×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

আগাছায় ঢাকছে মন্দির, খোঁড়াচ্ছে পর্যটন

স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়
বিষ্ণুপুর ০৭ অগস্ট ২০১৪ ০০:৩৯
বিস্মৃতির-গ্রাসে। যুগল কিশোর কৃষ্ণ-বলরামের মন্দির

বিস্মৃতির-গ্রাসে। যুগল কিশোর কৃষ্ণ-বলরামের মন্দির

এ শহরের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। মোরামের লাল ধুলো পায়ে মেখে একের পর এক মন্দির দেখে টেরোকোটার কাজে চোখে মুগ্ধতা ভিড় করে। কিন্তু সেই ঘোর কাটিয়ে পর্যটকদের আরও বেশি বিস্মিত করে মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুরের পরিকাঠামোর অভাব। এখানে পথের পাশেই জমে থাকে আবর্জনা। দুর্গন্ধের মধ্যে তো নাকে রুমাল চেপে আর যাই হোক, মন্দিরের সৌন্দর্য উপভোগ করার মানসিকতা থাকে না। ভাঙা রাস্তায় রিকশার ঝাঁকুনিতে বয়স্কদের প্রায় কোমর ভাঙার জোগাড় হয়। ঐতিহাসিক সৌধ রক্ষা নিয়েও ক্ষোভের শেষ নেই। আর এই সব অভিযোগ নিয়েই বছরের পর বছর ধরে মন্দিরনগরী নামের গর্ব টুকু আঁকড়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর।

বিষ্ণুপুর বলতেই শুধু রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা, শ্যামরাই, মদনমোহন, পাথর দরজা, দলমাদল কামান নয়, এই শহরময় ছড়িয়ে রয়েছে আরও বহু প্রাচীন মন্দির। ইতিহাস গবেষকদের মতে, এই শহরে শ’খানেক মন্দির রয়েছে। তার মধ্যে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ দফতর প্রায় ২০টি মন্দির সংরক্ষণ করছে। কিন্ত রাজ্য পুরতত্ত্ব বিভাগ শহরের একটি মন্দিরও সরংক্ষণ করেনি। ফলে বাকি মন্দিরগুলি কার্যত অবহেলার শিকার হয়ে রয়েছে। আগাছা ও বড় বড় গাছের আড়ালে চলে যাচ্ছে ওই ঐতিহাসিক নির্দশনগুলি। কোথাও কোথাও মন্দিরগুলির গায়ে ঘুঁটে দেওয়া হচ্ছে। এ সব দেখে শিল্পরসিক পর্যটকেরা মনে ব্যাথা পান।

যেমন শ্রীনিবাস আচার্যের সমাধিস্থলে যে রাধা-কৃষ্ণের মন্দির রয়েছে, সেখানে আগাছায় ভরে গিয়েছে। গোরু, ছাগল অবাধে বিচরণ করে। শ্রীনিবাস আচার্যের কন্যা হেমলতা ঠাকুরানির আরাধ্য দেবীর মন্দিরে বাঁধা হচ্ছে গোরু-মহিষ। ষোড়শ শতকে তৈরি হাম্বীর দালান ও টেরাকোটা অলঙ্করণের পাশে দেখা গিয়েছে ঘুঁটে। দর্শণীয় পাথরের রথ যেখানে, সেখানেও এখন শুয়োরের বিচরণ দেখা যায়। মদনমোহন মন্দিরের প্রাচীন জলসত্র-র মাথায় বেড়ে উঠছে গাছগাছালি। নিচে কাঁটা ঝোপ। বাঁকুড়া জেলার এই প্রাচীন শহরকে সাজিয়ে তুলে পর্যটনের আকর্ষণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা যে এখনও বিশ বাঁও জলে তার অন্যতম বড় উদাহরণ চারটি হাওয়ামহল। মল্লরাজাদের তৈরি বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ি লাগোয়া বিশাল উচ্চতার ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর এই স্থাপত্যগুলি নজরদারি ও সংরক্ষণের অভাবে এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

