Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

হয় ফাঁসি, নয় যাবজ্জীবন

রাজীব-হত্যায় দোষী সাব্যস্ত ৩, সাজা আজ

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:০৬
বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার পরেই মেয়ে রিঙ্কুকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজীবের মা।

বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার পরেই মেয়ে রিঙ্কুকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজীবের মা।

রায় ঘোষণা হতেই এক জন এসে জড়িয়ে ধরলেন অন্য জনকে।

এই প্রথম সাক্ষাৎ। দুই প্রৌঢ়ের চোখেই জল। এক জন হলেন বারাসতের রাজীব দাসের বাবা তপন দাস, যিনি বৃহস্পতিবার ছেলের হত্যার বিচার পেলেন। অন্য জনও বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা এক বাবাকামদুনিতে যাঁর কলেজ-ছাত্রী মেয়েকে খুন করা হয়েছিল গণধর্ষণ করে। রাজীব-হত্যার রায় শুনতে তিনিও এ দিন বারাসত কোর্টে হাজির হয়েছিলেন। নিজের মেয়ের খুনিদের সঙ্গে সঙ্গে অনাত্মীয় কিশোরটির ঘাতকদেরও জন্যও তিনি ফাঁসির সাজা চান।

রাজীব দাসকে খুন করার জন্য বারাসত আদালত এ দিন দোষী সাব্যস্ত করেছে তিন জনকে। বারাসতের নিবেদিতাপল্লির বাসিন্দা সেই মিঠুন দাস, বিধাননগরের বাসন্তী কলোনির মনোজিৎ বিশ্বাস ওরফে রাজু এবং মধ্যমগ্রামের নিউ খুলনাপল্লির বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় ওরফে বাবুর সাজা ঘোষণা হবে আজ, শুক্রবার। এ দিন বারাসতের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রবীরকুমার মিশ্র জানিয়ে দেন, তিন যুবকের যা অপরাধ, তার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি। সর্বনিম্ন সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন কারাবাস।

Advertisement

২০১১-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র রাতে দিদির আব্রু বাঁচাতে গিয়ে ছুরিকাহত হয়েছিল সে বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী রাজীব। বারাসত স্টেশন থেকে ফেরার পথে। মদ্যপ দুষ্কৃতীরা যখন ভাইকে কুপিয়ে-পিটিয়ে মারছে, অসহায় দিদি মাথা কুটেছিলেন প্রশাসনিক কর্তাদের বাংলোর ফাটকে। কেউ আসেনি। পর দিন রাজীবের মৃত্যু হয়। তোলপাড় পড়ে যায় রাজ্য-রাজনীতিতে। ২১ ফেব্রুয়ারি সিআইডি খুনের তদন্তে নামে। ১৩ এপ্রিল মিঠুন-রাজু-বাবুর নামে চার্জশিট পেশ হয়। ১৫ জুন দেওয়া হয় অতিরিক্ত চার্জশিট।

তার পরে মামলা গড়িয়েছে প্রায় চার বছর। অবশেষে রাজীব হত্যা-মামলার রায় হতে চলেছে জেনে এ দিন সকাল থেকে বারাসত কোর্ট চত্বর মানুষ-মানুষে ছয়লাপ! রাজীবের বাবা তপনবাবু, মা গায়ত্রীদেবী, দিদি রিঙ্কু চলে আসেন বেলা দশটার মধ্যে। রিঙ্কু সাইকেলে, বাকিরা ভ্যানরিকশায়। সঙ্গে ছিলেন পরিজন-বন্ধুরা। মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি করতে দেব না বলে সে দিন যাঁরা সরব হয়েছিলেন, রাজীবের সেই বন্ধু যাদব দাস, সম্রাট ভৌমিক, কৃষ্ণ দাসেরাও সকাল দশটার মধ্যে হাজির হয়ে যান।


২০১১-র সেই দিনের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতা।



আর দশটার একটু আগে দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ঘিরে বারাসত কোর্টে আনা হয় তিন অভিযুক্তকে। সরকারি কৌঁসুলি শান্তময় বসু বিচারের আবেদন জানালে বিচারক অভিযুক্তদের নাম ধরে ডাকেন। এজলাসের ভিতরে মনোজিৎ তখন চোখ বুজে বিড়বিড় করছে। মূল অভিযুক্ত মিঠুনের চোখ-মুখ ভাবলেশহীন। বিচারক জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩৫৪ (শ্লীলতাহানি) ও ২৫এ (অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখা) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি কী, তা-ও জানিয়ে দেন।

আর তার পরেই বিচারক বলেন, “তোমাদের দোষী সাব্যস্ত করা হল। আগামী কাল সকাল সাড়ে দশটায় সাজা ঘোষণা হবে।”

মাত্র চার মিনিটে আদালতের কাজ শেষ! রায় শোনামাত্র বাইরে সমবেত জনতা হর্ষধ্বনি দিয়ে ওঠে। রিঙ্কুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আমার ফুলের মতো ছেলেটাকে যারা এমন ভাবে মারল, তাদের ফাঁসি চাই।”

রিঙ্কুর চোখে অবশ্য জল ছিল না। ছিল আগুন, যা গত চার বছর ধরে তাঁকে দিবারাত্র দগ্ধে মারছে। “সে রাতে বাংলোর গেট ঝাঁকিয়ে পুলিশকে বারবার ডেকেছি। তারা এগিয়ে এলে ভাইকে মরতে হতো না।” ক্ষোভে, দুঃখে বুজে আসে দিদির স্বর। তাঁর প্রশ্ন, “এই অপরাধেও যদি ফাঁসি না হয়, তা হলে অপরাধীরা আর ভয় পাবে কীসে?”


বারাসত আদালতে দোষীরা— মিঠুন দাস, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, মনোজিৎ বিশ্বাস।



বাবা জানিয়েছেন, রায় হবে শোনা ইস্তক গত তিন দিন মেয়ে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। “বুধবার রাতে তো বাড়ির কেউ ঘুমোইনি।” বলেন তপনবাবু। বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন রাজীবের বন্ধুরাও। যাদব দাসের কথায়, “চার বছর ধরে এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। গত তিন বছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে রাজীবের স্মরণসভা করছি। এ বার আরও বড় করে করব।” কামদুনির নিহত ছাত্রীর বাবার মন্তব্য, “আমার মেয়ের খুনিদের বিচার এখনও শেষ হয়নি। এই রায় শুনে কিছুটা জ্বালা মেটাতে এসেছি। আমরা চাই, রাজীবের খুনিদের প্রাণদণ্ড হোক। আমার মেয়ের খুনিরাও যেন ফাঁসিকাঠ থেকে রেহাই না-পায়।”

সরকারি কৌঁসুলি শান্তময়বাবু জানিয়েছেন, রাজীব-হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, রিঙ্কু ছাড়াও ওই রাতে ঘটনাস্থলে ছিলেন দুই ব্যক্তি কৈলাস রাউত ও মহম্মদ আজহার। তাঁরা ভ্যানরিকশায় চেপে বারাসত স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। ভাইকে বাঁচানোর জন্য রিঙ্কু তাঁদের হাতে-পায়ে ধরে সাহায্য চান। ওঁরা বাধা দিতে এগিয়ে গিয়েও পিছিয়ে আসেন, কারণ দুষ্কৃতীরা তাঁদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল।

পরে রিঙ্কু তো বটেই, কৈলাস ও আজহারও টিআই প্যারেডে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করেছেন। সাক্ষ্যও দিয়েছেন।

ছবি: সুদীপ ঘোষ।

আরও পড়ুন

Advertisement