জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখ কাকদ্বীপ এবং সাগরদ্বীপের মাঝে মুড়িগঙ্গা নদীর উপরে প্রস্তাবিত সেতুর শিলান্যাস করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিকাঠামো নির্মাণ সংস্থা লারসেন অ্যান্ড টুব্রোকে বরাত দেওয়াও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আসল কাজটাই হয়নি!
মুড়িগঙ্গা নদী জাতীয় জলপথের অংশ। ফলে তার উপরে যে কোনও নির্মাণকাজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। সাগর দ্বীপের পশ্চিম দিক দিয়ে অসংখ্য জাহাজ এবং ভেসেল বঙ্গোপসাগরে যায়। আর পূর্ব দিক দিয়ে শুধু ভেসেল যায় বাংলাদেশে। প্রস্তাবিত সেতুটি সাগর দ্বীপের পূর্ব দিকেই গড়ে উঠবে। কিন্তু তার জন্য কেন্দ্রের কাছ থেকে অনুমতি আদায়ের কোনও চেষ্টাই মমতার সরকার করেনি। সেতুর শিলান্যাসের সময়ই বিজেপি অভিযোগ করেছিল, ‘‘সেতু তৈরির কোনও ইচ্ছা নেই, স্রেফ ভোটে উতরে যাওয়ার কৌশল।’’ সেই কৌশল অবশ্য কাজে আসেনি। কাকদ্বীপ বা সাগর, কোনও আসনই ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল।
তার পর ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় জাহাজ ও জাতীয় জলপথ মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয় সেরে ফেলেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। মুড়িগঙ্গার উপরে সেতু তৈরির কাজ যত শীঘ্র সম্ভব সেরে ফেলতে চায় তারা। কাকদ্বীপের লট নম্বর আট এবং সাগরের কচুবেড়িয়ার মাঝে প্রস্তাবিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। আনুমানিক দেড় হাজার কোটি টাকা খরচে এই সেতু তৈরি হতে সময় লাগবে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর। কেন্দ্রীয় জাহাজ, বন্দর ও জাতীয় জলপথ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বলেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের প্রয়োজনীয় আলোচনা হয়ে গিয়েছে। তার ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণাও করে দিয়েছেন যে, মুড়িগঙ্গার উপরে সেতু তৈরির কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, এই প্রকল্পে কাকদ্বীপের সঙ্গে রেলপথেও জুড়ে যাবে সাগরদ্বীপ।’’
আরও পড়ুন:
কেন্দ্রের অনুমোদন পাওয়ার পরে লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর শীর্ষকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা সেরে নিয়েছেন শুভেন্দু। গত সপ্তাহে কলকাতা বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে সংস্থার চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর (সিএমডি) এসএন সুব্রহ্মণ্যম-সহ তিন শীর্ষকর্তার সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। বৈঠকটি নবান্নে হওয়ার কথা থাকলেও সে দিন সন্ধ্যায় আচমকাই মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া ঠিক হয়। তাই তারকেশ্বরে প্রশাসনিক কাজ সেরে আর নবান্নে না-ফিরে সরাসরি বিমানবন্দরে চলে যান শুভেন্দু। । সেখানেই অপেক্ষায় ছিলেন এল অ্যান্ড টি কর্তারা। তাঁদের সঙ্গে আধ ঘণ্টার মতো কথা হয় মুখ্যমন্ত্রীর। বৈঠকে মুড়িগঙ্গার উপরে সেতুর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের রূপরেখা প্রস্তাব আকারে সংস্থাটির তরফে পেশ করা হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর। যার মধ্যে রয়েছে নিউটাউনে একটি তথ্যপ্রযুক্তি পার্কের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ। রয়েছে কলকাতা, শহরতলি এবং বিভিন্ন জেলা শহরে যানজট কমানোর জন্য রাস্তা সম্প্রসারণ এবং উড়ালপুল তৈরির প্রস্তাব। বাণিজ্যিক পরিবহণে গতি বাড়ানোর জন্য শহরের বাইরের অংশ বরাবর রিং রোড তৈরির প্রস্তাবও এল অ্যান্ড টি দিয়েছে।
রাজ্যে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি একটা বড় প্রতিবন্ধক। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজই বন্ধ করে দিয়েছিল মমতার সরকার। নতুন সরকার আসার পরে সেই প্রতিবন্ধকতা কাটবে বলেই শিল্প মহলের আশা। কিন্তু কলকাতার নিকটবর্তী এলাকার যে সব জমিতে শিল্পস্থাপন সম্ভব, তার সঙ্গে জাতীয় সড়কের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যা দূর করে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মসৃণ করার ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রস্তাব দিয়েছেন এল অ্যান্ড টি-র শীর্ষ কর্তারা।
পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এল অ্যান্ড টি গোটা দেশেই অন্যতম অগ্রণী সংস্থা। এ রাজ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ তারা অতীতেও করেছে। কিন্তু পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উন্নয়নের সামগ্রিক রূপরেখা স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে তৈরি করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করার আগ্রহ, শুধু এল অ্যান্ড টি নয়, অন্য কোনও সংস্থাও কখনও দেখায়নি। সে দিক থেকে দেখলে এল অ্যান্ড টি-র প্রস্তাব রাজ্যে নতুন সরকার আসার পরে শিল্পমহলে ইতিবাচক বার্তা যাওয়ারই ইঙ্গিত।