×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১২ জুন ২০২১ ই-পেপার

বাংলার নবজাগরনের অন্যতম পথিকৎ ডিরোজিও

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
২১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:০০
ডিরোজিও। অঙ্কন: বিমল দাস।

ডিরোজিও। অঙ্কন: বিমল দাস।

বহু যুগের কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বদ্ধ, জীর্ণ এই সমাজে তিনি ঝড় তুলেছিলেন। জন্ম সূত্রে বাঙালি না হলেও বাঙালিদের সঙ্গে মনে প্রাণে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। একাধারে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এই মানুষটি তাঁর উপলব্ধি আর কর্মোদ্যমে বদলাতে চেয়েছিলেন সমাজটাকে। তার পরিণামে জুটেছিল অপমান, তাচ্ছিল্ল্য আর দারিদ্রতা।— সেকেলে রক্ষণশীল বাঙালির কাছে তিনি ছিলেন ‘দ্রজু ফিরিঙ্গি’। তিনি উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক অবিস্মরণীয় নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।

হেনরির জন্ম ১৮০৯-এর ১৮ এপ্রিল কলকাতার মৌলালি অঞ্চলে এক ইউরেশীয় পরিবারে। তাঁর বাবার নাম ফ্রান্সিস, মা সোফিয়া। মাত্র ছ’বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন হেনরি। পরে তাঁর বাবা আনা মারিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলাকে বিবাহ করেন। আনার নিজের সন্তানাদি না থাকায় সতীনের সন্তানদের নিজের ছেলে মেয়ের মতোই দেখতেন।

শোনা যায় হেনরি বেশ সচ্ছল পরিবারে জন্মেছিলেন। পোশাকে কিংবা সাজসজ্জায় তিনি সব সময়ে পরিপাটি থাকতেন। মাথার মাঝখানে সিঁথি, সচরাচর টুপি পরতেন না। এটাই তাঁর পরিচিত ছবি। শীতকালে ময়দানে ক্রিকেট খেলতেন বন্ধুদের সঙ্গে, আর ছিল ঘোড়ায় চড়ার শখ।

Advertisement

সে সময় ইউরেশীয়রা ছিল সমাজে একটি নিপীড়ীত সম্প্রদায়। আইন আদালতের ক্ষেত্রেও তাঁদের জন্য ছিল বিচিত্র নিয়ম কানুন। সে সময়ে উকিল কিংবা অন্যন্য বেশ কিছু পেশায় তাঁদের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ মিলত না এই সম্প্রদায়ের মানুষের। এ সকল বিষয়ে ডিরোজিও সচেতন ছিলেন। ডিরোজিও নিজ সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন। আর এটাও জানতেন তাঁর আন্দোলনের পথে কোনও রকম সংকীর্ণতা বা ধর্মান্ধতা কিংবা বিভেদকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আর হয়তো এই কারণেই সে কালের সবচেয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক জন মানুষ হয়েও হিন্দু সমাজে আলোড়ন তুলতে পেরেছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল খ্রিস্টান এবং হিন্দুরা নানা ভাবে তাঁর বিরোধিতা করলেও তাঁকে উপেক্ষা করতে পারেননি।

হেনরির ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁর শিক্ষক ডেভিড ড্রামন্ডের। জীবনের ছয় থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত হেনরি ড্রামন্ডের স্কুলে পড়েছিলেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ডিরোজিও শিক্ষা জীবন শেষ করে উচ্চতর বিদ্যার্জনে না গিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। নিজের শিক্ষা অসমাপ্ত রাখলেও তাঁর ছোট ভাইকে স্কটল্যান্ডে পাঠানোর ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন।

তবে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়নি। প্রথমে তাঁর বাবা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন সেখানে যোগ দেন। কিন্তু এ কাজ তাঁর বেশি দিন ভাল লাগেনি। এর পর তিনি ভাগলপুরের নীল দফতরে যোগদান করেন। এখানেই শুরু হয় তাঁর কাব্য চর্চা। তাঁর কবিতা রচনায় প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেটে’-এর সম্পাদক ডক্টর জন গ্রান্ট। ডিরোজিও ‘জুভেনিস’ ছদ্মনামে লিখতেন। ১৮২৮-য় প্রকাশিত হয় ‘দ্য ফকির অফ জঙ্ঘীরা, এ মেট্রিকাল টেল; অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। এর পাশাপাশি চলতে লাগল তাঁর নিজের পড়াশুনা। ক্রমেই তিনি নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

এর পরে ডিরোজিও ভাগলপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন মূলত ডক্টর গ্রান্টের সহায়তায়। ১৮২৬ নাগাদ, তিনি কলকাতায় দু’টি চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথমটি ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেটে’-এর সহ সম্পাদক হিসেবে, দ্বিতীয়টি হিন্দু কলেজে শিক্ষকতার। কারও কারও মতে তিনি দু’টি চাকরি এক সঙ্গে কিছুদিন করেছিলেন। ডিরোজিও যে সময় হিন্দু কলেজে যোগদান করেন সেই সময়টা ছিল কলেজের সমৃদ্ধিও সচ্ছলতার সময়। তাঁর পাণ্ডিত্য ও মেধার জন্যই কলেজের খ্যাতি ও গৌরব বেড়েছিল। কোনও কোনও গবেষকের মতে ডিরোজিওর এই জনপ্রিয়তাই তার পতনের কারণ। সাংবাদিক রূপেও ডিরোজিয়োর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল পাশ্চাত্য ভাবধারার সঙ্গে হিন্দু রক্ষণশীলতার বিরোধ। কিন্ত তৎকালীন সময়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছিল তার অন্য কারণ ছিল। ভারতীয় হয়েও তিনি রক্ষণশীল হিন্দুর কাছে বিধর্মী ছিলেন অন্য দিকে খ্রিস্টান হয়েও ইউরেশীয় হওয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর সাহায্য পাননি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ সভায় তাঁকে পদচ্যুত করার ব্যাপারে যখন ভোট নেওয়া হয় তাতে উইলসন ও ডেভিড হেয়ার অংশগ্রহণ করেননি।

