Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

আধার নেই, ভাঙা ঘর তাই জোড়া লাগছে না

রাজু সাহা
মহাকালগুড়ি ২৬ জানুয়ারি ২০২১ ০৫:১৯
ভাঙা ঘরের সামনে বসে ফ্রান্সিস খড়িয়া।

ভাঙা ঘরের সামনে বসে ফ্রান্সিস খড়িয়া।
নিজস্ব চিত্র

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের দুর্গম বনাঞ্চল ঘিরে রেখেছে একটি দিক। অন্য দিকে রায়ডাক নদী। সেখানে আবার সেতু নেই। ভরসা একটা ছোট্ট নৌকা। সেই খেয়ায় নদী পেরলে খড়িয়া বস্তিতে যাওয়ার রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতেই বুঝতে পারবেন, সেটা চলাচলের অযোগ্য। পথ ঢুকেছে খড়িয়া বস্তিতে। গোটা গ্রাম জুড়ে অনুন্নয়নের ছাপ। বস্তিতে ৩২টি পরিবারের বাস। সবাই দারিদ্রসীমার নীচে। প্রত্যেকের জমি থাকলেও হাতির হানায় চাষাবাদ বন্ধ। কেউ মাছ ধরেন, কেউ দিনমজুর। আদিবাসী প্রধান এই গ্রামে কিন্তু এখনও অনেকেরই তফসিলি জনজাতির শংসাপত্র নেই। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা জিৎরাম খড়িয়া। বয়স ছাপান্ন বছর। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার একটি ঘর পাওয়ার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ব্লক প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। ঘর মেলেনি। একমাত্র কুঁড়ে ঘরটি হাতি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। দিনমজুর জিৎরামের পক্ষে ঘর মেরামত করার সামর্থ নেই। রাতে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিবেশীদের ঘরে রাত কাটে জিৎরামের। কিন্তু কত রাত এ ভাবে কাটবে?

প্রশ্ন: আপনার ঘর নেই? সরকারি ঘরের জন্য আবেদন করেননি?

জিৎরাম: একটি ঘরে দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঠাসাঠাসি করে থাকতাম। গত কয়েক বছর ধরে সেটিরও হালও খারাপ হয়ে পড়েছিল। জোড়াতালি দিয়ে কোনওমতে মাথা গুঁজে ছিলাম ঘরটিতে। কিন্তু একমাত্র সেই ঘরটিও হাতি ভেঙে দিয়েছে। গত তিন দশক ধরে ঘরের জন্য আবেদন জানাচ্ছি। ঘর পাইনি। এখন অন্যের বাড়িতে রাত কাটাতে হয় আমাদের।

Advertisement

প্রশ্ন: কেন পাচ্ছেন না ঘর?

জিৎরাম: আধার কার্ড নেই। তাই ঘর পাচ্ছি না— জানিয়েছেন পঞ্চায়েতের বাবুরা। আধার কার্ডের জন্য কয়েক বার আবেদন করেছি। কিন্তু কার্ড মেলেনি। এখন বিডিও অফিসে গিয়ে আধার কার্ডের আবেদন করতে হয়। দু’দিন যেতে হবে। আমরা দিনমজুর। কাজে না গেলে ঘরে উনুন জ্বলে না। তাই কাজ বন্ধ রেখে আধার কার্ড করতে যেতে পারছি না।

প্রশ্ন: সমস্যা নিয়ে দুয়ারে সরকারে যাননি?

জিৎরাম: তিন দশকেও ঘর পাইনি। আধার কার্ড না হলে ঘর পাব না, এ কথা তো প্রশাসনের কর্তারা আগেই জানিয়েছিলেন। তাই আর যাইনি।


আমি বরাবর তৃণমূল করি। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে আশায় ছিলাম, এবার হয়তো ঘর পাব।

- জিৎরাম খড়িয়া, খড়িয়া বস্তির বাসিন্দা


প্রশ্ন: গ্রামের অন্য আর কেউ ঘর পাননি?

জিৎরাম: গ্রামের সবার ঘরের দরকার। ঘর থাকলেও সেগুলি ভেঙে পড়ছে। মাত্র ২-৩ জন ঘর পেয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার ঘর না পাওয়ার অন্য কোনও কারণ আছে?

জিৎরাম: আমি বরাবর তৃণমূল করি। হয়তো সিপিএম আমলে তার জন্য ঘর পাইনি। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে আশায় ছিলাম, এবার হয়তো ঘর পাব। রায়ডাক নদীর উপর সেতু তৈরি হবে। বিধায়ক, সাংসদরা এসে অনেক আশ্বাস দিয়েছেন। সেতুও হয়নি। আর আমার ঘরও না। দু’টোরই কপালে দেখছি গেরো আছে।

ওই বস্তির আর এক বাসিন্দা পঁয়ষট্টি বছরের ফ্রান্সিস খড়িয়া। চার ছেলেমেয়ে তাঁর। এক ছেলে অসুস্থ। বাকি দুই ছেলে দিনমজুর। ফ্রান্সিসের তফসিলি জনজাতির শংসাপত্র হয়নি। জানালেন, অনটনে দিন কাটে। ভাতাও পান না।

প্রশ্ন: এত দিনেও তফসিলি জনজাতির শংসাপত্র হয়নি কেন? আবেদন করেননি?

ফ্রান্সিস: আমাদের এসটি সার্টিফিকেট করতে হবে, সেটাই তো এত দিন জানতাম না। পাঁচ বছর আগে জানলাম আমরা এসটি বা তফসিলি জনজাতি। ওই শংসাপত্র থাকলে অনেক সুবিধা মেলে। এর পর আবেদন জানাই। ছেলেমেয়েদের শংসাপত্র হয়ে গেলেও আমি পাইনি।

প্রশ্ন: দুয়ারে সরকারে যাননি? সেখানে গেলে তো শংসাপত্র পেয়ে যেতেন।

ফ্রান্সিস: শরীরে শক্তি নেই। এতটা পথ হেঁটে, নদী পেরিয়ে শিবিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যাওয়া হয়নি।

প্রশ্ন: সরকারি পরিষেবা কিছু পেয়েছেন?

ফ্রান্সিস: বার্ধক্য ভাতা পেলে সুবিধা হত। কিন্তু পাচ্ছি না। ঘর পেয়েছি। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তির টাকা না পাওয়ায় ঘরটি অর্ধেক কাজ হয়ে পড়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

Advertisement