Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

হুমকি-মারধর-জাল ভোট, অভিযোগের কেন্দ্রে তৃণমূল

ঋজু বসু ও অনুপ চট্টোপাধ্যায়
১৩ মে ২০১৪ ০০:৪৭
তিলজলায় সংঘর্ষের পরে রাস্তায় চলছে পুলিশি টহল। ছবি: প্রদীপ আদক

তিলজলায় সংঘর্ষের পরে রাস্তায় চলছে পুলিশি টহল। ছবি: প্রদীপ আদক

বুথের বাইরে তখনও ইটের টুকরো আর কাচের গুঁড়োয় ছয়লাপ। ভোট কার্যত থমকে গিয়েছে। তিলজলা পাম্পিং স্টেশনের ভিতরের বুথে বসে ভোটের হাওয়া মাপছিলেন তৃণমূল-প্রার্থী সুব্রত বক্সীর এজেন্ট।

শাসক দলের খাসতালুকে এ সব বোমাবাজি কেন হচ্ছে? নিশ্চিত আসনে তো এমন হওয়ার কথা নয়? অনেক ক্ষণ বাদে আতঙ্কিত মুখে ভোট দিতে ঢোকা এক পরিচিত প্রবীণের প্রশ্নটা শুনে তৃণমূল এজেন্ট এক বার চোখ তুলে চাইলেন। তার পরে বিড়বিড় করে বললেন, কিছুই নিশ্চিত নয়। এখানে অন্য হাওয়া! বলে নিজের গাল ও থুতনিতে হাত বুলিয়ে ইশারা করলেন। পরে ইশারার মানে জিজ্ঞেস করতে চাপা স্বরে তাঁর জবাব: দাড়ি।

না, সে-দাড়ি যে রবীন্দ্রনাথ বা কার্ল মার্কসের নয়, তা বলতে পারার জন্য কোনও পুরস্কার নেই। শহর কলকাতার ভোটে এই দাড়ির ছায়াই বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও সন্ত্রাসের কারণ হয়ে উঠল। এবং তা এতটাই যে, বেলেঘাটার দেশবন্ধু বয়েজ স্কুলের বুথে পাঁড় মমতা-ভক্ত বলে পরিচিত ভোটারেরা পর্যন্ত কার চিহ্নে বোতাম টিপছেন, তা দেখতে তৃণমূলের পোলিং এজেন্টদের বিরুদ্ধে উঁকিঝুঁকির অভিযোগ পর্যন্ত উঠল।

Advertisement

তিলজলার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের যে বুথে নরেন্দ্র মোদী থুড়ি দাড়ির ছায়া নিয়ে এত জল্পনা, সেখানে কিন্তু বিজেপি-র কোনও পোলিং এজেন্ট ছিলেন না। পুলিশ সূত্রের খবর, তৃণমূলের নিজেদের মধ্যে গোলমালের জেরেই বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। আপাত ভাবে বুথের বাইরের সেই গোলমালের সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই। তাড়িখানা মোড়ে কংগ্রেসের একটি ক্যাম্পে বিরিয়ানির প্যাকেট ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েও ঝামেলা। এর পরেই দু’পক্ষের মধ্যে (পুলিশের মতে, তৃণমূলের দু’টি গোষ্ঠী) ইট বৃষ্টি ও বোমা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রকাশ রায় নামে স্থানীয় খাটালকর্মী এক যুবকের পিঠময় বোমার স্প্লিন্টারের ক্ষত।

সিপিএমের স্থানীয় নেতাদের মতে, ভোটটা সুবিধাজনক হচ্ছে না বুঝে তৃণমূল গোড়ার থেকেই কোনও একটা ছুতোয় গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করছিল। ভোটারেরা যাতে বুথমুখো না-হন, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য।

