে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন সবাই। মিঠুনরা কিন্তু এজলাসের গারদ ধরে দাঁড়িয়েই ছিল। কাছে যেতেই বিশ্বনাথ বলে উঠল, “আমরা নির্দোষ। ফাঁসিয়ে দিল রিঙ্কু আর সিআইডি। ওদিন আমরা ঘটনাস্থলেই ছিলাম না। যারা দোষী তাদের পুলিশ ধরে ছেড়ে দিয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে যাব।”

এ দিন সকাল ১০টা নাগাদ পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মাঝে দোষীদের আদালতে আনা হয়। কোর্ট লকআপে রাখার পর বেলা ১১টা ১০ মিনিটে বিচারক প্রবীরকুমার মিশ্রর এজলাসে তোলা হয় মিঠুন-বিশ্বনাথ-মনোজিৎদের। তিন জনের পরনেই ছিল চেক শার্ট। বিশ্বনাথ সাদা ট্রাউজার ও বাকি দু’জন জিনস পরেছিল।

তত ক্ষণে আদালতে হাজির রাজীবের পরিবার-আত্মীয়েরা। বিচারক অভিযুক্তদের কাছে জানতে চান, নিজেদের পক্ষে তাদের কী বলার আছে। মিঠুন বলে, “আপনি গুরুজন। আপনি আশীর্বাদ করুন, যেন ন্যায়বিচার পাই। আমি নির্দোষ।” বিশ্বনাথও বলে, “আমি নির্দোষ।” মনোজিৎ দাবি করে, “সিআইডি ও পুলিশ আমাদের ফাঁসিয়েছে। আমি যেন ন্যায়বিচার পাই। সব দিক খতিয়ে দেখে যেন সাজা ঘোষণা করা হয়।”

এর পর সরকারি আইনজীবী শান্তময় বসু বিচারকের কাছে আর্জি জানান, চার বছর আগে দিদির সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে ভাবে অভিযুক্তদের হাতে খুন হতে হয়েছিল রাজীবকে, তা বিরলের মধ্যেও বিরলতম। রাজীব পালিয়ে যাওয়ার পরেও যে ভাবে তাকে ধরে এনে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে, সেই নৃশংসতার কথা তুলে এ দিন আদালতে তিনি অভিযুক্তদের ফাঁসির আবেদন করেন। পাল্টা সওয়ালে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী নিমাই রায় বলেন, আবেগ দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচারক যেন তথ্যপ্রমাণগুলি খতিয়ে দেখে সাজা ঘোষণা করেন। দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারক জানান, বেলা ১টা নাগাদ সাজা ঘোষণা হবে।

এর পর ঘড়ির কাঁটা যত এগোয়, ভিড়ে ঠাসা এজলাসে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। উত্তেজনা চাপতে না পেরে রিঙ্কু এজলাসের বারান্দায় পায়চারি শুরু করে দেন। পরে সাক্ষ্যদানের জায়গার কাছে সরকারি আইনজীবীর পাশের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসেন। সেখানেই বসেছিলেন তাঁর মা-ও।

শুধু রিঙ্কুরাই নন, বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ এসেছিলেন এ দিন রায় শুনতে। সকাল দশটা থেকে কোর্ট চত্বরে ভিড় করেন তৃণমূল, বিজেপি ও বামফ্রন্টের মহিলা সমিতির সদস্যরাও। কোর্ট চত্বরের ভেতরে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকরা পতাকা নিয়ে ঢোকার সময় তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পুলিশ বাধা দিতে গেলে কিছুক্ষণের জন্য বিশৃঙ্খলাও তৈরি হয়।

সাজা শোনার পরে রিঙ্কু বলেন, “ফাঁসি হলে বেশি খুশি হতাম। তবু আমরা একটু শান্তি পেয়েছি।” মিঠুনরা যে দাবি করছে, ওরা নির্দোষ? রিঙ্কু বলেন “আমি নিজের চোখে ঘটনার দিন মিঠুনকে দেখেছি আমার ভাইকে মারতে।” বলেন রিঙ্কুর মা বলেন, “ওরা যেমন নিষ্ঠুর ভাবে আমার ছেলেকে মেরেছে, ওরাও যেন জেলে সে রকম যন্ত্রণা ভোগ করে।”

মনোজিতের মা শুধু বারবার বলছিলেন, “রাজীবকে যে ভাবে মরতে হল, আমি তার তীব্র নিন্দা করি। কিন্তু মনোজিৎ এ কাজ করেছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ১৪ ফেব্রুয়ারি ওর জন্মদিন।”

আরও পড়ুন

Advertisement