দিল্লি সফরে এসে মন্ত্রিসভা গঠনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সূত্রের মতে, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে যে করেই হোক মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ সেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার পিছনে মতপার্থক্য দায়ী কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের মধ্যেই! এ দিকে আজ রাজ্যের আর্থিক দাবি-দাওয়া তথা রাজ্যের জন্য বিশেষ আর্থিক সাহায্য কী ভাবে পাওয়া সম্ভব, তা নিয়েও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বৈঠককরলেন শমীক।
গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন শুভেন্দু। তাঁর সঙ্গে শপথ নেন আরও পাঁচ মন্ত্রী। তার পরে দু’সপ্তাহ কেটে গিয়েছে, এখনও চূড়ান্ত হয়নি মন্ত্রিসভা। এরই মধ্যে দিল্লি এসে ঘুরে গিয়েছেন শুভেন্দু-শমীক দু’জনেই। একই শহরে থাকলেও, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করেন দুই নেতাই। সূত্রের মতে, আলোচনা হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ নিয়েও। সূত্রের মতে, মন্ত্রিসভা গঠনের প্রশ্নে ইতিমধ্যেই রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। যাতে প্রায় চল্লিশ জন বিধায়কের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। রিপোর্টে ওই বিধায়কদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলির যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনই বিধায়করা কোন জাতের প্রতিনিধিত্ব করেন, কোন এলাকা থেকে কাকে হারিয়ে জিতেছেন, তারও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
সূত্রের মতে, এ বারের মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্যকে বজায় রেখে এবং মূলত তরুণ মুখকেই প্রাধান্য দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে। দলের বক্তব্য, রাজ্যের সব অঞ্চলের, সব জাতের প্রতিনিধিত্ব যাতে মন্ত্রিসভায় সমান ভাবে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জোর দেওয়া হয়েছে মহিলা প্রতিনিধিত্বের উপরেও। কিন্তু বিজেপির একটি সূত্রের মতে, তালিকায় এমন কিছু নাম রয়েছে, যা নিয়ে সম্ভবত আপত্তি রয়েছে আরএসএসের। বিশেষ করে শিক্ষা, কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকে নিজেদের লোক বসানোর পক্ষপাতী আরএসএস। বিজেপির একাংশের মতে, চূড়ান্ত মন্ত্রিসভা গঠন না হওয়ার পিছনে ওই টানাপড়েনঅনেকাংশেই দায়ী।
এ দিকে, আজ সকালে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বৈঠক করেন শমীক ভট্টাচার্য। বৈঠকে রাজ্যকে কী ভাবে কোন পথে আর্থিক সাহায্য দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আগামী এক বছরের মধ্যে রাজ্যের ছবি পাল্টাতে মরিয়া নতুন বিজেপি সরকার। কিন্তু অন্তরায় হল, নতুন সরকারের মাথায় বিপুল ঋণের বোঝা, সপ্তম বেতন কমিশন, সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ। তার সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে বেশ কিছু জনমোহিনী প্রতিশ্রুতি পালনের চাপের বিষয়টিও।
ওই বিপুল অর্থের জোগান কোথা থেকে হবে, সেই প্রশ্নের জবাবে শমীক বলেন, ‘‘রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন নির্মলা। তিনি বাংলাকে যথাসম্ভব সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছেন। কোন পথে রাজ্যকে সাহায্য করা সম্ভব, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রকে চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছে।’’ শমীকের দাবি, আগামী দিনে রাজ্যে যাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তার জন্যও দরবার করেছেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হল, বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে সামগ্রিক ভাবে বিদেশি বিনিয়োগ কতটা আসবে, সেটা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসনের একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে করোনার মধ্যেও ভারতে যেখানে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি এসেছিল ৩৮৬০ কোটি ডলার, সেখানেই তা ২০২৪-২৫ সালে নেমেছিল মাত্র ১০০ কোটিতে। ২০২৫-২৬ সালের এপ্রিল-ডিসেম্বরে সামান্য মুখ তুললেও, হয়েছে ৩০০ কোটি ডলার। বর্তমান টালমাটাল বিশ্বে কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে, তা নিয়ে আশঙ্কায় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরাও।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের মাটির তলায় থাকা অশোধিত তেল (অশোকনগর, রানাঘাট), বিরল খনিজ পদার্থ (পুরুলিয়া), ম্যাঙ্গানিজ আকরিক (ঝাড়গ্রাম) যাতে উত্তোলন করা সম্ভব হয়, তার জন্য নির্মলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলির কাছে দরবার করেছেন শমীক। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে মাটির যা তেল ও খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা যদি উত্তোলিত করা যায়, তা হলে রাজ্যের আর্থিক ছবি পাল্টে যাবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)