গবাদি পশু, বিশেষত গরু ও মোষের বেআইনি কেনাবেচায় কড়াকড়ির জেরে কার্যত বন্ধের মুখে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার পশু-হাটগুলি। তার ধাক্কা লাগছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। ওই হাটগুলিতে বছরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হত। ফলে, আর্থিক সঙ্কট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি হাট কর্তৃপক্ষের।
পুরুলিয়ার কাশীপুর ব্লক সদরের শতাব্দী প্রাচীন হাটের ইজারাদার বাবলু কর বলছেন, “গরু, মোষের কেনাবেচা বন্ধ হওয়ায় লোকসানে হাট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ইজারা-বাবদ অগ্রিম যে টাকা জমা দিয়েছিলাম, তা ফেরত দিয়ে প্রশাসনই হাট পরিচালনা করুক।” অবিলম্বে পশু-হাটে বেচাকেনা চালুর দাবিতে শনিবার রানিবাঁধের ঘোড়াধরা হাট চত্বরে বিক্ষোভ দেখান পশুপালক, ক্ষুদ্র চাষি-সহ ক্রেতা ও বিক্রেতারা। তাঁদের দাবি, গরু-বাছুর কেনাবেচা বন্ধ রেখে হাট চালানো যাবে না। এমনকি, গবাদি পশুর কেনাবেচা বন্ধ থাকলে সম্পূর্ণ হাটই বন্ধ করে দেওয়ার দাবি ওঠে। গবাদি পশু কেনাবেচায় নতুন সরকারি নির্দেশিকার সরলীকরণের দাবিও জানানো হয়েছে।
শুধু পশু-পাখি নয়, এই সব হাটে হস্তশিল্পের সামগ্রী, বনজ সম্পদ, আনাজ, পোশাক, গৃহসজ্জার সামগ্রীর মতো নানা জিনিসের কেনাবেচা চলে। কিন্তু গরু, মোষের বেচাকেনা বন্ধ হওয়ায় হাটে লোকজনের আনাগোনা কমেছে। তাতে কমেছে অন্য জিনিসের বিক্রিও। তবে মূল সমস্যায় পড়েছেন যাঁরা মূলত গোরু, মোষ কেনাবেচায় যুক্ত। বাঁকুড়ার বড়জোড়ার চাষি নোজাই তরফদার জানান, বাড়িতে দু’টি বলদ রয়েছে। সেগুলি হাটে বিক্রি করবেন ভেবেছিলেন। তিনি বলেন, “চাষের মরসুমের আগে বলদের চাহিদা বাড়ে। এই সময় ছাড়া আর বিক্রি হবে না। খুব চিন্তায় পড়েছি।” খাতড়ার মশড়া গ্রামের পশুপালক শঙ্কর মাহাতোর কথায়, “গরু কিনে বাড়িতে কয়েক মাস রেখে হাটে বেচতাম। এই মুহূর্তে আটটি গরু রয়েছে। বিক্রি করতে পারছি না। তাদের খাবার জোগান দেওয়াই মুশকিল হচ্ছে।” ঝালদার পুস্তির বাসিন্দা প্রীতম কুমারও হাটে এসেছিলেন বলদের কেমন দাম পাওয়া যাবে, তার খোঁজ নিতে। তিনি বলেন, “ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। পোষা বলদ দু’টো বিক্রি করে ঋণশোধ করব ভেবেছিলাম। কিন্তু গরু কেনাবেচাই তো বন্ধ করা হয়েছে।”
গরুর বেচাকেনা বন্ধে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে চাষেও। ঝালদা শহর লাগোয়া মসিনা গ্রামের মহাদেব মাহাতো বলেন, “চাষের মরসুম আসছে। বলদ কিনতে হাটে এসেছিলাম। কিন্তু হাট পুরো খাঁ-খাঁ করছে। বলদ না পেলে চাষই করা যাবে না।” তাঁর দাবি, বড় চাষিরা ট্র্যাক্টরে জমি চষেন। কিন্তু তাঁদের মতো প্রান্তিক চাষিদের ভরসা বলতে বলদে টানা লাঙলই। কাশীপুরের হাটের ইজারাদার বাবলুর দাবি, গবাদি পশুর বিক্রিবাটাতেই হাট জমত। তা বন্ধ হওয়ায় সব কিছুর বেচাকেনা কমেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে।
একই ছবি বাঁকুড়াতেও। বড়জোড়ার হাটআশুড়িয়ার ফল ব্যবসায়ী ভোলা মিদ্যা বলেন, “হাটের দিনে ব্যবসায় মোটা রোজগার হত। এখন তা বন্ধ হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।” নানা হাটে ঘুরে ঘুরে খাবার বিক্রি করা বীরভূমের চঞ্চল কাজিরও আক্ষেপ, “প্রায় কুড়ি বছর ধরে হাটে হাটে খাবার বিক্রি করেই রোজগার করি। বীরভূম ও বাঁকুড়ার প্রায় সব হাটেই দোকান দিই। হাট বন্ধ হওয়ায় রোজগারও বন্ধ।”
রানিবাঁধের ঘোড়াধরা হাটে মিষ্টি ব্যবসায়ী সুভাষ দে জানান, হাটের দিনগুলিতে দোকানে কম-বেশি ১৫ হাজার টাকার বেচাকেনা হত। পশুহাট বন্ধ হতে সেই রোজগার উধাও। তিনি বলেন, “হাটের দিনে দোকানে তিন জন অতিরিক্ত কর্মী রাখি। কিন্তু এখন আর তাঁদের বেতন দেওয়ারও সামর্থ নেই।” এমন কর্মহীন পরিস্থিতি কল্পনার বাইরে ছিল জানিয়ে রানিবাঁধের তুংচাঁড়র গ্রামের পশু ব্যবসায়ী আলোক দাস, বাঁকুড়ার সুনুকপাহাড়ি হাটের গামছা বিক্রেতা ইঁদপুরের আশিস তন্তুবায়দের আক্ষেপ, গরুহাট বন্ধ হওয়ায় গ্রামের অনেকে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন। হাট চালু না হলে গ্রামীণ অর্থনীতিই বসে যাবে।
রানিবাঁধের বিধায়ক তথা মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু বলেন, “নতুন নির্দেশিকা কার্যকর করতে প্রথম দিকে কিছু অসুবিধা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে ধীরে ধীরে মানুষ এই ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। ভবিষ্যতে চাষি থেকে ব্যবসায়ী, সকলেই উপকৃত হবেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)