×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

পর্যটনের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে পুরাকীর্তি নিয়ে উদাসীনতায়

শুভাশিস সৈয়দ
লালবাগ ০৯ অগস্ট ২০১৪ ০১:৪১

প্রায় ৪৫ একরের জমির উপরে লালবাগে ‘মতিঝিল’ পার্ক তৈরির কাজ চলছে জোরকদমে। ওই পার্ক তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে মুর্শিদাবাদ জেলার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনার নতুন দিক খুলে যাবে ঠিকই। সেই সঙ্গে লালবাগের বিভিন্ন পুরাকীর্তি সংস্কারেরও দাবি উঠেছে। সংস্কারের অভাবে ওই পুরাকীর্তিগুলি ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

একদা বাংলা, বিহার, ওড়িশার রাজধানী এই শহরে রয়েছে বেশ কয়েকটি নবাব পরিবারের কয়েক শতাব্দী ধরে নির্মিত নানা পুরাকীর্তি। পর্যটকদের সেটাই সব থেকে আকর্ষণ করে। কিন্তু অবহেলাও সেখানেই সব থেকে বেশি।

ইতিহাস গবেষক খাজিম আহমেদ জানান, কদম শরিফ মসজিদ, মিরজাফরের বেগম মুন্নি বেগমের নির্মিত চক মসজিদ, নবাব সুজাউদ্দৌলার নির্মিত চেহেল সেতুন, রওশনবাগে নবাব সুজাউদ্দৌলার সমাধি, আজিমুন্নেষার সমাধি, মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র নবাব সরফরাজ খাঁ-এর নির্মিত ফৌতি মসজিদ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

কদম শরিফ এখন ভেঙে তছনচ হয়ে গিয়েছে। নবাব মিরজাফরের নাজির ইতোয়ার আলি খাঁ-র নির্মিত ওই কদম শরিফ মসজিদ (নির্মাণ কাল ১১৯৪ হিজরি বা ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ)-এর পুনর্নিমাণ অত্যন্ত জরুরি। মিরজাফরের বেগম মুন্নি বেগম চক মসজিদ নির্মাণ করেন। ওই মসজিদ বেগম মসজিদ নামেও পরিচিত। মুন্নি বেগম ১৭৬৭ সালে দরবেশ বিনকার ওয়াজেদ আলির তত্ত্বাবধানে চক বাজার এলাকায় চেহেল সেতুনের দক্ষিণে তৈরি করেন ১২৫ ফুটের সুবিশাল চক মসজিদ। ওই মসজিদের সাতটি গম্বুজ ছিল। এখন তার কিছুই নেই।

নবাব সুজাউদ্দৌলা নির্মিত চেহেল সেতুন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে। চেহেল সেতুন-এর ভেতরে ছিল দরবার কক্ষ, নহবতখানা, কাছারি, আস্তাবল। বিশাল একটি কনফারেন্স হল ছিল যা ‘চেহেল সেতুন’। একটা বড় বাগানও ছিল। কিন্তু সেই সবের কোনও কিছুই অবশিষ্ট নেই। কঙ্কালসার ভবনটি ইতিসাহের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

একই ভাবে বর্তমান হাজারদুয়ারির ভাগীরথীর বিপরীত পাড়ে রওশনবাগে নবাব সুজাউদ্দৌলার (১৭২৭-১৭৩৮ রাজত্বকাল) বিশাল সমাধি ভবন রয়েছে। অবিলম্বে ওই সমাধি ভবনের সংস্কার প্রয়োজন। ওই সমাধির গা-লাগোয়া দক্ষিণে শফিউদ্দিন চিস্তি নামে এক ফকিরেরও সমাধি রয়েছে। রওশনবাগে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক মন্দিরও (১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বলে অনুমান)। কিন্তু প্রচারের অভাবে সেই সবও পর্যটকদের চোখের আড়ালে রয়ে গিয়েছে।

ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে আজিমুন্নেষার সমাধি ‘অ্যারাবেস্ক’ শিল্পের উদাহরণ। আরবীয় যে রীতি অনুসারে আজিমুন্নেষার সমাধি নির্মিত হয়েছিল। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ ওই সমাধি অধিগ্রহণ করলেও সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে বলেও অভিযোগ।

