উচ্ছেদের আশঙ্কায় চোখে ঘুম ছিল না। ঘরে আলো জ্বালিয়ে রেখেই মাঝরাতে পথে নেমে এসেছিলেন যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ে সাইডিংয়ের গোটা তিরিশেক পরিবারের মানুষ। তার মধ্যেই রাত ১টা নাগাদ আচমকা বাম কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রাচীর ভেঙে ঢুকে পড়ে বুলডোজ়ার। একটার পর একটা চালাঘর চোখের সামনে ফালা ফালা করে ফেলারমতো করে ভাঙতে থাকে বুলডোজ়ারের লোহার বাকেট। চৌকি পাতা ঘর, বালিশ, তোশক, জল রাখার বালতি থেকে ঠাকুর-দেবতার ছবির ফ্রেম— সব ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তেমনই একটি চাল-ভাঙা ঘরে ধুলোর স্তূপের মধ্যে সোমবার দুপুরে নিজের ইনহেলার খোঁজার চেষ্টা করছিলেন নবতিপর অনিল অধিকারী। ২৫বছর আগে কর্কট রোগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। নিঃশ্বাসের চাপ ধরা বুকে ছাদ হারিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো বৃদ্ধ কোথায় কাটাবেন, জানা নেই। ওই চত্বরে আপাতত অক্ষত মন্দিরের মেঝেই তাঁর ভরসা। জামাকাপড়, ওষুধপত্র— সব ভাঙা দেওয়ালে চাপা পড়েছে।
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ১৬৪ বছরের পুরনো স্টেশন যাদবপুর। স্বাধীনতার পরে ১৯৫২ সালে রেলওয়ে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা যুক্ত হয় পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশনের সঙ্গে। তখন থেকেই এই সাইডিংয়ে মাল খালাসের শুরু। রেলের ওয়াগন থেকে কয়লা, বালি, পাথর-সহ নানা ইমারতি দ্রব্য নামত। রেলের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে সেই সব জিনিসই ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতেন কয়েক জন যুবক। তখন থেকেই চালু হওয়া ব্যবসা বংশ পরম্পরায় এখনও চলছে। ৪২ জন ব্যবসায়ী এবং তিন হাজার ঠিকা শ্রমিকের জীবিকা চলে এই সব দ্রব্যের কারবার থেকে। সারা কলকাতা শহরের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম দামে এই সাইডিং থেকে জিনিস কিনে নিয়ে যেতেন বলে খবর। লিজ়ের মেয়াদ এবং টাকার অঙ্ক নিয়ে রেলের সঙ্গে বিবাদ বাড়তে থাকায় ১৯৮৮ সালে পুরো বিষয়টি আদালতে গড়ায়। নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে ওই ব্যবসায়ীদের সরানো যাবে না বলে জানায় আদালত। তার পরে ১৯৯০ সালে সাইডিংয়ে ওয়াগন আনা বন্ধ করে দেয় রেল। যদিও তখনও রেলকে নিয়মিত লিজ়ের টাকা মেটাতেন ব্যবসায়ীরা। আরও বছর দশেক পরে, রেল রসিদ দিয়ে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দেয় বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। লিজ়ের মেয়াদ বাড়াতেও অস্বীকার করে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের অন্যতম সদস্য শান্তনু চৌধুরী এ দিন বললেন, ‘‘রেলের কাছে বহু বার গিয়ে লিজ় নবীকরণ করা ছাড়াও সমস্যা মিটিয়ে বৈধ উপায়ে ব্যবসা করার কথা বলেছি। আধিকারিকেরা তাতে আগ্রহ দেখাননি।’’ যদিও শিয়ালদহ ডিভিশনের বাণিজ্যিক বিভাগের শীর্ষ কর্তা এবং রক্ষীদের একাংশ নিয়মিত ভাবে ঘুরপথে বিপুল টাকা নিতেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের অন্য একটি সূত্রের। রেল কর্তৃপক্ষের অবশ্য দাবি, ওই ব্যবসায়ীরা রেলকে কোনও টাকা না দিয়েই জমি আটকে রেখে তাঁদের ব্যবসা চালাচ্ছিলেন। ওই জমি থেকে রেলের কোনও আয় না হওয়াতেই দখল হটাতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে শান্তনুর পাল্টা দাবি, সব কিছুর বৈধ নথি নিয়েই তাঁরা ব্যবসা করছেন।
শান্তনু জানাচ্ছিলেন, গত মাসেই সিইএসসি-কে তাঁদের ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ৩৩ হাজার টাকারও বেশি বিদ্যুতের বিল মেটানো হয়েছে। রেল আচমকা ঘর ভেঙে রাস্তায় গার্ডরেল পুঁতে দেওয়ায় পুরসভার পানীয় জলের গাড়ি আসতে পারেনি।
শান্তনু আরও জানান, রেলের সঙ্গে আলোচনায় সাইডিংয়ে নতুন করে ইমারতি দ্রব্য আপাতত না-ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, জমে থাকা জিনিসপত্র বিক্রি করে দিন কয়েকের মধ্যে জায়গাটি খালি করে রাখা হবে। তার পরে আদালত যেমন নির্দেশ দেবে, সেটাই মেনে চলা হবে। কিন্তু রেল কথা রাখেনি বলে জানালেন বছর বাষট্টির শান্তনু। একই দাবি পার্থ পালচৌধুরী, সৌরভ কানু-দেরও। রেল সাম্প্রতিক অতীতে যখন, যে কাজে, যেমন করে সহযোগিতা চেয়েছে, তাঁরা তা করার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
শুধু নবতিপর অনিল অধিকারী নন, বিহার থেকে আসা মুকেশ কুমার, অজয়নগরের দেবাশিস সর্দারেরা জানাচ্ছিলেন, তাঁরা বংশ পরম্পরায় ওই সাইডিংয়ে কাজ করছেন। ছোট-বড় নানা জোগাড়ের কাজ দিনভর করেই সংসার চলে তাঁদের। আচমকা উচ্ছেদে সাইডিং বন্ধ হলে কী করবেন, তাঁরাও ভেবে পাচ্ছেন না।
প্রায় ৭৪ বছরের পুরনো সাইডিং শুধু নয়, রেলের তৎপরতা ঘিরে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যাদবপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এবং লাগোয়া কয়েকশো দোকানেও। সাইডিং ভাঙার পরে ওই সব দোকান উঠে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা, বলছেন অনেকে। যাদবপুর স্টেশনের সন্ধ্যাবাজারও রয়েছে গা-ঘেঁষে। এত মানুষ উৎখাত হলে কী পরিস্থিতি হবে, বুঝতে পারছেন না ওই বাজারের ব্যবসায়ীরাও।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)