×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

শিল্প গিয়েছে, আশা এখন পর্যটন ঘিরে

শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল
রঘুনাথপুর ১৪ অগস্ট ২০১৪ ০০:৫৬
পাহাড়ের ঢালে তৈরি হচ্ছে কটেজ।

পাহাড়ের ঢালে তৈরি হচ্ছে কটেজ।

হতে পারত অনেক কিছু। কিন্তু, হয়নি। শিল্পায়নের মতো পর্যটনেও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছুই হয়নি রঘুনাথপুরে।

অথচ, শহরের উপকন্ঠে নন্দুয়াড়ার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে জয়চণ্ডী পাহাড়। যা নিয়ে গর্ব তামাম রঘুনাথপুরবাসীর। সত্যজিৎ রায় যে এই পাহাড়কেই বেছে নিয়েছিলেন কালজয়ী ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’-র শ্যুটিং স্পট হিসাবে! ব্যস ওইটুকুই। জয়চণ্ডী পাহাড়কে আজও লোকে চেনে সেই ‘হীরক রাজার দেশে’-র নামেই।

অথচ, এই পাহাড়কে ঘিরে পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। রাজ্যের পর্যটনের মানচিত্রে পাকাপাকি স্থান করে ফেলতে পারত জয়চণ্ডী। দরকার ছিল শুধু সরকারি সদিচ্ছা। কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, বঞ্চিত হয় রয়েছে এই পাহাড়। পর্যটন কেন্দ্র গড়ার লক্ষ্যে ‘জয়চণ্ডী পাহাড় পর্যটন উৎসব’ শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। আশার কথা, কিছুটা হলেও জয়চণ্ডীকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ার প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে নতুন সরকারের জমানায়। কিন্তু, পরিকাঠামো গড়ে না ওঠায় পুরোদস্তুর পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠতে জয়চণ্ডীকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। উৎসব কমিটির সম্পাদক সুকুমার মণ্ডল বলেন, “টানা ছ’বছর ধরে পাহাড়ের কোলে উৎসব করছি আমরা। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন উদ্যোগী হয়ে পাহাড়ে পর্যটন কেন্দ্র গড়ার কাজ শুরু করেছে। কিন্তু, সবচেয়ে আগে পরিকাঠামো তৈরি করা দরকার।”

Advertisement

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, গ্রানাইট ও ব্যাসাল্ট পাথরের মিশ্রণে গড়ে ওঠা জয়চণ্ডী পাহাড়ের সৃষ্টি লাভা উদগীরণের কারণে। এলাকায় অবশ্য জনশ্রুতি, জয়চণ্ডী নিজেই মৃত আগ্নেয়গিরি। ভৌগলিক ব্যাখ্যা যাই হোক, রঘুনাথপুরবাসীর আক্ষেপ, “প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জয়চণ্ডী। তবু পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পুরোদস্তুর গড়ে ওঠেনি এই পাহাড়।” পাহাড় থেকে দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যেই জয়চণ্ডী রেল স্টেশন। কাছেই মহকুমা সদর রঘুনাথপুরের বাসস্ট্যান্ড। ফলে, যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক দিয়ে পুরুলিয়া জেলার অন্য অনেক এলাকার চেয়ে এগিয়ে জয়চণ্ডী। রঘুনাথপুর শহরের বাসিন্দা তারক প্রামাণিক, রঘুনাথ মাজিদের কথায়, “যে কোনও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার অন্যতম শর্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সে দিক দিয়ে দেখলে এখানে আসার জন্য ট্রেন ও বাস যোগাযোগ, দুই-ই রয়েছে। কিন্তু, সরকারের তেমন উদ্যোগ না থাকায় পর্যটন মানচিত্রে অবহেলিতই রয়ে গেছে এই পাহাড়।”



নির্মীয়মাণ যুব-আবাস।

সরকারি স্তরে অবহেলার অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ প্রশাসন। বিডিও (রঘুনাথপুর ১) সুনীতিকুমার গুছাইত জানান, জয়চণ্ডীতে পর্যটন কেন্দ্র গড়তে একগুচ্ছ প্রকল্প শুরু হয়েছে। পর্যটন দফতরের দেওয়া ৭৬ লক্ষ টাকায় মূল পাহাড়ের পাশের উঁচু টিলায় তৈরি করা হচ্ছে পাঁচটি কটেজ ও ডর্মিটরি। পাশেই পর্যটন দফতরের দেওয়া টাকায় পূর্ত দফতর নির্মাণ করছে মোটেল। এই প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ২ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। আবার মোটেল থেকে কিছুটা এগিয়ে পাহাড়ের অন্য দিকে হচ্ছে যুব আবাস। পূর্ত দফতরের রঘুনাথপুরের আধিকারিক অজয় ভট্টাচার্য বলেন, “চার তলা যুব আবাসের জন্য ৫ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য যুব কল্যাণ দফতর। মোটেলের সাথে যুব আবাসের নির্মাণ কাজও করছে পূর্ত দফতর। ইতিমধ্যেই একতলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর মার্চ মাসের মধ্যে মোটেল ও যুব আবাস শেষ করা যাবে।”

