×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

৩১ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

রঘুনাথপুরে সিমেন্ট কারখানা

পরিবেশ শুনানিতে চাকরির দাবিই শুনলেন কর্তারা

শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল
রঘুনাথপুর ২৯ অগস্ট ২০১৪ ০০:৪৯
পঞ্চায়েত অফিসে চলছে শুনানি। বৃহস্পতিবার।  —নিজস্ব চিত্র

পঞ্চায়েত অফিসে চলছে শুনানি। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র

রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর সিমেন্ট কারখানা গড়ার জন্য ছিল পরিবেশ সংক্রান্ত জনশুনানি। কিন্তু, সেই শুনানিতেও কর্মসংস্থানের দাবি তুললেন স্থানীয় জমির মালিকেরা। এখনও পুরো জমি অধিগ্রহণ হয়নি অভিযোগ তুলে এলাকাবাসীর একাংশ দাবি করলেন, সম্পূর্ণ জমি অধিগ্রহণ না করে কারখানা গড়া চলবে না। প্রশাসনের পাল্টা দাবি, এই সিমেন্ট কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে জমি সংক্রান্ত জটিলতা নেই।

রঘুনাথপুর ১ ব্লকের নতুনডি পঞ্চায়েতের দুরমুট মৌজায় সিমেন্ট কারখানা গড়ছে রিলায়্যান্স সিমেন্ট কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। বৃহস্পতিবার দুপুরে নতুনডি পঞ্চায়েত অফিসে সেই কারখানা গড়ার জন্যই প্রথম পরিবেশ সংক্রান্ত জনশুনানি ছিল। সব মিলিয়ে অবশ্য এই কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে কোনও বড় মাপের সমস্যার বিষয় উঠে আসেনি এ দিন। রঘুনাথপুরের তৃণমূল বিধায়ক পূর্নচন্দ্র বাউরি বলেন, “জনশুনানিতে সর্বস্তরের বাসিন্দারা রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর কারখানা গড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। আমরা সংস্থার কর্মকর্তাদের বলেছি, দ্রুত কারখানা গড়ার কাজ শুরু করুন। রাজ্য সরকারের তরফে সমস্ত সাহায্য আপনাদের করা হবে।”

বস্তুত, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা হবে এ রাজ্যের অন্যতম বড় সিমেন্ট কারখানা। ১০০ একর জমিতে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই কারখানা গড়ার কথা রিলায়্যান্সের। সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই তারা রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমকে জমির দাম বাবদ ১৫.৮ কোটি টাকা দিয়েছে। কারখানা গড়ার জন্য পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র পেতে পরিবেশ সংক্রান্ত জনশুনানি হয়েছে। সংস্থাটির কর্তারা ছাড়াও ছিলেন পুরুলিয়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) প্রবালকান্তি মাইতি ও স্থানীয় বিধায়ক। কিছু সময়ের জন্য ছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো।

Advertisement

এ দিন সংস্থার তরফে কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত কী কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়। শুনানিতে এলাকার মানুষ অভিযোগ করেন, এখানে জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তাই কারখানার জন্য জলের সংস্থান বাইরে থেকে করতে হবে সংস্থাকে। যা শুনে রিলায়্যান্সের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সঞ্জয় কুমার বলেন, “সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারখানা গড়া হচ্ছে। ফলে উৎপাদনে জলের চাহিদা কম থাকবে। ওই জল আমরা নেব বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে। তবে প্রাকৃতিক সমস্যায় বৃষ্টির জল কম পাওয়া গেলেই বিকল্প হিসাবে গভীর টিউবয়েল থেকে জল নেওয়া হবে।” সংস্থাটির দাবি, ইতিমধ্যেই খড়গপুর আইআইটি-র বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এলাকায় সমীক্ষা করানো হয়েছে। তাঁরা রিপোর্ট দিয়েছেন, এই এলাকায় বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করলে বছরে ৩ লক্ষ ৯০ হাজার কিউবিক মিটার জল পাওয়া সম্ভব।

অতিরিক্ত জেলাশাসক সংস্থার কাছে এলাকায় উন্নত মানের স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। যাতে সংস্থার কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও ভাল স্বাস্থ্য পরিষেবা পান। প্রশাসনের প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করার আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থার কর্তারা।

পরে নিজেদের মতামত জানানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দারা কারখানা তৈরি হওয়ার পরে তাঁদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি কী হবে, তার নির্দিষ্ট উত্তর চান। ঘটনা হল রিলায়্যান্স যে এলাকায় কারখানা গড়ছে, তার পাশেই রয়েছে জয় বালাজির এক সময়ের প্রস্তাবিত ইস্পাত প্রকল্পের (যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি) জন্য অধিগৃহীত জমি। অন্য দিকে, ডিভিসি-র নির্মীয়মাণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এ দিনের শুনানিতে অংশ নেওয়া লোকজন আগে ওই দু’টি সংস্থারই এই ধরনের শুনানিতেও ছিলেন। তাই এ দিন অনেকেই প্রথমে কর্মসংস্থানের বিষয়ে রিলায়্যান্সের স্পষ্ট অবস্থান জেনে নিতে চেয়েছিলেন।

নতুনডির বাসিন্দা অশোক পরামানিক বলেন, “আমাদের দাবি, কারখানা গড়া হলে জমিহারা পরিবারগুলি থেকে ন্যূনতম এক জনকে স্থায়ী চাকরি দিতে হবে। এ ছাড়া, কারখানা গড়ার সময়ে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও জমিহারাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।” এখনও জমিহারা হিসাবে শংসাপত্র না পাওয়ার অভিযোগও শুনানিতে তুলেছেন স্থানীয় জমিহারাদের একাংশ। তখন বাধ্য হয়ে প্রশাসনের কর্তাদের বলতে হয়েছে, এই ধরনের দাবি বা অভিযোগ তোলার মঞ্চ এটা নয়। তবে, প্রশ্নকর্তাদের উদ্দেশে সঞ্জয় কুমার বলেন, “শিল্পোন্নয়ন নিগমের স্থির করে দেওয়া পুনর্বাসন নীতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান করা হবে।”

পরিবেশ শুনানিত এ দিন জমি অধিগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জন্মেজয় মাজির অভিযোগ, যে জমিতে রিলায়্যান্স কারখানা গড়ছে, তার মধ্যে কিছু জমি এখনও অধিগ্রহণ করা হয়নি। দুরমুটের বাসিন্দা শ্রীলোক মাজির দাবি, “রিলায়্যান্সের প্রস্তাবিত কারখানার মধ্যেই প্রায় আড়াই একর জমি রয়েছে, যার অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি জমির মালিকেরা।” স্থানীয়রা দাবি করেন, জমি অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ করেই কারখানা গড়ার কাজ শুরু হোক। পুরুলিয়ার জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী বলেন, “রিলায়্যান্সের কারখানার জন্য জমি সংক্রান্ত কোনও জটিলতা নেই। যে পরিমাণ জমির কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, সেই জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।” জমির মালিকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হবে বলে তাঁর আশ্বাস।

Advertisement