Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

তিনি হাসলেন, তিনি কাঁদলেন, তিনি রাগলেন

শোভনদার জীবন গুছিয়ে দিয়েছি আমি: বৈশাখী

নীলোৎপল বিশ্বাস
২৩ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:০০
গোলপার্কের বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠকে শোভন চট্টোপাধ্যায়। নিজের বাড়িতে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় ও রত্না চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সুমন বল্লভ, ফাইল চিত্র।

গোলপার্কের বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠকে শোভন চট্টোপাধ্যায়। নিজের বাড়িতে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় ও রত্না চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সুমন বল্লভ, ফাইল চিত্র।

তিনি কলকাতার কলেজে পড়ান। তাঁর স্বামী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর ‘প্রিয় বন্ধু’ তৃণমূলের ডাকসাইটে নেতা, সদ্য পদত্যাগী মন্ত্রী ও মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের জীবন তিনি ‘গুছিয়ে’ দিয়েছেন। সেই জন্য তাঁর কলেজ জীবনের প্রথম প্রেমিক এখন তাঁকে বিদেশ থেকে এসএমএস করে অভিনন্দন জানান। এক নজরে এই হল বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান অবস্থান।

শোভন-কাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বৈশাখীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বারবার। রাজনীতির লোকজন থেকে শুরু করে শোভনের স্ত্রী-পুত্রেরা পর্যন্ত মনে করেন শোভনের এই পরিণতির জন্য বৈশাখীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ‘ঘনিষ্ঠতা’ই দায়ী। বৈশাখী অবশ্য তাঁর জন্য শোভনবাবুর এই ‘আত্মত্যাগ’কে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখতে চান। তাঁর কথায়, ‘‘শোভনদা আমার কাছে ভগবান।’’

বৃহস্পতিবার সাউথ সিটিতে তাঁর মায়ের ফ্ল্যাটে বসে একান্ত আলাপচারিতায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের সবিস্তার জবাব দেন বৈশাখী। প্রথম প্রশ্ন ছিল, আপনার বন্ধু শোভন মন্ত্রী এবং মেয়র সব পদ হারালেন। কী বলবেন? বৈশাখী বলেন, ‘‘আমাকে নিয়ে তৈরি হওয়া গুজবের শিকার হলেন শোভনদা। আক্ষেপ তো হচ্ছেই। কোথাও একটা বড় ভুল বোঝাবুঝি চলছে।’’

Advertisement

কে ভুল বুঝছেন? বৈশাখীর উত্তর, ‘‘দিদিমণিকে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) কে যে গিয়ে কী বলছেন, বলা শক্ত। কাগজে দেখছি, রত্নাদেবী (শোভনের স্ত্রী) যা বলছেন, দিদিমণিও সেই কথাই বলছেন।’’ তিনি বলেন, ‘‘শোভনদাকে বলতাম, তুমি নিজে গিয়ে মমতাদিকে সব বলো। উনি বলতেন, মমতাদি জানেন না এমন তো নয়! হয়তো তিনি অন্যদের কথা শুনেছেন।’’

কারা ‘ভুল’ বোঝাচ্ছেন? রাজনীতির লোকজন? বৈশাখীর জবাব, ‘‘আমার মনে হয়, চালাকি করে কেউ এই সব বাজে কথা পাঠিয়ে দিচ্ছে দিদিমণির কাছে। এখানে (শোভনের) বাড়ির মধ্য থেকেই যখন এত কথা উঠছে, তখন রাজনীতিকদের দোষ দেব কী করে?’’ সেই সঙ্গেই তিনি বলেন, ‘‘আমি রত্নার মতো করতাম না। আমি ভাবতাম, আমার স্বামী সমাজের চোখে এক জন আইকন। তাই আমি কখনওই তাঁকে সকলের সামনে এমন ভাবে নামিয়ে আনতাম না।’’ বৈশাখীর আরও বক্তব্য, ‘‘শোভনদার শ্বশুরমশাই তৃণমূলের বিধায়ক। দল তাঁকেও প্রকাশ্যে কুকথা বলতে মানা করছে না। এমনকি, রত্না বলছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বই নাকি তাঁকে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বলেছেন।’’

আরও পড়ুন: মুখ্যমন্ত্রী চাইলে কাউন্সিলর-বিধায়কের পদও ছাড়তে রাজি শোভন

কিন্তু শো‌ভনবাবুও তো প্রকাশ্যে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও কুৎসা করছেন। তার বেলা? বৈশাখীর যুক্তি, ‘‘শোভনদা মিথ্যের মোড়ক নিয়ে চলেন না। রত্না যা রটাচ্ছেন, তার পাল্টা হিসেবেই এগুলো বলছেন।’’

অনেকে অবশ্য এমনও বলছেন, শোভনবাবু এ বার আপনার মাধ্যমে বিজেপির দিকে পা বাড়াবেন। এটা ঠিক? বৈশাখীর জবাব, ‘‘শোভনদাকে রাজনীতি শেখাব আমি! আমি দিল্লি গেলে বলা হয়, অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছি। কলকাতায় থাকলে বলে শোভনের সঙ্গে। এ কথার কী উত্তর দেব?’’

