×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

লক্ষ্মীলাভে পর্যটনই ভরসা, অতিথিশালার দাবি নবদ্বীপে

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
নবদ্বীপ ১৫ অগস্ট ২০১৪ ০০:৪৬
হোটেল নয় মঠ। —নিজস্ব চিত্র।

হোটেল নয় মঠ। —নিজস্ব চিত্র।

নদী থেকে উঠে আসা নতুন দ্বীপ। তাই নবদ্বীপ। নবদ্বীপ মানে ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, দর্শন সমাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি, বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতির এক বহুমাত্রিক পরিক্রমা। সে যাত্রায় কখনও সঙ্গী বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর, কখনও তুর্কি হানাদার বখতিয়ার খিলজি। পুন্যতোয়া গঙ্গার তীরে এই ভূখণ্ডেই জন্মেছিলেন চৈতন্যদেব স্বয়ং। পর্যটক আকর্ষণের এমন ষোড়শপচার আয়োজন বড় একটা চোখে পড়ে না। তা সত্ত্বেও নবদ্বীপে গড়ে ওঠেনি কোনও সুসংবদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র। উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং পরিকল্পনার অভাবে রাজ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার যাবতীয় ক্ষেত্র তৈরি থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি নবদ্বীপ।

অথচ প্রায় সারা বছর ধরেই নবদ্বীপে পর্যটকেরা এসে চলেছেন। তাঁদের কেউ আমেদাবাদ থেকে তো কেউ আমেরিকা থেকে। দোল, রাস, ঝুলন, জন্মাষ্টমী, গাজন, চড়ক—নবদ্বীপে উৎসবের শেষ নেই। অন্ত নেই মানুষের যাতায়াতেরও। গঙ্গার পশ্চিমপাড়ের নবদ্বীপ এবং পূর্বপাড়ের মায়াপুরকে নিয়ে যমজ পর্যটন কেন্দ্র ঠিক মতো গড়ে তুলতে পারলে এলাকার অর্থনীতির চেহারাই বদলে যাবে বলে মনে করেন সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে অর্থনীতির অধ্যাপকরা।

একদা বস্ত্র, শঙ্খশিল্প, কাঁসা-পিতলের বাসন এবং পরবর্তীতে তাঁতের শাড়িকে ঘিরে নবদ্বীপে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এখন সে সব অতীত। আটের দশক থেকে সাগরপারের কৃষ্ণ ভক্তেরা দলে দলে মায়াপুর ইস্কনে আসা শুরু করার পর থেকে অর্থনীতিটা বদলে যায় ক্রমশ। বৈষ্ণবদের অন্যতম গন্তব্য নবদ্বীপ ধামের অর্থনীতি এখন মূলত পর্যটন নির্ভর। নির্ভরতা এতটাই যে দোলের সময় হয়তো বাড়ির সামনে ‘মিনারেল ওয়াটারে’র স্টল খুলে এক জনের ছ’মাসের উপার্জন হয়ে যায়। আবার শুধু ডাব বিক্রি করতে ভিন্ দেশের কর্মক্ষেত্র থেকে এই সময়টা বাড়ি ফিরে আসেন অনেকে। জামা-কাপড়, মিষ্টি-খাবারের দোকান বা খুচরো বিক্রির বাজারটা বেড়ে যায় পর্যটকদের সুবাদে। নবদ্বীপবাসী তাই চান আরও বেশি করে দেশি-বিদেশি পর্যটক আসুক শহরে।

Advertisement

কিন্তু চাইলেই তো হবে না। এমনিতেই রেললাইন আর গঙ্গা, জলঙ্গি দিয়ে ঘেরা নবদ্বীপের আড়ে-বহরে বাড়ার বিশেষ সুযোগ নেই। ফলে রাজ্যের অন্যতম জনবহুল শহরটিতে দোল কিংবা রাসের মতো উৎসবে লাখো মানুষের ভিড়ে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ রব। পুরনো এই শহরে ভাল মানের হোটেল নেই বললেই চলে। এক-আধটা যা আছে তা সাধারণের নাগালের বাইরে।