মল্লরাজারা রাজধানী বিষ্ণুপুরকে সাজাতে এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে যে সব ব্যবস্থা নিয়ে গিয়েছিলেন, প্রশাসন সেই ব্যবস্থাগুলিও রক্ষা করতে পারছে না। বিষ্ণূপুরের জল সমস্যা নিবারণের জন্য খনন করা হয়েছিল সাতটি বাঁধ। সেগুলি এখন সংস্কারের অভাবে মজে গিয়ে প্রায় পুকুরে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিক দিক থেকে এ গুলির মধ্যে লালবাঁধ গুরুত্বপূর্ণ। রাজা রঘুনাথ সিংহ তার প্রেমিকা রাজনর্তকী লালবাঈকে নিয়ে এখানে নৌকোবিহার করতেন। মহারানি চন্দ্রপ্রভা এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি, তাঁর নির্দেশে ওই বাঁধেই ডুবিয়ে মারা হয়েছিল প্রেমিক যুগলকে। রমাপদ চৌধুরির উপন্যাসে, সিনেমায়, যাত্রায়, নাটকে সে কাহিনী উজ্জ্বল হয়ে আছে। ১৯৬৮ সালের গেজেটিয়ার অনুযায়ী এই বাঁধের আয়তন ছিল ৩০ হেক্টর। মজে গিয়ে সেই বাঁধ এখন ১০০ বিঘায় এসে ঠেকেছে। বাসিন্দাদের মতে, শুধু ঐতিহাসিক কারণে নয়, এলাকায় জল সঙ্কট ও পরিবেশ রক্ষায় এই বাঁধগুলির যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। মন্দিরগুলির মতো এই জলাশয়গুলিও সরকারি ঔদাসীন্যে ধংস হচ্ছে।

বিশিষ্টদের মতে...

সবিস্তার জানতে ক্লিক করুন।

মন্দির দেখতে বেড়িয়ে এখানকার রাস্তার বেহাল অবস্থার জন্য পর্যটকদের কম ভুগতে হয় না। মন্দির দেখতে যাওয়ার অধিকাংশ রাস্তা এখনও কাঁচা। শহরের ভিতরে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের সংরক্ষিত মন্দির রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা, শ্যামরাই, দলমাদল কামান, পাথর দরজা থেকে লালগড় প্রকৃতি উদ্যান যাওয়ার রাস্তার হাল দেখে অনেক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুর্গাপুরের সগরভাঙা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলেন সব্যসাচী দাস। তিনি বলেন, “এই প্রাচীন শহরের টেরাকোটার কাজ জগৎ বিখ্যাত। কিন্তু এখানকার রাস্তাঘাট কেন কাঁচা রয়েছে? অন্য রাজ্য তো বটেই বিদেশ থেকেও পর্যটকেরা এখানে আসেন। সত্যি কথা বলতে গেলে এই অবস্থার জন্য আমাদেরও লজ্জা করে।” কলকাতার সল্টলেক থেকে সপরিবারে বিষ্ণুপুরে এসেছিলেন পবিত্র রায়। তিনি বলেন, “রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। রাতে আলোও কম। দেশজুড়ে নাম-ডাক মন্দিরনগরীর। কিন্তু এখানে দেখছি মন্দিরের কাছেই বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। কী করে হল? প্রশাসনের কর্তারা কী ঘুমিয়ে আছেন?”

একই প্রশ্ন শহরের বাসিন্দাদের মধ্যেও। তাঁদের প্রশ্ন, কিছুদিন কয়েকটি নির্মাণ ভাঙা হলেও সেই কাজ আর এগোয়নি কেন? তার উপরে মন্দির লাগোয়া কিছু এলাকায় বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য লালমাটির উঁচু ঢিবি মাটি মাফিয়ারা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তা নিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা ক্ষোভে ফুঁসছেন বাসিন্দারা।

বিষ্ণুপুরের অন্যতম ঐতিহ্য বিষ্ণুপুর ঘরানার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে তৈরি হয়েছিল বিষ্ণুপুর মিউজিক কলেজ। ভারতের ইতিহাসে এটিই অন্যতম প্রাচীন সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়। এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ গুণীজন। কলেজটি ঘিরে এক সময় সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে।

পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষত পর্যটনের মরসুমে হোটেল-লজগুলিতে ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা হয়। বিষ্ণুপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অসিত চন্দ্র বলেন, “সারা বছরে বিষ্ণুপুরে দেড় লক্ষের বেশি পর্যটক আসেন। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে এখানে ৮০০ জনের থাকার মতো হোটেল-লজ রয়েছে। ভরা মরসুমে অনেককেই জায়গা না দিতে পেরে ফিরিয়ে দিতে হয়।” তিনি জানান, বছরের বাকি সময়ে অবশ্য পর্যটকদের সংখ্যা কমে যায়। হোটেল ব্যবসায়ীদের মতে, বছরভর পর্যটকদের টানতে অন্যান্য রাজ্যে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত যে সব বিনোদনমূলক ব্যবস্থা প্রশাসন নেয়, এখানে সেই রকম ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আরও লোক আসবে। বছরের অন্য সময়েও ভিড় হবে। সেই উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে?

ছবি: শুভ্র মিত্র

Advertisement