শোভনবাবুর ইদানীং কাজে মন ছিল না, এমনই অভিযোগ উঠেছে বারবার। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও তাঁকে এ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। বন্ধু হিসেবে আপনি কি তাঁকে কাজে মন দিতে বলেছিলেন? এ বার কিছুটা সতর্ক বৈশাখী। বললেন, ‘‘আমি কখনও দেখিনি যে শোভনদার কাজে মন নেই। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ থেকে উনি নিজের শারীরিক পরীক্ষারও সময় করে উঠতে পারছেন না। বললেই বলছেন, অধিবেশন আছে, পুরসভার অনেক কাজ। এ সব দেখেও বলব শোভনদার কাজে মন নেই!’’ তাঁর মতে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এটা রটানো হয়েছে।
শোভন তাঁর স্ত্রী রত্নার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই চরিত্র হননকারী নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই সুরে বৈশাখীও রত্নার ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে বহু রকম মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘রত্নাদেবী হয়তো মনে করেন, তাঁর প্রেমের সম্পর্কের কথা আমি শোভনদাকে বলেছি। তা একেবারেই ভুল। শোভনদা নিজেই জানতে পেরেছেন। তাঁর স্ত্রী কোথায় কবে, কার সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন, সব শোভনদার জানা।’’ বৈশাখীর অভিযোগ, ‘‘শোভনদাকে শ্লীলতাহানির মামলায় ফাঁসানোর চক্রান্তও হয়েছিল।’’ ভাল ‘বন্ধু’ হিসেবে আপনি কেন ওঁদের দাম্পত্য সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করলেন না? বৈশাখীর বক্তব্য, ‘‘এটা ওঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ঢুকিনি। তবে শোভনদাকে ২০০৮ থেকে চিনি। আমাদের মধ্যে কোনও ভুল বোঝাবুঝি নেই।’’

আরও পড়ুন: রত্নার পাশে শোভনের পরিবার

কিন্তু আপনি তো শোভনবাবুর বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ে ঢুকেছেন। এমনকি আইনজীবী না হয়েও তাঁর ব্যক্তিগত নথিপত্র নিয়ে কাজ করেছেন। কী বলবেন? বৈশাখী বলেন, ‘‘সিপিএম আমল থেকেই আমি আমার কলেজের চাকরি সংক্রান্ত মামলা লড়ছি। তাই আইনকানুন
ভাল বুঝি। বন্ধু হিসেবে শোভনদার মামলার ফাইল গুছিয়ে রাখা এবং সঠিক সময়ে হাতে তুলে দেওয়ার কাজ করছি। ওঁর জীবন আমি গুছিয়ে দিয়েছি।’’ বৈশাখীর দাবি, ‘‘আমি কোনও ভুল কাজ করছি না। শোভনদার জন্য যা করেছি, তার প্রশংসা করে আমার কলেজ জীবনের প্রথম প্রেমিক বিদেশ থেকে এসএমএস করেছে।’’
শোভনবাবু সব সময়ই বলে থাকেন তাঁর চরম দুঃসময়ে বৈশাখী পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে জীবনে ফিরিয়েছেন। তিনি বৈশাখীর কাছে কৃতজ্ঞ। এ দিন কার্যত তারই পুনরাবৃত্তি করে বৈশাখীর মন্তব্য, ‘‘সবচেয়ে খারাপ সময়ে আমি শোভনদাকে পরিস্থিতি থেকে বার করে এনেছি। আমিও ওঁর কাছে কৃত়জ্ঞ। কারণ, এক জন মহিলাকে সম্মান দিতে গিয়ে তিনি, সব কিছু ত্যাগ করলেন। মানুষ হিসেবে শোভনদা আমার কাছে ভগবান। যদি কিছু পাওয়ার লোভে ছুটতে হত, তা হলে শোভনদা কেন, অমিতাভ বচ্চনের পিছনেই ছোটার চেষ্টা করতাম!’’

আরও পড়ুন

Advertisement