সাধারণ ভাবে নবদ্বীপের অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা হয় বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের অতিথিশালায়। কিন্তু উৎসবের সময় মঠ-মন্দিরেও ঠাঁই মেলা ভার। কারণ সেই সময়ে যাঁরা ভক্ত, বিশেষ করে বিদেশি ভক্ত, তাঁদের অগ্রাধিকার মঠে। নবদ্বীপের গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের সম্পাদক অদ্বৈত দাস বলেন, “অন্যান্য সময় নবদ্বীপের সমস্ত মঠ-মন্দিরের নিজস্ব অতিথিশালায় ভক্ত ছাড়াও সাধারণ পর্যটক থাকতে পারেন। কিন্তু দোল বা রাসের সময় সেটা সম্ভব হয় না। তখন আমাদের নিজেদের ভক্ত বা শিষ্যদের থাকার ব্যবস্থা করতে নাজেহাল হয়ে যাই। উল্টে আমরাই তখন আশপাশের ফাঁকা ঘর ভাড়া নিতে বাধ্য হই।” অগত্যা বিভিন্ন মঠে বিপুল ভক্তের রাত্রিবাসের চাপ সামলাতে মন্দিরের ফাঁকা জায়গায় বা ছাদে মণ্ডপের ব্যবস্থা করতে হয়। গোশালা থেকে নাটমন্দির কোথাও ফাঁকা থাকে না। দশ-পনেরো হাজার মানুষের ভিড় এক-একটি মঠে। মাথা গোঁজাগুঁজি করে থাকাটা ভক্তরা সৌভাগ্য বলে মনে করলেও যতটা কম রাত্রিবাস করার চেষ্টা করেন। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব বলেন, “সবার আগে নবদ্বীপে প্রয়োজন এক বা একাধিক সরকারি অতিথিশালা। যেখানে এসে উচ্চ, মধ্য এবং নিম্ন আয়ের মানুষ তাঁদের সাধ্যমতো সুস্থ, ঘরোয়া পরিবেশে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। যাঁরা গাড়ি আনবেন তাঁদের গাড়ি, চালক থাকার ব্যবস্থা-সহ আধুনিক গেস্ট হাউস দরকার।”

এর পরেই যেটা জরুরি, সেটা হল পর্যটনের স্বার্থে শহরের রাস্তাঘাট এবং যানবাহনের দিকে নজর দেওয়া। পুরনো ঘিঞ্জি শহরকে হয়তো পাল্টানো যাবে না। কিন্তু সঙ্কীর্ণ পথঘাট যতটা সম্ভব দখলমুক্ত এবং যানজটমুক্ত রাখা, নিয়মিত রাস্তা সংস্কার করা এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে পুরসভাকে আরও নজর দিতে হবে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। গুরুত্ব দিতে হবে শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণেও। বিশেষ করে রিকশাচালকরা যাতে পর্যটকদের অযথা হয়রান না করে সেদিকে নজর দিতে হবে। সম্প্রতি নবদ্বীপে চালু হয়েছে ব্যাটারি চালিত টোটো। টোটো আর রিকশা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যাতে জট না পাকায়, সে দিকে নজর দিতে হবে। টোটোর সংখ্যা আরও বাড়লে রুট ঠিক করা বা স্থায়ী স্ট্যান্ড করে দেওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে। নবদ্বীপ নাগরিক কমিটির সম্পাদক দিলীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “একটা সামগ্রিক যান নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা দরকার। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত পথকে একমুখী করলে ভাল হয়।”

নবদ্বীপে কোথাও কোনও স্থান-নির্দেশ না থাকার জন্য পর্যটকদের অসুবিধা হয়। বিদেশি এক পর্যটকের কথায়, “শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, স্টেশন, খেয়াঘাট, বাসস্ট্যান্ডে প্রধান দ্রষ্টব্য স্থানগুলির নাম ও কী ভাবে যাওয়া যায় উল্লেখ থাকলে আমাদের খুব সুবিধা হবে।”

নবদ্বীপের বিধায়ক তথা রাজ্যের জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দফতরের মন্ত্রী পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা অবশ্য জানাচ্ছেন, পর্যটনের বহু প্রাচীন কেন্দ্র নবদ্বীপকে আধুনিক সাজে সাজিয়ে তোলার জন্য নানা পদক্ষেপ করা হচ্ছে। নবদ্বীপের প্রাচীন মায়াপুরে একটি বড় মাপের যুব আবাস তৈরির কথা জানান তিনি। এ ছাড়াও গোটা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ করার জন্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানান পুরপ্রধান। রাসের আগে রাস্তা সরানোর মতো কাজগুলোও করে ফেলার আশ্বাস দিয়েছেন পুর-কর্তৃপক্ষ।

আশ্বাসে কতটা আশা রাখা যায়, সেটাই দেখার।

Advertisement