কলকাতা উত্তর বা কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্রে বিরোধী শিবিরের প্রার্থী বা নেতাদের সঙ্গে এ দিন বার-বারই সংঘাত বাধে শাসক দলের নেতা-কর্মীদের। কাশীপুরে সিপিএম পার্টি অফিসে রবিবারের হামলায় ভোটের দিন গোলমালের পূর্বাভাস মিলেছিল। এ দিনও বিরোধী এজেন্টদের উপস্থিতি ওই তল্লাটে সে-ভাবে চোখে পড়েনি। রেললাইন লাগোয়া একটি উর্দু হাইস্কুলে ছাপ্পার অভিযোগও ওঠে।



বিজেপি নেত্রীর বাড়ির সামনে বোমা ফাটার খবর পেয়ে উত্তর কলকাতার সত্যনারায়ণ পার্কে

নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীরকুমার রাকেশ। সোমবার। ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য

বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ কালীকৃষ্ণ ঠাকুর রোডে বিজেপি নেত্রী মীনাদেবী পুরোহিতের বাড়ির কাছেই বোমা পড়ে। তিনি তখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলেন। এর আধ ঘণ্টা পরে কাছেই মালাপাড়ায় ফের বোমাবাজি। পরে ওই ঘটনার তদন্তে যান নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীরকুমার রাকেশ। কলকাতা উত্তরের বিজেপি প্রার্থী রাহুল সিংহের বক্তব্য, “পায়ের তলায় মাটি সরছে বলেই এত মরিয়া হচ্ছে শাসক দল।”

কলকাতা দক্ষিণের বেশির ভাগ বুথেই এজেন্ট দিতে পারেনি বিজেপি। তথাগত রায় ও মুখ্য নির্বাচনী এজেন্ট দশরথ সিংহ চেষ্টা করেছিলেন, কেন্দ্রের দু’দিক থেকে ঘুরে বুথগুলো কভার করতে। নোনাডাঙার আদর্শনগরে যেতেই দশরথবাবুকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললেন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এক তরুণ। এ বার বিজেপি-র এজেন্ট হিসেবে বুথে বসার কথা ছিল তাঁর। ওই যুবকের বক্তব্য, রবিবার রাতে বাড়িতে চড়াও হয়ে তৃণমূলের ছেলেরা এমন হুমকি দিয়েছে যে, বাড়ির লোকজনও বলে দিয়েছেন, তিনি যেন বুথমুখো না হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকেও তাঁর অনুরোধ, দয়া করে আমার নামটা লিখবেন না। পরে দুপুরের দিকে ফাঁকতালে নিজের ভোটটা দিয়ে তৃণমূলী দাদাদের তিনি জোড়া ফুলের বোতাম টেপার কথাই জানিয়েছেন। খিদিরপুর বাজারে বিজেপি-র একটি ছাউনি ভেঙে দেওয়া ঘিরেও উত্তেজনা বহাল থাকে।

বেলেঘাটার ৩৫টি বুথের মধ্যে সিপিএম-ও মাত্র ৭টি বুথে এজেন্ট বসাতে পারে। বামপ্রার্থী রূপা বাগচীর অভিযোগ, বেলেঘাটার দেশবন্ধু স্কুলে ‘ভূতেরা’ও ভোট দিয়েছেন। ক্রম তালিকা ধরে চার জন প্রয়াত ভোটারের নামে ভোট পড়েছে কমিশনের কাছে অভিযোগ জানান তিনি। কংগ্রেস-প্রার্থী সোমেন মিত্রের অভিযোগ, “বাম আমলের মতো চোরাগোপ্তা নয়, রিগিং হয়েছে খুল্লমখুল্লা।” শুঁড়াকন্যা স্কুলে ভোট দিতে যাওয়ার পথে রাজু দত্ত ও কৃষ্ণা দত্ত নামে এক দম্পতি নিগৃহীত হন বলেও অভিযোগ। লি কলিন্স স্কুলে ভোট দিতে গিয়ে এক মহিলা (নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক) জানতে পারেন, তাঁর ভোট পড়ে গিয়েছে। হতভম্ব হয়ে তিনি বলছিলেন, “কী আশ্চর্য, গত বিধানসভায় ওরাই প্রায় নেমন্তন্ন করে ভোট দিতে নিয়ে গিয়েছিল!” মহিলার স্বামীকেও লাইনে দাঁড়াতেই দেননি তৃণমূল সমর্থকেরা। বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকলেও বুথ অবধি পৌঁছতেই পারেননি তিনি।

