Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

বানভাসি দ্বীপে ঠিকানা খুঁজছে বাঘ

রাহুল রায়
ভাঙাদুনি (সুন্দরবন) ২৪ এপ্রিল ২০১৫ ০৩:২৩

বিষয়টা ছিল—বাঘের বাড়বাড়ন্ত।

দিন কয়েক আগে দিল্লিতে, দেশের তাবড় বাঘ বিশারদদের এক আলোচনাচক্রে কথাচ্ছলে প্রস্তাবটা পেড়েছিলেন তিনি, “বাংলায় আর বাঘ কোথায়, তাদের আঁতুরঘর তো এখন কর্নাটক। দেশের জাতীয় পশুর নামটা ‘রয়্যাল বেঙ্গল’ বদলে এ বার ‘সুলতান অফ কর্নাটক’ করে দিলে কেমন হয়!”

নিছকই রসিকতা। তবে, বাঘ সুমারির রিপোর্ট-কার্ড প্রকাশের পরে কর্নাটকের বনমন্ত্রী বি রমানাথ রাইয়ের টিপ্পনিটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Advertisement

সুন্দরবনের সাড়ে ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত বাদাবনে সাকুল্যে ৭০টি আর উত্তরে বক্সার বাঘ-বনে তিনটি, ব্যস। খোদ বাংলায় রয়্যাল বেঙ্গল বলতে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এই ৭৩টি। সংখ্যাটা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি যে রাজ্যে, সেই কর্নাটকে বছর পাঁচেক আগেও বাঘের সংখ্যা ছিল বড়জোর শ’ দেড়েক। এখন ৪০৩।

সুন্দরবনের বাঘগুলো সব গেল কোথায়?

পাঁচ বছর আগে, বাম জমানায়, বাদাবন ঢুঁড়ে ২৪৯টি বাঘের খোঁজ মিলেছিল সুন্দরবনে। সে বার বনের রাজার পায়ের ছাপই ছিল সবেধন। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে, গাছে ঝুলিয়ে রাখা গোপন-ক্যামেরা আর বাঘের বিষ্ঠা-বিশ্লেষণ। নব্য ধাঁচে, প্রযুক্তি-নির্ভর সুমারির পরে দেখা যাচ্ছে, দেশের সতেরোটি রাজ্যে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ব্যতিক্রম শুধু রয়্যাল বেঙ্গলের আদিভূমি সুন্দরবন। বাড়-বৃদ্ধির বদলে বাঘের সংখ্যা সেখানে প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। কেন?

বাম জমানার শেষ বনমন্ত্রী অনন্ত রায় বলছেন, “মুখ্যমন্ত্রী এর মধ্যেও নিশ্চয় বামেদের ষড়যন্ত্র দেখতে পাবেন, তবে সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের হারিয়ে যাওয়ার কারণটা খুঁজে দেখা খুব জরুরি।” রাজ্যের বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন অবশ্য কারণটা জানেন। দাবি করছেন, “উষ্ণায়নের কোপ পড়েছে সুন্দরবনে। তার জেরেই জলস্তর বৃদ্ধি। হয়তো সে কারণেই ঠিকানা হারাচ্ছে বাঘ।” কিন্তু তা ঠেকাতে পাল্টা কোনও পরিল্পনা কি রয়েছে?



বাম আমলে এ নিয়ে সরকারের কোনও হেলদোল চোখে পড়েনি। সরকার বদলের পরে গত চার বছরে, তাঁর অরণ্যপ্রীতি সুবিদিত হয়ে উঠলেও বাঘ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুন্দরবন এবং ব্যাঘ্রকুলের হাল হকিকত্‌ নিয়ে উত্‌সাহ নিছকই পর্যটনের খাতিরে।

সরকার বদলের আগে এবং পরে, এ ব্যাপারে সরকারি উদাসীনতার কোনও পরিবর্তন হয়নি। পরিবেশ দফতর নিশ্চুপ, বন দফতরের কোনও হেলদোল নেই। এই নিস্পৃহতার আড়ালে নিশ্চুপে সমুদ্র-গ্রাসে দক্ষিণ রায়ের আদি বিচরণভূমি।

পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপে ক্রমাগত জলস্তর বৃদ্ধি নিয়ে গত তেরো মাস ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে জার্মান পরিবেশবিদদের একটি দল, সম্প্রতি তাঁদের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, উষ্ণায়নের ফলে যে হারে জলস্তর বাড়ছে তাতে আগামী ৪০ বছরের মধ্যেই সুন্দরবন থেকে ঠাঁইনাড়া হবে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ওই বিশেষজ্ঞ দলের পক্ষে অলিভার হেনরিখ বলছেন, “চোখ কপালে উঠে যাওয়ার পক্ষে এই পরিসংখ্যানটুকুই যথেষ্ট যে, শেষ পাঁচ বছরে সুন্দরবন লাগোয়া সমুদ্রে জলস্তর বেড়েছে বছরে ১৭.৯ মিলিমিটার। ২০০০ সালের আগে, বছরে এই বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩.১৪ মিলিমিটার।”

জোয়ারের সময়ে নোনা জলের দখলে দ্বীপের একটা বড় অংশ তলিয়ে যাচ্ছে, আবহমান কাল ধরেই তা দেখে আসছে সুন্দরবন। কিন্তু গত দশক থেকে জোয়ারের দখলদারির চেহারাটা বদলে গিয়েছে। অলিভার জানান, জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় নোনা জল ক্রমেই সেঁদিয়ে যাচ্ছে দ্বীপের একেবারে অন্দরে। তাঁর ব্যাখ্যা, “জোয়ারের জল এখন দ্বীপের মাঝ বরাবর পৌঁছে যাওয়ায় দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে নোনা-ডোবা বা সল্ট বেসিন।” বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কোনও দ্বীপে তা মাড-ফ্ল্যাট বা নুন বোঝাই ঘন কদর্মাক্ত জলা জমির চেহারা নিয়েছ। ওই লবণাক্ত জমিতে গাছগাছালি হওয়ার জো নেই। এমনকী বাঘের নিভৃত আস্তানা হেঁতাল-গরানের বাদাবনও উধাও হয়ে গিয়েছে।

বন দফতরের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তথা বাঘ বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিত্‌ রায়চৌধুরীও বলছেন, “সুন্দরবনের অধিকাংশ দ্বীপের চেহারা এখন টাক পড়ে যাওয়া মাথার মতো।” তাঁর ব্যাখ্যা, বাদাবনের দেওয়াল তুলে দ্বীপগুলি জেগে আছে ঠিকই, যা দেখে আপাত ভাবে মনে হতে পারে অটুট রয়েছে দক্ষিণ রায়ের বিচরণভূমি। তবে দ্বীপগুলির মধ্যবর্তী এলাকায় সম্বত্‌সর নোনা জল জমে থাকায় সেখানে গাছ এমনকী ঘাসও হচ্ছে না। তিনি বলছেন, “দ্বীপের মাঝে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বাদাবন হারিয়ে যাওয়ায় হরিণ-শুয়োরের মতো তৃণভোজীরাও খাবারের সংস্থান করতে পারছে না। সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলে তাই সুর কেটে গিয়েছে।”

এক দিকে খাদ্যাভাবে তৃণভোজীর সংখ্যা হ্রাস, সঙ্গে দোসর, হারিয়ে যেতে থাকা বিচরণভূমি। দক্ষিণ রায় তাহলে যাবে কোথায়?

(চলবে)

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement