Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

প্রশ্ন উঠছে সোনামুখীতে

ভোটার তৃণমূলেরই, তা হলে ছাপ্পা কেন

দেবব্রত দাস
সোনামুখী ০৯ মে ২০১৪ ০০:৪১
সোনামুখীর থানাগড়ায় দীপালি সাহার বাড়ি। বৃহস্পতিবারের নিজস্ব চিত্র।

সোনামুখীর থানাগড়ায় দীপালি সাহার বাড়ি। বৃহস্পতিবারের নিজস্ব চিত্র।

পঞ্চায়েত হাতছাড়া হয়েছিল গত বছর। সোনামুখীর সেই ডিহিপাড়া পঞ্চায়েতের সাহাপুর বুথে তৃণমূল বিধায়কের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে ছাপ্পা ভোট করানোর অভিযোগ ওঠার পরে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জেলার রাজনৈতিক মহলে। অভিযোগ ওঠার পরে মূল অভিযুক্ত সোনামুখীর বিধায়ক দীপালি সাহা অন্তরালে চলে যাওয়ায় এবং এ নিয়ে দলের জেলা নেতারা পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা না দিতে পারায় প্রশ্নগুলো আরও বেশি করে উঠেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনার পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বিশেষত সিপিএমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনে।

সোনামুখী ব্লকের ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৭টিতে ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল। বাকি তিনটি পঞ্চায়েত সিপিএমের দখলে। তার মধ্যে একটি হল বর্ধমান জেলার সীমানা লাগোয়া দামোদর নদ তীরবর্তী এই ডিহিপাড়া পঞ্চায়েত। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ডিহিপাড়া পঞ্চায়েত তৃণমূল দখল করলেও পাঁচ বছর পরে তা হাতছাড়া হওয়ায় দলের অভ্যন্তরেও প্রশ্ন উঠেছিল। ওই পঞ্চায়েতের ১১টি আসনের মধ্যে ৯টি আসনে জেতে সিপিএম প্রার্থীরা, বাকি ২টি আসনে তৃণমূলের প্রার্থীরা জেতেন। ফলে ওই পঞ্চায়েত এলাকা নিজেদের দখলে আনার জন্য তৃণমূলের এ বার মরিয়া হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের মনেই প্রশ্ন, ডিহিপাড়া পঞ্চায়েত হাতছাড়া হলেও সাহাপুর গ্রাম সংসদে গত বছরে তৃণমূলের প্রার্থীই জয়ী হয়েছিলেন। তা হলে ওই বুথে তৃণমূল কেন হামলা করবে?

দীপালিদেবীর ঘনিষ্ঠ সোনামুখীর এক তৃণমূল নেতাও বলেন, “ওই বুথে অনায়াসেই আমরা জিততাম। কেন ওখানে গণ্ডগোল পাকাতে যাবেন দীপালিদি?” কিন্তু ওই বুথের ভোটকর্মীদের স্পষ্ট বক্তব্য, দীপালিদেবী জেলার বহু পরিচিত তৃণমূল নেত্রী। তাঁরা আগে থাকতেই চিনতেন। এ ছাড়া বুথে থাকা পুলিশকর্মীরা এবং আশপাশের কিছু বাসিন্দারাও দীপালিদেবীকে চিনতে পেরেছিলেন। দীপালিদেবী নেতৃত্বেই ওই বুথে হামলা চলেছে বলে তাঁরা নিশ্চিত। তৃণমূলের বাঁকুড়া জ়েলা সভাপতি অরূপ খাঁ বলেন, “ঘটনাটি শুনেছি। দলের তরফে ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব দেখার পরেই এ নিয়ে বলা যাবে।”

Advertisement

সিপিএমের দাবি, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসে সাহাপুর বুথে দু’দলের ক্ষমতা প্রায় সমান-সমান। বিকেল ৪ টে ২০-র মধ্যে ওই বুথের ৯৮০ জন ভোটারের মধ্যে ৮৩৭ জনের ভোট পড়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে অধিকাংশ সিপিএম প্রার্খীর পক্ষে গিয়েছে বলে অনুমান করেই তৃণমূল বিধায়ক দলবল নিয়ে ওই বুথের ছাপ্পা মারতে গিয়েছিলেন। সিপিএমের সোনামুখী জোনাল কমিটির সম্পাদক শেখর ভট্টাচার্যের যুক্তি, “ওই পঞ্চায়েত থেকে এ বারও আমাদের দলের প্রার্থী সুস্মিতা বাউরি লিড পাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সাহাপুর বুথে দু’দলের শক্তি সমান সমান। ওই বুথ থেকে তৃণমূল প্রার্থী সৌমিত্র খাঁ-কে বেশি ভোটে লিড পাইয়ে দেওয়ার জন্যই দীপালি সাহা দলবল নিয়ে গিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের উপরে চড়াও হয়ে ছাপ্পা ভোট দিয়েছেন।”

কিন্তু তাতেও প্রশ্ন শেষ হয় না। হামলাকারীরা যখন বুথে ঢোকেন, তখনও ওই বুথে ১৪৩ জনের ভোট বাকি ছিল। প্রিসাইডিং অফিসারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা প্রায় ৪০ মিনিট ওই বুথে ছিলেন। অত সময় পেয়েও তাহলে তাঁরা কেন মোটে প্রায় ৬৩টি ভোট দিলেন (বাকি থাকা ভোটের মাত্র অর্ধেক)? তৃণমূলেরই একাংশের অনুমান, হইচই পাকিয়ে ওই বুথের ভোট বাতিল করে দেওয়ার মতলবে হামলা হয়ে থাকতে পারে। কারণ হিসেবে তাঁরা দু’টি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

প্রথমত, তৃণমূলে গোষ্ঠীদ্বন্ধের অভাব নেই। বিশেষত এই জেলার যে ক’টি এলাকায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দলের জেলা শীর্ষ নেতাদের স্থায়ী ভাবে মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে সোনামুখী অন্যতম। ফলে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রটি যখন তৃণমূল নেতারা নিশ্চিত জয়ের তালিকায় রেখে দিয়েছেন, সেখানে ছাপ্পা ভোট করাতে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তাই এই হামলার পিছনে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণ উড়িয়ে দিচ্ছেন না দলের কেউ কেউ। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক কালে দলের কিছু বড় ও মেজো নেতা-বিধায়করা কমিশনের বিধি ভেঙে সংবাদের শিরোনামে এসেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পাশে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেও দাঁড়াতে দেখা গিয়েছে। সেই ভাবে দলে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য বিধায়ক ওই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলেও মনে করা হচ্ছে। তবে দীপালিদেবী ওই ঘটনায় যুক্ত বলে মানতে নারাজ অনেকে। তাঁদের মতোই দীপালিদেবীর ঘনিষ্ঠ তৃণমূল ব্রজ অধিকারী অবশ্য ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক চক্রান্ত দেখছেন। তাঁর দাবি, “সাহাপুরের ওই বুথে আমাদের ভোটারের সংখ্যাই বেশি। এ ক্ষেত্রে দীপালিদেবী বুথে গিয়ে ছাপ্পা দিয়েছেন শুনে বাচ্চা ছেলেরাও হাসছে।”

অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় বাহিনী দেখতে না পাওয়া থেকে কমিশনের নানা ভূমিকা নিয়ে যে সিপিএম রাজ্যে তৃতীয় দফার নির্বাচন থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ তুলেছে, সেই দলও কেন সোনামুখীর ঘটনা নিয়ে নিশ্চুপ তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক অমিয় পাত্র শুধু বলেছেন, “আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামব।” তৃণমূলের স্থানীয় কিছু কর্মী মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সোনামুখী পুরসভায় একজন বেশি কাউন্সিলর পেয়ে দখলে রেখেছে বামফ্রন্ট (মোট ১৫টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্টের সমর্থনে ৮ জন ও তৃণমূলের ৭ জন কাউন্সিলর রয়েছেন)। দীপালিদেবী সোনামুখী পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ২০১২ সালে বাঁকুড়া শহরের এক তৃণমূল নেতার মেয়ে তথা সিপিএমের কাউন্সিলরকে নিজেদের দিকে টেনে নিয়ে সিপিএম পুরপ্রধান কুশল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন পুরসভার বিরোধী দলনেতা সুরজিৎ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু আস্থা ভোটে তৃণমূলের তরফে একজন পুরপ্রধানের পক্ষে ভোট দেওয়ায় কুশলবাবুর চেয়ার টলানো যায়নি। পুরপ্রধান হওয়ার স্বপ্নও পূরণ হয়নি সুরজিৎবাবুর। তবে দলের মধ্যে ওই অন্তর্ঘাত ঘটানোর জন্য সুরজিৎবাবুর ঘনিষ্ঠেরা দীপালিদেবীকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন। সেই থেকে ওই দু’জনের দ্বন্দ্ব বাড়তে শুরু করে।

আর ওই ঘটনার পর থেকে দীপালিদেবীর সঙ্গে সিপিএমের ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে বলে তৃণমূলের একাংশের দাবি। তাঁদের মতে, সাহাপুরের বুথে হামলা চালিয়ে আখেরে দলেরই ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছেন। বিশেষ করে ওই বুথের অধিকাংশ ভোটার যেখানে তৃণমূলেরই সমর্থক! গত পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূল যে গ্রাম সংসদে জিতেছে, সেখানে শাসক দলেরই বিধায়ক কেন শক্তিপ্রদর্শন করে ছাপ্পা ভোট করাতে যাবেন, তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না তৃণমূলের ওই অংশ। আর এখানেই তৈরি হয়েছে যাবতীয় রহস্য ও ধোঁয়াশা। বিষ্ণুপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সৌমিত্র খাঁ অবশ্য দাবি করেছেন, “দীপালিদি-কে ফাঁসানো হয়েছে। ওই বুথে আমাদের লিড হত। সিপিএম-ই ওই কাজ করেছে।” সুরজিৎবাবুও বলছেন, “ভোটকর্মীরা দীপালিদিকে চিহ্নিত করছে কী ভাবে? পুরোটাই রহস্যজনক মনে হচ্ছে।”

আরও পড়ুন

Advertisement