বিকেল তিনটে নাগাদ বেলেঘাটায় সিপিএমের লোকাল কমিটির সম্পাদক রাজু ভট্টাচার্যকে দেখা গেল, বিভিন্ন এলাকার ভোটারেরা বুথে পৌঁছতে পারছেন না বলে নির্বাচন কমিশনের ১৯৫০ নম্বরে প্রাণপণে ফোন করে চলেছেন। কিন্তু সেই নম্বরে কোনও সাড়া মিলল না।

কলকাতা দক্ষিণের সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায় এ দিন ঠাকুরপুকুরের কাছে ডায়মন্ড হারবার রোডে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হতে তাঁর ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ বড়িশায় ১২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইন্দ্রজিৎ ভট্টাচার্যের ‘দুর্ব্যবহার’ বা জোকার ঢালিপাড়ায় বুথে বিরোধীদের বার করে দিয়ে শাসক দলের ‘যথেচ্ছাচার’ নিয়ে। সকালে বড়িশার পূর্বপাড়ার উচ্চ বিদ্যালয়ে বুথের বাইরেই একটি টেবিলে বসে ভোটার-স্লিপ বিলি করছিলেন নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের পাশেই দল বেঁধে একঝাঁক তৃণমূলকর্মী। ঘুরতে ঘুরতে সেখানে চলে আসা নন্দিনীদেবী বুথের ধারের জমায়েত নিয়ে আপত্তি তোলেন। অভিযোগ, তাঁর সঙ্গী সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে ‘চামড়া গুটিয়ে নেব’ বলে গালিগালাজও শুরু হয়ে যায়। পরে কমিশনের হস্তক্ষেপে স্লিপ বিলি বুথ থেকে দূরে সরানো হয়।

নারকেলডাঙা থেকে সন্তোষপুর, পাটুলিতেও এ দিন বুথ জ্যাম, ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ওঠে। বেঙ্গল কেমিক্যালের কাছে এক ভোটারকে রিভলভারের বাঁট দিয়ে মারার অভিযোগে উত্তেজনা ছড়ায়। বেহালার পূর্ব পুঁটিয়ারিতেও শাসক দল ভোট করিয়েছে বলে অভিযোগ। এন্টালিতে পাঁচটি তাজা বোমা উদ্ধার হয়। ভোট শেষের মুখে কসবায়, বাগবাজারে সিপিএমের পার্টি অফিস, ছাউনি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।

তৃণমূলের পার্থবাবু বা প্রার্থী সুব্রত বক্সীর মুখ্য নির্বাচনী প্রতিনিধি সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য কলকাতা দক্ষিণে কোনও রকম অশান্তির অভিযোগ মানতে চাননি। কলকাতা উত্তরের তৃণমূল-প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও অশান্তির অভিযোগ ‘যৎসামান্য’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। পুলিশও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল বলেই দাবি করেছে। তাদের দাবি, ভোটকেন্দ্র বাড়লেও কলকাতায় পর্যাপ্ত বাহিনী মেলেনি (১৪০০ ভোটকেন্দ্রে ৫২ কোম্পানি বাহিনী ছিল)। আরও বেশি লোকবল থাকলে, যেটুকু গোলমাল হয়েছে, তা-ও ঘটত না বলে জানাচ্ছেন পুলিশের কর্তারা।

আরও পড়ুন

Advertisement