×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

পর্যটক টানতে ছাড় বর্ষার ডুয়ার্সে

কৌশিক চৌধুরী
শিলিগুড়ি ১৫ জুলাই ২০১৪ ০২:১৯
চা বাগানের মাঝে সবুজে ঘেরা এমন বাংলোতেই থাকতে পারবেন পর্যটকেরা। —নিজস্ব চিত্র।

চা বাগানের মাঝে সবুজে ঘেরা এমন বাংলোতেই থাকতে পারবেন পর্যটকেরা। —নিজস্ব চিত্র।

কাঠের বাংলোর টিনের চালে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা। চার দিকে সবুজ জঙ্গল বা চা বাগান। ঝোরা-নদী কানায় কানায় ভর্তি। ঘন জঙ্গলের ঘেরাটোপ প্রায় জাতীয় সড়কের উপরে এসেই পড়ছে। মাঝেমধ্যে সজোরে বৃষ্টির জন্য চার দিক কুয়াশার মতো সাদা। ডুয়ার্সের বর্ষার এই সৌন্দর্যকে সম্বল করেই জনপ্রিয় হচ্ছে নতুন পর্যটন মরসুম।

শীত, গ্রীষ্ম, পুজো-এই তিন পর্যটন মরসুমের পর এ বার ‘মনসুন পর্যটন’ শুরু করতে উদ্যোগী ডুয়ার্সের পর্যটন সংস্থাগুলি। বর্ষার প্রকৃতি চোখ টানলেও অনেক সময় বন্যা, ধস থেকে শুরু করে নদী ভাঙনে বিপর্যস্ত হয় জনজীবন। তাতে পিছিয়ে পড়ে পর্যটন। কিন্তু এ সব এড়িয়েও বর্ষাকে উপভোগ করার জন্য উত্তরবঙ্গ জুড়ে শুরু হয়েছে ‘মনসুন ট্যুরিজম’। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ডুয়ার্সের বহু হোটেল ছাড় দিচ্ছে। শুধু বৃষ্টিতে ভেজা নয় ডুয়ার্সের গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে হাতে হাতে মিলিয়ে পর্যটকেরা ধান খেতে বীজ রোপণ থেকে শুরু করে চা বাগানের পাতা তোলার সুযোগও পাচ্ছেন ওই প্যাকেজে।

ভারতে কেরল বা গোয়ার মতো রাজ্যে বর্ষায় পর্যটকদের টানা চালু রেওয়াজ। গত কয়েক বছর থেকে ডুয়ার্সের পর্যটন ব্যবসায়ীরাও এই প্যাকেজকে নিয়ে প্রচার শুরু করছেন। চলতি বছরে যা অনেকটাই সফল বলে তাঁরা তো বটেই, সরকারি অফিসাররাও মনে করছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, অরণ্য তিন মাসের জন্য বন্ধ থাকলেও জঙ্গল বা চা বাগানকে ঘিরে যে প্রচুর ঘোরার জায়গা রয়েছে তাই প্রচার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হোটেল বা রিসর্ট মালিকেরা ঘর ভাড়ার প্রচুর ছাড়া দিচ্ছেন। ডুয়ার্সে তো গত মাস থেকে ঘরভাড়ায় ৪০-৫০ শতাংশ ছাড়ের কথা ঘোষণা হয়েছে। এতে পর্যটকদের আকর্ষণ অনেকটাই বেড়েছে। বর্ষার অফ সিজিনে হোটেল বা রিসর্টের রক্ষণাবেক্ষণও খরচও অনেকটা উঠে আসছে।

Advertisement

রাজ্য পর্যটন দফতরের উত্তরবঙ্গের জয়েন্ট ডিরেক্টর (নর্থ) সুনীল অগ্রবাল বলেন, “আগে বর্ষার সময় এ অঞ্চলে কার্যত পর্যটকেরা আসতেনই না। গত কয়েক বছর ধরে চেষ্টার পর এ বার পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। বিভিন্ন পর্যটন মেলা, উৎসবে আমরা মনসুন ট্যুরিজম নিয়ে প্রচারও করছি। নিখাদ বর্ষাকে উপভোগ করতে মানুষ আসছেন।” তিনি জানান, জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে তিন মাস জঙ্গল বন্ধ থাকে। হাতি সাফারি বা কার সাফারি বন্ধ। তার পরেও ৩১টি ঘরের মধ্যে এ বারই প্রথম বার ১২-১৩টি ঘর প্রতিদিন এখন বুকিং থাকছে।

প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর অবধি বর্ষার মরসুমে সমস্ত জঙ্গল, জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য বন্ধ থাকে। জুনের শেষেই কার্যত শেষ হয়ে যেত পর্যটন মরসুম। পুজোর আগে ফের পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় এই অঞ্চলে। পাহাড়কে ততটা না ছুঁয়ে অবশ্য এই প্যাকেজগুলি তৈরি করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তার একটা কারণ উঁচু পাহাড়ি এলাকার কিছু অংশে বর্ষায় জোঁকের উপদ্রব। শুধুমাত্র কার্শিয়াং, মিরিক, সামসিং বা গরুবাথান মত কিছু পাহাড়ি এলাকায় চা বাগানের ব্রিটিশ আমলের বাংলোগুলিকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলা হচ্ছে। লাটাগুড়ি, ঝালং, জলঢাকা, জয়ন্তী, রাজাভাতখাওয়া, সামসিং, সুন্তালেখোলা, চালসার মতো এলাকায় পর্যটকেরা ভিড় করছেন।

প্যাসেফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) ইন্ডাস্ট্রি কাউন্সিল সদস্য সম্রাট সান্যাল জানান, বছরে পর্যটনের দিন বলতে ১০০-১২০ দিন। তিন মাস বর্ষার পুরোপুরি অফ-সিজন বলা হয়। কিন্তু মনসুন ট্যুরিজম চালু হতে সে ধারণা পাল্টাচ্ছে। তাঁর কথায়, “আমরা ২০০৯-১০ সাল থেকে কাজ শুরু করি। কিন্তু পাহাড়, ডুয়ার্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে সামগ্রিক ভাবেই পর্যটন এই অঞ্চলে মার খায়। এত দিনে মনসুন ট্যুরিজম একটি জায়গায় পৌঁছেছে। বছরে এক থেকে দেড় মাস পর্যটন মরসুম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।” উত্তরবঙ্গের পর্যটন ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজার্রভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজমের পক্ষে রাজ বসু বলেন, “মানুষ বর্ষাকে ভালবাসেন। কিন্তু তাতে ঘোরার কথা বললে চিন্তায় পড়তেন। সেই চিন্তাধারা বদলাচ্ছে। প্রচুর মানুষ সবুজের টানে বর্ষায় উত্তরবঙ্গে আসছেন। আগামী বছর থেকে এই সময় একটি পর্যটন উৎসবও করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

Advertisement