Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০২ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

নবাবি আমলের শহরে সঙ্কট পানীয় জলের

মুর্শিদাবাদ পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শাহনগর ঘাটের কাছে রাস্তার পাশেই সরকারি দু’টি ট্যাপকল অচল হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে এলাকার বাসিন্দাদের নলকূপের

শুভাশিস সৈয়দ
লালবাগ ০৭ অগস্ট ২০১৪ ০০:৩৭
Save
Something isn't right! Please refresh.
কল থাকলেও মেলে না জল। ছবি: গৌতম প্রামাণিক

কল থাকলেও মেলে না জল। ছবি: গৌতম প্রামাণিক

Popup Close

মুর্শিদাবাদ পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শাহনগর ঘাটের কাছে রাস্তার পাশেই সরকারি দু’টি ট্যাপকল অচল হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে এলাকার বাসিন্দাদের নলকূপের জলের উপরেই ভরসা করতে হচ্ছে। কিন্তু গভীর নলকূপ না হওয়ার ফলে তার ওই জল পান করা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা! জনস্বাস্থ্য কারিগরী দফতরের সরবরাহ করা জল এখন পর্যন্ত রেললাইনের পূর্বপাড়ে পুরসভার ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডগুলিতে সরবরাহ হয় না। ওই সব ওয়ার্ডে নলকূপও রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই। বেশ কিছু এলাকায় গরমের সময়ে জলের টান পড়ে। এমনকী পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্সেনিক দূরীকরণ প্রকল্প খাতে ভাগীরথী থেকে জল তুলে তা পরিশোধিত করে মুর্শিদাবাদ-জিয়াগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন গ্রামে ওই পরিস্রুত পানীয় জল সরবরাহ হয়ে থাকে। কিন্তু পরিস্রুত ওই পানীয় জল থেকে পুর-এলাকার বাসিন্দারা বঞ্চিত!

সুবে বাংলার রাজধানী স্থাপনের সূচনাকালেই মুর্শিদাবাদ শহরের মর্যাদা পেতে শুরু করে। সুবে বাংলার দেওয়ানির প্রধান দফতর হয় মুর্শিদাবাদে ১৭০৪ সালে। মুর্শিদকুলি খাঁ ১৭১৭ সালে সুবেদার হওয়ায় মুর্শিদাবাদ সুবে বাংলার রাজধানীতে পরিণত হয়। এর পরে মুর্শিদাবাদ পুরসভার প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৮৬৯ সালে। মুর্শিদাবাদের সঙ্গেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জঙ্গিপুর, কান্দি পুরসভাও। মুর্শিদাবাদের প্রথম পুরপ্রধান হন মিরজাফরের উত্তরসূরী নবাব ইসকান্দার আলি মির্জা বা সুলতান সাহেব।

১৪৫ বছরের প্রাচীন মুর্শিদাবাদ শহরের পানীয় জল সরবরাহ করার ব্যবস্থা এখনও নবাবি আমলেই পড়ে রয়েছে। যার ফল ভুগতে হচ্ছে পুর-নাগরিকদের। যদিও ২০১০ সালে পুরভোটের আগে প্রতি বাড়িতে পানীয় জল সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুরবোর্ডে ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পরেও পানীয় জল সঙ্কট মোচনে পুর-কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ করেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরবোর্ডের উপরে ক্ষুব্ধ পুর-নাগরিকরা।

Advertisement

পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তথা শিক্ষিকা শামসুন্নাহার হক বলেন, “বাড়ির সামনে ট্যাপকল রয়েছে। কিন্তু পাইপ লাইনে কোনও জল আসে না। ট্যাপকলের ভরসা ছেড়ে দিয়ে তাই এলাকার বাসিন্দারা ২০ লিটারের মিনারেল ওয়াটার জল কিনে খেতে শুরু করেছেন।” কিন্তু যাদের ওই পানীয় জল কিনে খাওয়ার আর্থিক সঙ্গতি নেই। তাঁরা কী করবেন? ৪ নম্বরে ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনীশ মণ্ডল বলেন, “পানীয় জলের কষ্টে ভুগতে হচ্ছে। আমাদের ওয়ার্ডে যেমন পাঁচরাহা মোড়ের পর থেকে এসডিও কার্যালয়ের যাওয়ার পথে পুরসভার কোনও ট্যাপকলে জল পাওয়া যায় না। পুরসভায় অভিযোগ জানিয়েও কোনও ফল হয়নি।”

প্রতি দিন সকালে সাড়ে ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত, দুপুরে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এবং দুপুর সাড়ে ৩টে থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্যাপকলে জল সরবরাহ হয়। কিন্তু দেখা গিয়েছে, জলের লম্বা লাইন। কিন্তু সময়ের আগেই আচমকা জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলেও অভিযোগ।

তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহম্মদ আলির অভিযোগ, “পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে জলপ্রকল্প তৈরি হওয়ায় ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা পরিস্রুত পানীয় জল পেলেও পুর-এলাকার বাকি অংশে ওই জল সরবরাহ হয় না। শহরের বাকি অংশের মানুষ দু’বেলা সাইকেল-ভ্যান রিকশায় করে বোতলে ও জেরিকেন ভর্তি করে জল সংগ্রহ করে নিয়ে যান। এতে পুরসভার উদাসীনতায় দায়ি।”

এমনিতেই প্রাচীন মুর্শিদাবাদ শহরে পানীয় জলের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। প্রতি বছরই তীব্র গরমে জলকষ্টে ভুগতে হয় পুরবাসীদের। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোথাও বালতির লম্বা লাইন। কোথাও বা সাত-সকালে কলপাড়ে চিল-চিৎকারে কান পাতা দায়। কোথাও হাতাহাতিও হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগকোথাও পাইপ লাইন থাকলে ট্যাপকল নেই। পাইপ লাইন বা ট্যাপকল থাকলেও সরু ফিতের মতো জল পড়ছে। কোথাও শুধু নলকূপ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে তা অকেজো। সারানোর কোনও উদ্যোগ নেই। কোথাও জলের পাইপ লাইন ফাটা। কলের মুখ দিয়ে না পড়ে ফাটা পাইপ দিয়েই জল গড়াচ্ছে। কোনও কোনও ওয়ার্ডে ট্যাপকলের মুখই নেই। ট্যাপকলের নল দিয়েই অনবরত জল পড়ে অপচয় হচ্ছে।

ওই সব দেখে শুনে মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন পুরপ্রধান ফরওয়ার্ড ব্লকের সুরজিৎ বসাক বলেন, “পরিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছেন শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিশেষ করে পুরসভার পূর্ব দিক লাগোয়া ৭, ১১, ১৬ ওয়ার্ডের নম্বরের মানুষ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। পুরসভার নলকূপ রয়েছে। কিন্তু মাটির কোন স্তরে পাইপ লাইন বসানো হয়েছে, তা জানা নেই। ফলে টিউভওয়েলের জল পান করা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও বস্তিবাসী থেকে পুরবাসীদের একাংশ ওই জল পান করতে বাধ্য হচ্ছেন।”

পুরসভা এলাকায় জল সরবরাহের জন্য জলের ট্যাঙ্কটি ৯ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে। তবুও ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জলকষ্টে ভুগতে হচ্ছে। পুরসভার বসতিপূর্ণ এলাকা কমলবাগে পুরসভার জল পাওয়া যায় না বললেই চলে। পণ্ডিতবাগ, কুর্মীতলা, মতিঝিল, হরিবাগ, দুবুয়াপাড়া, নসিপুর এলাকায় জলের টান দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।

এই অবস্থায় গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘জওহরলাল নেহরু আরবান রিনিউয়্যাল মিশন’-এর আওতায় বাড়ি বাড়ি জল সরবরাহ করার কেন্দ্রীয় সরকারের ওই প্রকল্পের ঘটা করে উদ্বোধনও হয়। এতে মুর্শিদাবাদের পুরবাসিন্দারা কোথাও আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ওই প্রকল্পের কাজ থমকে রয়েছে। ফলে পুর-নাগরিকদের পানীয় জল সমস্যা কোথাও রয়েই গেল! পুর-কর্তৃপক্ষও নাগরিকদের কোনও আশার বাণী শোনাতে পারেনি।

পানীয় জল সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়ে পুরসভার কাউন্সিলর বিপ্লব চক্রবর্তী বলেন, “‘জওহরলাল নেহরু আরবান রিনিউয়্যাল মিশন’-এর আওতায় বাড়ি বাড়ি জল সরবরাহের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক ৩৪ কোটি টাকার অর্থ অনুমোদনও দেয়। সেই মতো গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের উদ্বোধনও হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় জলের ট্যাঙ্ক নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষার কাজও হয়েছিল। এমনকী অর্থ বরাদ্দের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বদল হওয়ায় ওই প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে আপাতত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি থমকে রয়েছে।”

বিপ্লববাবু বলেন, “জনস্বাস্থ্য কারিগরী দফতরের ট্যাপকলের সংখ্যা রয়েছে ১১০টি। সেই মতো জলাধারও নির্মিত হয়। কিন্তু গত ৩০ বছরে এলাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে মানুষের চাহিদার কথা ভেবে জনস্বাস্থ্য কারিগরী দফতরের অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ৫০০ জলের লাইনের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই একটি মাত্র জলাধার থেকেই জল সরবরাহ করার ফলেই জল সঙ্কট তৈরি হয়েছে।”

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement