Advertisement
২৮ নভেম্বর ২০২২

বলি নেই, প্রথা মেনে খাঁড়াপুজো আলিগ্রামে

বহু দিন আগে পারিবারিক বিপর্যয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে পুজোর বলি। কিন্তু নিষ্ঠাভরে সাত পুরুষের বলির খাঁড়া আজও পূজিত হয় নানুরের আলিগ্রামের রায় পরিবারে। তবে প্রথা অনুসারে পশু বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, দুর্গার কাছে অস্ত্র সমর্পণের ভাবনা থেকেই এই রীতি। রায় পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসেই রয়েছে সেই তথ্য।

ঘষামাজা। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি

ঘষামাজা। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি

অর্ঘ্য ঘোষ
নানুর শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০০:১৫
Share: Save:

বহু দিন আগে পারিবারিক বিপর্যয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে পুজোর বলি। কিন্তু নিষ্ঠাভরে সাত পুরুষের বলির খাঁড়া আজও পূজিত হয় নানুরের আলিগ্রামের রায় পরিবারে। তবে প্রথা অনুসারে পশু বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, দুর্গার কাছে অস্ত্র সমর্পণের ভাবনা থেকেই এই রীতি। রায় পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসেই রয়েছে সেই তথ্য।

Advertisement

রায় পরিবারের পারিবারিক ইতিহাস বলে, প্রায় পাঁচ শতাধিক বছর আগে পুজোর প্রচলন করেছিলেন যাদবেন্দ্র রায়। সে সময় মূর্তি গড়ে, ৪ দিন পশু বলি-সহ মহা ধূমধাম করে পুজো হত। কিন্তু একবার পুজোর আগে বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারে। পুজো বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দেয়। ঘটনা হল, পরিবারের এক মহিলার সম্মানহানি ঘটায় স্থানীয় এক দুষ্কৃতী। সেই ক্ষোভে মণ্ডপ থেকে বলির খাঁড়া নিয়ে ওই দুষ্কৃতীর গলা দু’ ফাঁক করে দেন গোতিনাথ রায় নামে পরিবারেরই যুবক। রায় পরিবার তাঁকে তুলে দেয় পুলিশের হাতে। শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া।

আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রায় পরিবারের মাথার উপর। মণ্ডপে তখন তৈরি হয়ে গিয়েছে প্রতিমা। ঢাকিরাও ঢাকে কাঠি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু পরিবারের একজন জেলে থাকায় পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কর্তারা। পুজোর জন্য খরচ সহ প্রতিমা তুলে দেওয়া হয় গ্রামেরই পুজারীর হাতে। কিন্তু ষষ্ঠীর দিন উভয় সঙ্কটে পড়তে হয় রায় পরিবারকে। ওইদিন প্রমাণ অভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে বাড়ি ফেরেন গোতিনাথ। তিনি প্রবীণদের বলেন, “মা দুর্গা স্বপ্নাদেশে তাঁকে বলেছেন, যা মাতৃজাতির সম্মান রাখতে অপরাধ করেছিস বলে এবারের মতো তোকে মাফ করে দিলাম। কিন্তু এবার থেকে ওই খাঁড়ায় আর যেন কোনও রক্ত না লাগে।’”

এ দিকে ঘোর দুঃচিন্তায় পড়তে হয় রায় পরিবারের সদস্যদের। ততক্ষণে পুজারীর বাড়িতে পৌঁচ্ছে গিয়েছে প্রতিমা। সেখানেও তখন পুজোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্বে। তাই প্রতিমা ফিরিয়ে আনাটা খারাপ দেখায়। অগত্যা ডাকা হয় কুলপুরোহিত তথা পুজারীকে। তিনি এসে জানান, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে আর প্রতিমা গড়ে পুজো সম্ভব নয়। একমাত্র পটের প্রতিমা গড়ে পুজো করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনিই পটের প্রতিমা গড়ে দিতে পারেন।

Advertisement

মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী বলির খাঁড়াটিকেও অস্ত্র সমর্পনের প্রতীক হিসাবে পুজোরও নিদান দেন তিনি। পরিস্থিতিতে পড়ে কুলোপুরিহিতের প্রস্তাব মেনে নেন রায় পরিবারের কর্তারা। সেই থেকে আজও পুরুষানুক্রমে কুলোপুরিহিত পাঠক পরিবার পুজোর পাশাপাশি পটের প্রতিমা গড়ে চলেছেন।

একই সঙ্গে রায় পরিবারের থেকে পাওয়া পুজোটিও তাঁরা চালাচ্ছেন। ওই পরিবারের পক্ষে প্রভাস পাঠক বলেন, “বাপ-ঠাকুরদার কাছে শুনেছি সমর্পণের প্রতীক বলির খাঁড়া পুজিত হয়। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী আজও আমরা নিজ হাতে রায় বাড়ির পটের প্রতিমা এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া পুজোর মুর্তি গড়ে চলেছি।

মূর্তি পুজো বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে বলিও। বিগতদিনের সেই রমরমাও নেই। কিন্তু পুজো ঘিরে আজও উন্মাদনার শেষ নেই রায় পরিবারে। কর্মসূত্রে অধিকাংশই ছড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। পুজো উপলক্ষ্যে গ্রামের বাড়িতে হাজির হন সবাই। কলকাতা থেকে আসেন প্রাক্তন পুলিশকর্তা রামকৃষ্ণ রায়, হাওড়া থেকে আসেন রেলকর্মী বৈদ্যনাথ রায় এবং তাঁর স্ত্রী ব্রততী দেবী। চঁচুড়া থেকে আসেন কলেজ শিক্ষক বিজয়কৃষ্ণ রায়। তাঁদের আসার অপেক্ষায় বছরভর দিন গোনেন প্রদ্যুত, উষা, ইতি, স্মৃতিকণা রায়রা। তাঁরা বলেন, “জানি আমাদের পুজোর সেই আড়ম্বর নেই। কিন্তু পুজোর ক’টা দিন সকলে একাত্ম হয়ে যাই। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া হয়। সারা বছরের জমিয়ে রাখা গল্প করি।”

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.