আন্তর্জাতিক স্তরে জাল নথি বানিয়ে অনাবাসী ভারতীয় কোটায় বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তিতে দুর্নীতি হয়েছিল বলে আদালতে চার্জশিট পেশ করে দাবি করল ইডি। সম্প্রতি বিচার ভবনের সিবিআই বিশেষ আদালতে ওই চার্জশিট জমা দিয়েছে তারা। তাতে মামলার তদন্তকারী অফিসারের দাবি, ভুয়ো পাসপোর্ট, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের অনুমোদনপত্র, অনাবাসী ভারতীয়দের পরিচয়পত্র ও সুপারিশপত্র তৈরি করে টাকার বিনিময়ে ওই দুর্নীতি করা হয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও বিহারের বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজেও। আদালত সূত্রের খবর, ইডি-র দাখিল করা চার্জশিটে ১০টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ট্রাস্ট এবং ১৮ জন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত হিসাবে দেখানো হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, এই ভর্তি-দুর্নীতিতে পশ্চিমবঙ্গে আঁতুড়ঘর ছিল যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ। চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসাবে ওই হাসপাতালের এক কর্তা এবং এক আধিকারিকের নাম রয়েছে। তদন্তকারীদের কথায়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি পরিচালনার দায়িত্বে সাধারণত থাকে বিভিন্ন ট্রাস্ট। সেই সব ট্রাস্টের সহায়তায় তৈরি করা হত জাল নথি। যার ভিত্তিতে টাকার বিনিময়ে পড়ুয়াদের ভর্তি করা হত।
কী ভাবে চলত গোটা দুর্নীতি-চক্র?
তদন্তকারীদের কথায়, প্রথমে বিভিন্ন অনাবাসী ভারতীয়ের নামের তালিকা তৈরি হত। জোগাড় করা হত তাঁদের ছবি ও বিদেশের ঠিকানা। সংশ্লিষ্টদের নামে জাল পাসপোর্ট, ভিসা এবং ভর্তির সুপারিশপত্র তৈরি করা হত। সেই জাল নথি জমা দেওয়া হত বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে। অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন সংশ্লিষ্ট বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের একাংশও। তদন্তকারীদের দাবি, মূলত অযোগ্য প্রার্থীদের মোটা টাকার বিনিময়ে ভর্তি করা হয়েছিল। সেই পড়ুয়ারা অধিকাংশ সময়ে কলেজে আসত না। পরীক্ষার সময়েও অসুস্থ দাবি করে চিকিৎসকের শংসাপত্র দেখিয়ে গরহাজির থাকত। অথচ, প্রতিটি সিমেস্টারে তাদের উত্তীর্ণ দেখানো হত।
তদন্তকারীদের দাবি, ২০১৯ সালে এই ভর্তি-দুর্নীতির সূত্রপাত। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তদন্তকারীদের কথায়, আপাতত প্রথম চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে দ্বিতীয় চার্জশিট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ইডি সূত্রে দাবি, এই ভর্তি-দুর্নীতির সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকায় আছেন এই রাজ্যের একাধিক নেতা, মন্ত্রী ও পুলিশকর্তার পরিজনেরা। প্রসঙ্গত, জালিয়াতির মাধ্যমে জোর করে জমি দখল এবং সেই জমিতে অবৈধ নির্মাণের মামলায় বর্তমানে ইডি-র হেফাজতে থাকা কলকাতা পুলিশের উপ-নগরপাল শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে ভর্তি-দুর্নীতির এই মামলাতেও তলব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি হাজিরা দেননি। ইডি সূত্রের দাবি, তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৯-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে শান্তনুর ছেলেকে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল। মোটা টাকার বিনিময়ে নিজের ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন শান্তনু। কয়লা পাচারের টাকা সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের আরও দাবি, বাঁকা পথে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন পূর্বতন রাজ্য সরকারের এক মন্ত্রী তথা পুরকর্তার মেয়েও। তাঁর ভর্তিতে ব্যবহার হওয়া যাবতীয় জাল নথি উদ্ধার হয়েছে। ইডি-র একটি সূত্রের দাবি, ওই প্রাক্তন মন্ত্রী কসবার রাজডাঙায় সরকারি জমি দখল করে একটি বেসরকারি হাসপাতাল তৈরি করছেন। নিজের মেয়েকে তিনি ওই হাসপাতাল উপহার হিসেবে দেবেন বলে স্থির করেছেন। তদন্তকারীদের কথায়, আলিপুরের এক আইনজীবীর মাধ্যমে সব নথি জাল করা হত। তিনি শান্তনু সিংহ বিশ্বাস এবং রাজ্যের ওই প্রাক্তন মন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
ইডি-র আইনজীবী অরিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘মোটা টাকার বিনিময়ে চিকিৎসক তৈরির খেলা শুরু হয়েছিল। অভিযুক্তদের বয়ান লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে বৈদ্যুতিন এবং লিখিত নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সেই সব নথির ভিত্তিতে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দেওয়া হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)