এই ভরা জোয়ারের মধ্যে বিজেপির ফলতা জয় নিয়ে কোনও সংশয়ই ছিল না।
কৌতূহল ছিল ফলের ভিতরকার বিবিধ অঙ্ক নিয়ে। ৭০ শতাংশের মতো হিন্দু ভোটারের আসনে কত ভোট পাবে বিজেপি? পুনর্নির্বাচনের ময়দান ছেড়ে ‘পালানো’ তৃণমূলকে এর পরেও কত মানুষ ভোট দেবেন? দু’বছর আগে ৮৯ শতাংশ ভোট পাওয়া দল কি দ্বিতীয় স্থানেও থাকবে? না কি অন্য কেউ উঠে আসবে? এলে কারা? সংখ্যালঘু ভোটারেরা কি তৃণমূলের বিকল্প দল খুঁজতে শুরু করে দিয়েছেন? এমন বেশ কিছু প্রশ্ন ছিল। যার উত্তর অনেকাংশে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে গণনা শেষ হতে হতে।
তৃণমূল লড়ে হারলে ফলতার ফলাফল থেকে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট হত অবশ্যই। তা সত্ত্বেও এই ফল গুরুত্বহীন নয়। কারণ, এই পুনর্নির্বাচনেও ৮৮ শতাংশের বেশি মানুষ বুথে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ফলতার জনবিন্যাসে মুসলিম ভোট রয়েছে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৩০ শতাংশ। বাকিটা মূলত হিন্দু ভোটার। এই ধরনের আসনগুলিতে এত দিন এগিয়ে থাকত তৃণমূল। কারণ, সংখ্যালঘু ভোট এককাট্টা হয়ে তৃণমূলের দিকে থাকত। হিন্দু ভোটের তিন ভাগের এক ভাগের মতো পেয়ে গেলেই জয় নিশ্চিত ছিল। মহিলা হিন্দু ভোটাররা এ ক্ষেত্রে বড় ভরসা ছিলেন মমতার। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের ফল দেখিয়ে দিয়েছে, মুসলিম মেরুকরণের পাল্টা হিন্দু মেরুকরণও হয়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতির বাতাবরণে। ফলে তৃণমূলের ‘নিশ্চিত’ বহু আসন এ বারের নির্বাচনে বিজেপি জিতে নিয়েছে। বিজেপি সরকারে আসার পর এবং গত ২০-২২ দিনে তৃণমূলের ভঙ্গুর দশা বার বার বেআব্রু হয়েছে।
তবে শুধু সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সমীকরণ নয়, ফলতার মতো আসনে গায়ের জোরে ভোট করানোর অভিযোগ অতীতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে উঠেছে। বিশেষত ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে। পুনর্নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘‘১৫ বছর পরে যখন মানুষ নিজের ভোট নিজে দেওয়ার স্বাধীনতা ফিরে পেলেন, তখন বাস্তব প্রকাশিত হল।’’ একই সঙ্গে শুভেন্দু আঙুল তুলেছেন ২০২৪ সালের দিকে, ‘‘বিগত নির্বাচনকে পরিহাসে পরিণত করে এই বিধানসভা (ফলতা) ক্ষেত্রে দেড় লাখ ভোটের লিড নিয়েছিল তৃণমূল।”
তবে নানা কারণে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক যে তৃণমূলের দিকে মোটামুটি এককাট্টা থাকত তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তৃণমূল ক্ষমতা হারানোর পর ফলতার পুনর্নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বাম-কংগ্রেসের নেতারা বলতে শুরু করে দিয়েছেন, তৃণমূলের যা অবস্থা তাতে এই দলটা কত দিন টিকবে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ফলে সংখ্যালঘু ভোট বাম-কংগ্রেসের দিকে অবধারিত ভাবে আসবে। কিন্তু সেটা যে এত দ্রুত হবে, তা অনেকেরই কল্পনার মধ্যে ছিল না। সে দিক থেকে ফলতার ভোটে সিপিএমের দুই নম্বরে উঠে আসা ভোটের সমীকরণের দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। হতে পারে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঘরে ঢুকে পড়া’ বা জাহাঙ্গিরের লড়াই থেকে সরে যাওয়া এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করল।
সিপিএম এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল শম্ভুনাথ কুড়মিকে। তিনি হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণি থেকে উঠে আসা। দলের সর্বক্ষণের কর্মী। সিপিএম সরকার থেকে চলে যাওয়ার পরে ২০১২ সাল নাগাদ তিনি দলের সর্বক্ষণের কর্মী হন। অন্য দিকে কংগ্রেস ও তৃণমূলের ছিল সংখ্যালঘু প্রার্থী। কংগ্রেস প্রার্থী করেছিল আব্দুর রেজ্জাক মোল্লাকে। তৃণমূল প্রার্থী করেছিল জাহাঙ্গির খানকে, যিনি পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগেই ময়দান ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের থেকে কোনও সাহায্য না-পেয়ে। পুনর্নির্বাচনের বুথওয়ারি ফলাফল এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গণনাকেন্দ্র থেকে চুঁইয়ে যে খবর আসছে তাতে এটুকু স্পষ্ট, তৃণমূলের জাহাঙ্গির বা কংগ্রেসের আব্দুর যেটুকু ভোট পেয়েছেন— তার প্রায় পুরোটাই সংখ্যালঘু ভোট। অন্য দিকে সিপিএম যে ভোট পেয়েছে তার ষোলো আনার মধ্যে