সব মিলিয়ে পর্যটন নিয়ে একটা সার্বিক উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে রঘুনাথপুরে। পাশাপাশি এটাও ঘটনা যে, কটেজ, মোটেল বা যুব-আবাস শুরু করার ক্ষেত্রে এখনও অন্তরায় রয়েছে বিস্তর। প্রশাসন সূত্রেই জানা যাচ্ছে, কটেজগুলিতে এখনও জলের সংস্থান হয়নি। আসেনি বিদ্যুৎ। জলের জন্য কয়েকটি গভীর টিউবওয়েল খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু, জলের স্তর মেলেনি। এই অবস্থায় জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরকে ইন্দো-জার্মান জল প্রকল্প থেকে এখানে জল দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু, প্রশাসনের একাংশই বলছে, স্থায়ী ভাবে জলের সংস্থান না হলে বাইরের প্রকল্প থেকে জল এনে আর যাই হোক, পর্যটন কেন্দ্র গড়া যায় না।

অন্য ধরনের সমস্যাও রয়েছে। পাহাড় এলাকায় ঘুরলেই চোখে পড়বে রাস্তা ঘাটের বেহাল ছবি। দেখা যাবে, পাহাড়ের একাংশ সবুজহীন রুক্ষ হয়ে পড়েছে। পর্যটন উৎসব কমিটির সম্পাদক সুকুমারবাবুর কথায়, “পর্যটন কেন্দ্র বলতে শুধু কটেজ, মোটেল বা আবাস তৈরি করাই নয়। দরকার পাহাড় ঘিরে রাস্তা, পানীয় জল, শৌচাগারের মতো পরিকাঠামো তৈরি করা, যাতে পর্যটকেরা এসে বা রাত কাটালে কোনও রকম অসুবিধায় না পড়েন। আশপাশের পরিবেশকেও আরও সুন্দর করে তুলতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই প্রশাসনের কাছে পাহাড় ঘিরে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরির দাবি জানিয়েছি।”

রঘুনাথপুরবাসীর খেদ, পাহাড়ে পাকা রাস্তা তৈরি হয়নি। নেই পানীয় জলের ব্যবস্থা বা পার্ক। শৌচাগারও নেই। সর্বোপরি রুক্ষ পাহাড়কে সবুজে মুড়ে ফেলতে বনসৃজনের কাজও অবহেলিত রয়ে গিয়েছে। শহরের এক হোটেল মালিকের প্রশ্ন, “জয়চণ্ডী ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়া হচ্ছে, এই মর্মে সরকারি স্তরে যতই প্রচার হোক না কেন, পরিকাঠামোর প্রাথমিক কাজ না হলে পর্যটকরা আসবেন কেন?”

রঘুনাথপুরে বর্তমানে শিল্পায়নের ছবিটা যথেষ্ট মলিন। অথচ, এই শিল্পায়নের সৌজন্যেই একদা স্থানীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। এখন শহরের মানুষের আশা, পর্যটনের হাত ধরে অর্থনীতি কিছুটা হলেও ঘুরবে। শহরের এক লজের মালিক সুব্রত ভকতের কথায়, “শহরের লজগুলি এখন ধুঁকছে। তার হাল ফেরাতে ভরসা পর্যটন কেন্দ্রই।” বিভিন্ন লজ ও হোটেল মালিকদের সঙ্গে কথা বলেই জানা যাচ্ছে, গত দুই-তিন বছর যাবত পর্যটনের মরসুমে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে রঘুনাথপুরে। তাই, জয়চণ্ডী-সহ আশপাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য বিভিন্ন প্যাকেজও শুরু করেছে লজগুলি। সুব্রতবাবু বলেন, “গাড়ি করে পর্যটকদের ঘুরিয়ে আনা, তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা সবটাই প্যাকেজের মাধ্যমে আমরা দিচ্ছি। কিন্তু সবচেয়ে আগে দরকার জয়চণ্ডীকে পুরোদস্তুর পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা। কারণ, পর্যটকরা রঘুনাথপুর আসছেন এই পাহাড়ের টানেই।”

শিল্পায়ন গিয়েছে। এখন পর্যটনের হাত ধরেই ভেসে থাকতে চায় রঘুনাথপুর।



ছবি: পৌলমী চক্রবর্তী

Advertisement