×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৪ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

মমতা জঙ্গলমহলের মা, ভারতীর স্তুতিতে বিতর্ক

বরুণ দে
মেদিনীপুর ০৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:৪৬
মঞ্চে খোশমেজাজে। মুখ্যমন্ত্রী ও তমলুকের সাংসদ। ছবি: সৌমেশ্বর মণ্ডল।

মঞ্চে খোশমেজাজে। মুখ্যমন্ত্রী ও তমলুকের সাংসদ। ছবি: সৌমেশ্বর মণ্ডল।

সেই এক মঞ্চ। ফের মুখ্যমন্ত্রীকে ‘জঙ্গলমহলের মা’ বলে সম্বোধন পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষের।

গত বছরের মতো এ বারও জঙ্গলমহল কাপ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে পুলিশ সুপার ভারতীদেবী বললেন, “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের জঙ্গলমহলের মা তাঁর ছেলেমেয়েদের দেখে গেলেন! জঙ্গলমহলের মা-কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি!’’

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মেদিনীপুরে জঙ্গলমহল কাপের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানেই প্রথম মুখ্যমন্ত্রীকে জঙ্গলমহলের মা বলে সম্বোধন করেছিলেন ভারতীদেবী। সেই ধারা বজায় রেখেই এ দিন কখনও তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘বাংলার নবরূপকার’, কখনও বলেছেন, ‘আমাদের পরমপ্রিয়’। ইতিমধ্যে ভারতীদেবীকে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। কখনও আদালতে তিনি ভর্ৎসিত হয়েছেন, কখনও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সবংয়ে ছাত্র পরিষদ কর্মী খুনে অভিযুক্ত টিএমসিপি কর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি আবার সবংয়ের কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইয়াকেও তিনি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠিও দিয়েছেন মানসবাবু। তারপরেও এ দিন স্বমহিমায়

Advertisement

পড়ুন: ঘোষণা বনাম বাস্তব

সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেছেন ভারতীদেবী। তাঁকে পাল্টা প্রশংসা ফিরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, “আজকের অনুষ্ঠানটা একেবারে অন্য রকম। খুব সুন্দর ভারতী। ভারতীই এই খেলাটাকে আয়োজন করেছে।” অনুষ্ঠান চলাকালীন দু’জনকেই বেশ কয়েকবার কথা বলতে দেখা গিয়েছে। সব জেনে মানসবাবুর প্রতিক্রিয়া, ‘‘প্রশাসনের যেটুকু মান এখনও আছে, সেটা টিকিয়ে রাখতে গেলে মুখ্যমন্ত্রীর উচিত অবিলম্বে ভারতীর পুলিশের উর্দি প্রত্যাহার করে তাঁকে তৃণমূলের টিকিটে বিধানসভায় প্রার্থী করা।’’ পুলিশ-প্রশাসনের পদে থেকে কী ভাবে একজন এমন শাসক-বন্দনা করতে পারেন, সে কথা নির্বাচন কমিশনেও জানাবেন মানসবাবু।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ভারতী ঘোষের এই ‘সম্পর্ক’ নিয়ে জলঘোলা নতুন নয়। বিরোধীদের দাবি, কোনও পুলিশ সুপার এ ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা করতে পারেন না। সেই বিতর্ক নতুন করে উঠল। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মেদিনীপুরে জঙ্গলমহল কাপের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেই মমতাকে ‘জঙ্গলমহলের মা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন ভারতী। জেলা পুলিশ সুপারের মন্তব্য ছিল, ‘উনি এই জঙ্গলমহলের মা। মমতাময়ী মায়ের মতো জঙ্গলমহলকে আগলে রেখেছেন।’ এই মন্তব্য নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। মঙ্গলবার সেই মেদিনীপুরেই জঙ্গলমহল কাপের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মমতাকে ফের ‘জঙ্গলমহলের মা’ বলে সম্বোধন করে জেলা পুলিশ সুপার যেন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরছেন না! বিরোধীদের বক্তব্য, ভারতীদেবী তাঁর কাজের মাধ্যমেই বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি মমতার কন্যাসম! ফলে মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর ‘মা’ বলাটা স্বাভাবিক! বিরোধীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পিংলা ও সবং কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রীর কথাকে মান্যতা দিতে সব রকম চেষ্টা করেছেন পুলিশ সুপার। এ দিন অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ফুটবল দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভারতীদেবীকে বলেন, “ভারতী এগুলো গৌতমদের দাও (ফুটবলার গৌতম সরকার)”। আর গৌতমবাবুদের বলেন, ‘‘দেখি তোমরা ফুটবল কেমন নাচাতে পারো। দাও কিক দাও!” জঙ্গলমহলের খেলোয়াড়দেরও ফুটবল নাচাতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপরই গৌতম সরকারদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, “দম নেই কেন তোমাদের। দেখো আমাদের ছেলেমেয়েদের কত দম!”

এ দিন ওই মঞ্চ থেকে জঙ্গলমহল উত্‌সবের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই উৎসব হচ্ছে ঝাড়গ্রাম শহরের কুমুদকুমারী স্কুলের মাঠে। উত্‌সবের আয়োজক পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিষয়ক দফতর ও পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ। গত বছর উত্‌সব মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর কোনও ছবি ছিল না। এ বার আর ঝুঁকি নেননি আয়োজকরা। প্রশাসন সূত্রে খবর, পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোর নির্দেশেই মঞ্চের পিছনে দু’পাশে মুখ্যমন্ত্রীর দু’টি ছবি টাঙানো হয়েছে। মাঝে লেখা, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায়’। মেদিনীপুরে মুখ্যমন্ত্রী উত্‌সবের উদ্বোধন করার পরে বিকেলে ঝাড়গ্রামে ধামসা ও মাদল বাজিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা করেন শান্তিরামবাবু। জানান, কী ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে জঙ্গলমহলে শান্তি ফিরেছে, উন্নয়ন হচ্ছে, লোকশিল্পের বিকাশ ঘটছে। শান্তিরামবাবুর মতে, জঙ্গলমহলের লোকশিল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকস্তরে তুলে ধরা এবং লোকশিল্পীদের রোজগার বাড়ানোই উৎসবের লক্ষ্য।

দিনের শেষে ট্যুইটারে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘জঙ্গলমহল খুশি, তাই আমিও খুশি।’

তথ্য সহায়তা: কিংশুক গুপ্ত।

Advertisement