অন্তত চোদ্দো আনাই মুসলিম ভোট। ফলে এই ফলাফল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— মুসলিম ভোট তিন ভাগে ভাগ হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ সংখ্যালঘু ভোটার বিজেপির বিকল্প হিসাবে আস্থা রেখেছেন সিপিএমের প্রতি। তবে এ-ও ঠিক, তৃণমূল যদি রণে ভঙ্গ না-দিত, তা-হলে সংখ্যালঘু ভোট এই মাত্রায় সিপিএমের দিকে চলে যেত কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ২৮৫টি বুথ রয়েছে। সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ যখন পুনর্নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়েছিলেন, তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল— “আপনাকে তো আবার প্রচার করতে হচ্ছে।” প্রশ্নকর্তাকে থামিয়ে দিয়েই তিনি বলেছিলেন, “আবার নয়, এ বার প্রচার করছি।” সিপিএম প্রার্থীর দাবি ছিল, জাহাঙ্গিরের দাপটে আগে ঠিকমতো প্রচারই করতে পারেননি তিনি। ২৮৫টি বুথের মধ্যে তিনটি বুথে একদিন প্রচার করেছিলেন মাত্র। ওই সময়ে পরিবেশ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বাকি জায়গায় যাওয়ার সুযোগই পাননি তিনি। এ বার প্রচার করার পরে দেখা গেল, সিপিএম দুই নম্বরে উঠে আসতে পারল। এমনকি শুরুর দিকে কয়েকটি রাউন্ডে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডাকে টক্করও দিয়েছিলেন সিপিএমের শম্ভুনাথ। যদিও পরের রাউন্ডগুলিতে ধারাবাহিক ভাবে একতরফা এগিয়ে যায় বিজেপি।
শেষ পর্যন্ত এক লক্ষেরও বেশি ভোটে ফলতা জিতে নিয়েছে বিজেপি। পদ্মশিবিরের দেবাংশু পান্ডা পেয়েছেন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬৬৬ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন সিপিএমের শম্ভুনাথ। তিনি পেয়েছেন ৪০ হাজার ৬৪৫ ভোট। কংগ্রেস হয়েছে তৃতীয়। তারা পেয়েছে ১০ হাজারের কিছু বেশি ভোট। চতুর্থ স্থানে নেমে আসা তৃণমূল পেয়েছে ৭ হাজার ৭৮৩ ভোট।
পরিবর্তনের পরিবর্তন
২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে সংখ্যালঘু ভোট বামেদের দিক থেকে তৃণমূলের দিকে সরতে শুরু করেছিল। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট এবং ২০১১ সালের পুরসভা ভোটে তা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকারে আসার সময়ে সংখ্যালঘু ভোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহাকরণে যাওয়ার অন্যতম রাস্তা হয়ে উঠেছিল। তার পরে গত দেড় দশকে এই সংখ্যালঘু ভোটকে ক্রমশ ‘পুঁজিতে’ পরিণত করেছিল তৃণমূল। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে ২৯৩ আসনের ফলাফলে দেখা গিয়েছে, বহু জায়গায় তৃণমূলের দিকে থাকা সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরেছে। কোথাও সিপিএম, কোথাও কংগ্রেস, কোথাও আইএসএফ, কোথাও আবার হুমায়ুন কবিরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি আঘাত দিয়ে ফেলেছে সেই পুঁজিতে। এত দিন বিজেপি-কে ঠেকাতে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার যে ‘বাধ্যবাধকতা’ সংখ্যালঘু ভোটারদের ছিল, ক্ষমতাহীন তৃণমূল ছন্নছাড়া হয়ে পড়লে তার বিকল্প খোঁজা শুরু হয়ে যাবে। সেটা একদলকেন্দ্রিক না বহুদলকেন্দ্রিক হবে তার উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। লড়াইয়ে সিপিএম এবং কংগ্রেস যেমন রয়েছে, রয়েছেন নওশাদ সিদ্দিকি বা হুমায়ুন কবীরের মতো সংখ্যালঘু নেতারাও।
এর পরেই নন্দীগ্রাম
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে দু’টি কেন্দ্র থেকে লড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী— ভবানীপুরে এবং নন্দীগ্রামে। ভবানীপুরে হারিয়েছেন মমতাকে। নন্দীগ্রামেও জিতেছেন শুভেন্দু। তবে নিয়ম অনুযায়ী, একটি আসন তাঁকে ছাড়তেই হত। মমতাকে হারানো ভবানীপুর আসন ধরে রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রামের বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। ফলে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন আসন্ন। পূর্ব মেদিনীপুরের হলদি নদীর তীরে এই জনপদে ফলতার মতোই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে তৃণমূল কাকে প্রার্থী করে। পাশাপাশি বাম, কংগ্রেস বা আইএসএফ-এর মতো দলগুলির মধ্যে কী বোঝাপড়া হয় নন্দীগ্রামে এবং সেখানে ভোটের ফল কী হয়, সে দিকেও নজর থাকবে। ওই ভোটের ফলাফল থেকেই দক্ষিণবঙ্গের সংখ্যালঘু ভোটের নতুন প্রবণতার বিষয়ে দিশা পাওয়া যাবে।