খাজিমবাবু বলেন, “হাজারদুয়ারির গ্রন্থাগারে আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লিখিত কোরানের পাণ্ডুলিপি রয়েছে। রয়েছে আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি-র পাণ্ডুলিপিও। কিন্তু শিক্ষিত ভ্রমণকারীদের আড়ালেই তা রয়েছে। পুরনো পাণ্ডুলিপিগুলো দেখানোর পাশাপাশি তার ব্যাখ্যা থাকলে উপকৃত হতেন পর্যটকেরা।” তিনি বলেন, “পূর্ব ভারতে এত বড় ঐতিহ্যসম্পন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার নেই। ওই গ্রন্থাগার সেই ভাবে মেলে ধরতে পারলে পর্যটকরা আরও বেশি করে আগ্রহী হয়ে উঠতেন।”

হাজারদুয়ারি থেকে এক কিলোমিটার পূর্ব দিকে এবং কাটরা মসজিদের পশ্চিম দিকে লালগোলা-শিয়ালদহ রেলপথের পাশেই শহর মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট মসজিদ ফৌতি মসজিদ। মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র নবাব সরফরাজ খাঁ (১৭৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দ) এই মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে গিরিয়ার যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হলে ওই মসজিদ অসম্পূর্ণ অবস্থায় চারি দিক খোলা একটি প্রশস্ত জমির উপরে অবহেলিত এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মসজিদ লাগোয়া জায়গাও বেদখল হয়ে গিয়েছে। মসজিদ নির্মাণে ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ রয়েছে, যা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণের। পশ্চিম দিকের দেওয়ালে বাঙালি শিল্পীকৃত পঙ্কের সজ্জা বিশেষ ভাবে অলঙ্কৃত রয়েছে। চুন-সুরকি দিয়ে দেওয়ালের বাইরের দিকের আস্তরণ তৈরি করা হয়েছে।

মতিঝিল মসজিদ রয়েছে লালবাগ কোর্ট স্টেশন থেকে এক কিমি দক্ষিণে, লালবাগ-বহরমপুর রাজ্য সড়কের ধারেই। আলিবর্দী খাঁয়ের জ্যেষ্ঠ জামাতা ঘষেটি (মেহেরুন্নেষা) বেগমের স্বামী নবাব নওয়াজেস আহমদ খাঁ এই অতি সুদৃশ্য ঝিল এবং তার তীরে ‘শাহি দালান’ নামে এক প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এখন তা অবলুপ্ত।

নওয়াজেস খাঁ (১৭৫০-৫১ খ্রিস্টাব্দ) ওই মতিঝিল মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদে নওয়াজেস-এর স্বহস্ত লিখিত আল্-কোরানের পুঁথি সযত্নে রক্ষিত আছে। মসজিদ প্রাঙ্গণে নবাব সিরাজউদদৌল্লার কনিষ্ঠ ভ্রাতা এক্রামউদদৌল্লার সমাধিও রয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে।

মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটি-র সম্পাদক স্বপনকুমার ভট্টাচার্য বলেন, “হাজারদুয়ারি মিউজিয়ামকে কেন্দ্র করে বহিরাগত পর্যটকদের ভিড় হয়। কিন্তু মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় একশ্রেণির পর্যটক লালবাগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।” তিনি জানান, হাজারদুয়ারির বিপরীত দিকে ভাগীরথীর গা-লাগোয়া হলুদ মসজিদ থেকে ব্রিজ ঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি কয়েক বছর ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সংস্কার করেনি। ফলে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় পর্যটকদের।

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে পর্যটকদের ভিড় হলেই হাজারদুয়ারি মিউজিয়ামের বিভিন্ন গ্যালারি বন্ধ করে রাখা হয়। ফলে পর্যটকদের ওই গ্যালারি দেখা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। স্বপনবাবু বলেন, “সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে গত ৫ অগস্ট মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে।”

হাজরদুয়ারি মিউজিয়ামের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথা পুরাতত্ত্ববিদ নয়ন চক্রবর্তী বলেন, “কর্মীর অভাব রয়েছে। পর্যটকদের ভিড় বাড়লে গ্যালারির নিরাপত্তার কারণে অনেক সময়ে তা বন্ধ করে রাখা হয়। কর্মী অভাবের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”

ইতিহাস গবেষক তথা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রামপ্রসাদ পালের অভিযোগ, “পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে কম কথা হচ্ছে না। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি!”

পর্যটন শিল্প নিয়ে পুরসভা-প্রশাসনের কোনও ভাবনা-চিন্তা নেই বলে সমালোচনা করেন মুর্শিদাবাদ নগর উন্নয়ন কমিটির কর্ণধার এ আর খান। তিনি বলেন, “মতিঝিল পার্ককে ঘিরে লালবাগবাসী আশায় বুক বেঁধেছে। আশা করব নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ওই পার্ক নতুন দিশা দেখাবে।”

Advertisement