ডিরোজিও মাত্র সতেরো বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল খুব কম। কেউ কেউ ছিলেন তাঁর সমবয়সী। তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব, দিগম্বর মিত্র, গোবিন্দচন্দ্র বসাক। তেমনই হরচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রশিককৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন তাঁর ভাবশিষ্য। তবে শিক্ষাদানকে ডিরোজিও কেবল মাত্র ক্লাসরুমের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেননি। ক্লাসের বাইরে তাঁর বাড়িতে কিংবা অন্যত্র তাঁরা মিলিত হতেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছাত্রদের ‘friend philosopher and guide’। ডিরোজিয়োর এই সব ছাত্ররা নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল নামে পরিচিত ছিলেন।

প্যারীচাঁদ মিত্র ও ডেভিড হেয়ারের লেখাতে উল্লেখ মেলে যে, ক্লাসে ডিরোজিও ছকে বাঁধা পাঠক্রমের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকতেন না। তিনি ছাত্রদের বিতর্কসভা ও পত্রিকা পরিচালনায় উৎসাহ দিতেন। ১৮২৮-এ তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’। তিনি ছিলেন এর সভাপতি। ১৮৩৯-এ এটি উঠে গেলেও তাঁর ছাত্র এবং অনুগামীরা কিছু সভাস্থাপন এবং পত্রিকা চালু করেছিলেন। এর মধ্যে ‘সোসাইটি ফর দ্য অ্যাকুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ’ উল্লেখ্য। তেমনই ডিরোজিও হিন্দু কলেজ ছেড়ে দেওয়ার সপ্তাহ তিনেক পরে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘দ্য এনকোয়ারার’। তেমনই দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘জ্ঞানান্বেষণ’। এই সব পত্র পত্রিকায় আলোচিত বিষয় রক্ষণশীল হিন্দুসমাজকে শঙ্কিত করে তুলেছিল— তাই এই নব্যবঙ্গদের সঙ্গে তাঁদের সংঘাত ছিল অনিবার্য। এঁদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবনে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল কেননা এঁদের জীবনযাপন বা খাওয়াদাওয়া পরিবারের লোকজন মেনে নিতে পারেননি। অনেকেই মনে করেন ইয়ং বেঙ্গল-এর সদস্যদের অনেকেরই পরিণত মন ছিল না। এ কারণেই হিন্দুরা যেগুলিকে কুখাদ্য মনে করতেন এঁরা সেগুলি খাওয়ার মাধ্যমে মুক্তির পথ নিহিত আছে মনে করতেন।

১৮৩০ সালে অ্যালেকজান্ডার ডাফ আয়োজিত বক্তৃতামালার প্রথম অধিবেশনের পরে থেকেই হিন্দু সমাজে প্রচণ্ড বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পরেই হিন্দু কলেজের অভিভাবকরা কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানিয়ে ছিলেন। এরই মধ্যে হিন্দু কলেজের কিছু সংখ্যক ছাত্র কলেজে আসা বন্ধ করেছিল। কারও কারও অভিভাবক কলেজ থেকে নাম কাটিয়ে দিলেন। ১৮৩১-এর ২৩ এপ্রিল কলেজের পরিচালন সমিতির বিশিষ্ট সদস্যরা কলেজে এক বিশেষ সভায় মিলিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে দেখা গেল উপস্থিত ব্যক্তিরা ডিরোজিয়োর শিক্ষার কুফল বিষয়ে নিশ্চিত নন। তাই একটি প্রস্তাব রাখা হল জনসাধারণের বর্তমান মনোভাব বিবেচনা করে ডিরোজিয়োকে বরখাস্ত করা সময়োচিত কিনা। তাঁদের মধ্যে চন্দ্রকুমার ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন জানিয়েছিলেন তাঁকে বরখাস্ত করা প্রয়োজন।

হিন্দু কলেজে অধ্যাপনার কাজে ইস্তফা দিলেও থেমে যায়নি তার জীবন সংগ্রাম। এ সবের মাঝেই চলতে লাগলো ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজ। থেমে যায়নি ধর্মান্ধতা, অন্ধবিশ্বাস আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখি। কিন্তু পত্রিকার ব্যায়ভার বহন করা সহজ ব্যাপার ছিল না। এর জন্য হেনরি একে একে বিক্রি করে দিয়েছিলেন নিজের লাইব্রেরির সব বইপত্র এবং দামী আসবাবপত্র। শেষের দিনগুলিতে তাঁকে পড়তে হয়েছিল নিদারুণ অর্থাভাবে।

১৮৩১-এর ১৭ ডিসেম্বর ডিরোজিও ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলেন। সে দিনই তিনি কলেরায় আক্রান্ত হন। সে সময় রোগটি ছিল দুরারোগ্য। তাঁর অন্তিম কালে তাঁর পাশে মা ও বোন ছাড়া ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, জন গ্রান্ট। ২৬-এ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।



Tags:

Advertisement