×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

আমের হিমঘর নেই, হয়নি শিল্পও

অভিজিত্‌ সাহা
মালদহ ১১ মার্চ ২০১৫ ০২:৫৭
মোথাবাড়িতে চলছে আম প্যাকিংয়ের কাজ। ছবি: মনোজ মুখোপাধ্যায়।

মোথাবাড়িতে চলছে আম প্যাকিংয়ের কাজ। ছবি: মনোজ মুখোপাধ্যায়।

রাশি-রাশি আম উত্‌পাদন হয় মালদহে। দেশে তো বটেই, বিদেশের বাজারেও চাহিদা রয়েছে এখানকার আম ও আমজাত খাবারের। অথচ আজও সেই আম-নির্ভর কোনও শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি মালদহে। তাতে হতাশ আমচাষিরা। তাঁরা প্রায় সকলেই সরকারি উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। জেলায় আম নিয়ে কোনও শিল্প কতদিনে গড়ে উঠবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

ইংরেজবাজারের আম চাষি গুরুপদ মন্ডল বলেন, “আমের মরসুমেই আমাদের যা রোজগার হয়। কিন্তু সময়ের মধ্যেই আম বিক্রি করতে হয়। অথচ আমের চাহিদা জেলাতে সারা বছরই রয়েছে। আম মজুত রাখার জন্য তেমন কোনও হিমঘর পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। ফলে আমাদের সময়ের মধ্যেই ব্যবসা শেষ করতে হয়।” আমচাষি শিবনাথ মাহাতো জানান, আমের উপরে হাজার হাজার পরিবার নির্ভরশীল। সেখানে ওই ফলকে ঘিরে শিল্প গড়ে উঠলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। তিনি বলেন, “তা হলে আমাদের রোজগারও বাড়বে। তবে সরকারের এই বিষয়ে কোনও হেলদোল আছে বলে মনে হয় না।”

জেলায় আমকে ঘিরে বড় শিল্প গড়ে না ওঠা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি পরস্পরকে দুষছে। ইংরেজবাজার পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান তথা তৃণমূলের জেলার কার্যকরী সভাপতি দুলাল সরকার বলেন, “আম মালদহ জেলার গর্ব হলেও তাকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ার ব্যাপারে বাম আমলে কাজই হয়নি। ফলে জেলায় আম নিয়ে বড় কোনও শিল্প নেই। তৃণমূল জমানায় কাজ শুরু হয়েছে।” কিন্তু, কী কাজ শুরু হয়েছে তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি দুলালবাবু।

Advertisement

সিপিএমের জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্র অবশ্য দাবি করেছেন, জেলায় আম নিয়ে যা কিছু হয়েছে তা বাম আমলেই। তাঁর দাবি, “বাম জমানায় ফুড পার্ক তৈরিতে উদ্যোগী হয় সরকার। তৃণমূল সরকারের আমলে সেই কাজ এগোয়নি।” মালদহ জেলা কংগ্রেসের সভানেত্রী তথা দক্ষিণ মালদহের সাংসদ মৌসম বেনজির নূর জানান, তিনি বাম আমলে বহুবার আম ভিত্তিক শিল্প গড়ার আর্জি জানিয়েছিলাম। সাংসদ বলেন, “এখন ফের সেই অনুরোধ জানাব।” বিজেপির জেলা সভাপতি শিবেন্দু শেখর রায় দাবি করেন, কেন্দ্রের মাধ্যমে মালদহে আম নির্ভর কোনও শিল্প কেন্দ্র গড়া যায় কি না, সেই ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করবেন।

উদ্যান পালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলায় এখন ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। আমের উত্‌পাদনও ভাল। বছরই গড়ে দেড় লক্ষ মেট্রিক টন আম উত্‌পাদন হয়। এবারও গাছে ৯০ শতাংশ মুকুল এসেছে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে এবার বিগত বছরের সমস্ত রের্কডকে ছাপিয়ে যাবে উত্‌পাদন। কিন্তু, মালদহের আম থেকে আমসত্ত্ব, জ্যাম, জেলি,আচার ছাড়াও জুস তৈরি করা যাবে। এমনকী, আমের মশলাও তৈরি করা যাবে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাড়িতেই বহু পরিবার আমসত্ত্ব, আমচুর তৈরি করেন।

পুরাতন মালদহের একটি সমবায় সমিতি রয়েছে। তার নাম দেওয়া হয়েছে মালদহ ম্যাঙ্গো কো-অপারেটিভ সোসাইটি, সেখানে জ্যাম, জেলি, আচার, জুস প্রভৃতি তৈরি হয়। তবে প্রচারের অভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি সমিতি। সমিতির ম্যানেজার ওঙ্কার সরকার বলেন, “১৯৯১ সালের ডিসেম্বর থেকে এই কারখানাটি চলছে। এর মান খুব ভাল। তবে প্রচারের অভাব রয়েছে। প্রচার হলে বাজারের আরও চাহিদা বাড়বে।”

আম ব্যবসায়ীরা জানান, জেলায় আম চাষের সঙ্গে ৪০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত রয়েছেন। আমকে কেন্দ্র করে বড় কোনও শিল্প গড়ে উঠলে জেলাতে কর্ম সংস্থান আরও বাড়বে বলে দাবি ব্যবসায়ীদেরও। ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নব সাহা বলেন, “আমের চাহিদা সারা বছরই থাকে। তবে শুধু মাত্র মরসুমেই আম মেলে। কারণ, আম মজুত রাখার তেমন ব্যবস্থা নেই। আম যেহেতু পচনশীল ফল। তাই পচে যাওয়ার আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করতে হয়। সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থা করলে জেলার আম চাষিরা খুবই উপকৃত হবেন।”

মালদহের ব্যবসায়ী সমিতির জেলা সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা জানান, জেলায় অনেক বাড়িতেই আমসত্ত্ব তৈরি হয়ে থাকে। গ্রামীণ পদ্ধতিতে তাঁরা তা তৈরি করেন। জেলাতে প্রচুর শ্রমিক রয়েছেন। জেলার প্রচুর শ্রমিক ও বিশাল আমের উত্‌পাদনকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্প গড়ে উঠতে পারে। সে জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানাচ্ছি। উদ্যান পালন দফতরের জেলার সহ অধিকর্তা রাহুল চক্রবর্তী বলেন, “আম রসালো ফল হওয়ায় তা সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। খুব বেশি হলে দুই সপ্তাহ সংরক্ষণ করে রাখা যায়, সে জন্য বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখছেন।” উদ্যান পালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাসায়নিক ছাড়াই আমের শাঁস সংরক্ষণ করার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ফলে, আমের শাঁস সংরক্ষণ করে রাখা থাকলে সেটি জুসের কাজে ব্যবহার করা হবে। এখান থেকে যারা জুস প্রস্তুতকারক তাঁরা কিনতে পারবেন।

রাজ্যের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যান পালন দফতরের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী বলেন, “মালদহের আমের সুনাম আরও বাড়াতে গত বছর দিল্লি বাজারের পাঠানো হয়েছিল। এবারও পাঠানো হবে। বাংলাদেশে যাতে আম পাঠানো যায়, সে জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কথা বলব। আমের শাঁস সংরক্ষণ করার একটি পরিকল্পনা আমরা নেওয়ার চেষ্টা করছি। জেলার আম নিয়ে চিন্তাভাবনা রয়েছে। শিল্পের বিষয়েও চেষ্টা করা হচ্ছে।”

(শেষ)

Advertisement