Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

তোলাবাজি নিয়ে লড়াই, ক্ষোভ নিচুতলায়

একটা সময় লড়াই ছিল সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের। এখন সিপিএম নেই। লড়াই তাই শাসক দল তৃণমূলের ভিতরেই! যখন-তখন বোমাবাজি, মারপিট। সঙ্গে এক গোষ্ঠীর পার্

দেবব্রত দাস
পাত্রসায়র ২১ অগস্ট ২০১৪ ০০:২৭
Save
Something isn't right! Please refresh.
দ্বন্দ্বের জের। ধগড়িয়া গ্রামে হামলা দলেরই পার্টি অফিসে।—ফাইল চিত্র।

দ্বন্দ্বের জের। ধগড়িয়া গ্রামে হামলা দলেরই পার্টি অফিসে।—ফাইল চিত্র।

Popup Close

শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অশান্তির ছায়া এ বার পড়তে শুরু করেছে এলাকার উন্নয়নের কাজেও। উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে তৃণমূলের অন্দরেও।

সম্প্রতি পাত্রসায়র পঞ্চায়েত সমিতির বেশ কিছু প্রকল্পের টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। অভিযোগ, তৃণমূলের এক গোষ্ঠীর বাধায় ঠিকাদারদের একাংশ টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। সরকারি নিয়ম মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক ঠিকাদার টেন্ডারে অংশ না নেওয়ায় তা বাতিল হয়ে গিয়েছে। পাত্রসায়র পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তৃণমূলের দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “পাঁচটি প্রকল্পের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সাব মার্সিবল পাম্প, গীতাঞ্জলি প্রকল্পের বাড়ি এবং ১০০ দিন প্রকল্পে একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য ডাকা তিনটি টেন্ডার বাতিল হয়ে গিয়েছে ঠিকাদারেরা অংশ না নেওয়ায়। ওই তিনটি প্রকল্পে ফের টেন্ডার ডাকা হচ্ছে। কী কারণে ঠিকাদাররা প্রকল্পগুলিতে অংশ নিলেন না তা বোধগম্য হচ্ছে না।” তিনি জানান, এর ফলে এলাকার উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

সভাপতি প্রকাশ্যে না বললেও স্থানীয় কিছু ঠিকাদার দাবি করেছেন, তৃণমূলের এক গোষ্ঠী তাঁদের পেটোয়া ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে ব্লক অফিসের সামনে জমায়েত করে অন্য ঠিকাদারদের বাধা দেন। টেন্ডারের আবেদনপত্র কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও অনেক ঠিকাদার আর টেন্ডারের আবেদনপত্র তুলতে যাননি। প্রাণভয়ে কোনও ঠিকাদার কারও কাছে অভিযোগও জানাননি।

Advertisement

বাঁকুড়া জেলার প্রতিটি ব্লকেই তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে পাত্রসায়রে তৃণমূলের গোষ্ঠীবিরোধ এখন মাত্রাছাড়া আকার ধারণ করেছে। তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে কেন এই বিরোধ? পাত্রসায়রে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে নানা কথা। তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে উঠছে একাধিক নানা অভিযোগ। দলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়, ব্লকের এক শীর্ষ নেতা এলাকার উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ অর্থের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় কাজকর্ম নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যেমন, তিনি কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কর্মীদের এড়িয়ে চলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অন্য দিকে, ব্লকের এক দাপুটে নেতা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সিপিএম নেতা কর্মীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা এবং তোলাবাজির অভিযোগ উঠছে। ব্লকের আর এক নেতার বিরুদ্ধে জমির দালালি, বালি ও বোল্ডার মাফিয়াদের সঙ্গে রমরমিয়ে ব্যবসা করা, বেআইনি বালি তোলার অভিযোগ উঠেছে। বোল্ডার গাড়ি আটক করলেই ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি বালির ট্রাক্টর আটকানোর ঘটনায় পাত্রসায়র বাসস্ট্যান্ডে ওই নেতাকে দলবল নিয়ে গলাবাজি করতেও দেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নেতাদের ব্যক্তিগত ‘ইগো’র লড়াই। দলের নিচুতলার কর্মীদের একাংশের মতে, ব্লকের স্থানীয় নেতারা জেলা বা রাজ্যস্তরের কোনও না কোনও নেতার ঘনিষ্ঠ। আর সেই আনুগত্যকে ভাঙিয়েই এলাকায় তাঁরা দিনের পর দিন এ সব চালিয়ে যেতে পারছেন। পাত্রসায়রের একাধিক সাধারণ তৃণমূল কর্মীর আক্ষেপ, “সিপিএমের সঙ্গে এতদিন লড়াই করে এই জায়গায় দলকে পৌঁছতে সাহায্য করলাম। কিন্তু, কিছু নেতা মিলে যা শুরু করেছেন, তাতে আখেরে দলের গায়েই কালি লাগছে!”এলাকার মানুষও এখন তৃণমূলের রোজকার দ্বন্দ্বে তিতিবিরক্ত। ক্ষুব্ধ তোলাবাজি নিয়ে। কিন্তু, ভয়ে কেউ শাসকদলের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না।

স্থানীয় সূত্রের খবর, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে পর্যন্ত স্নেহেশবাবুর সঙ্গেই ছিলেন নব পাল, গোপে দত্তরা। পঞ্চায়েত সমিতির আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছিলেন ওই দুই নেতা। কিন্তু স্নেহেশবাবু তাঁদের দু’জনকেই টিকিট দেননি। ফলে বাধ্য হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন নববাবু ও গোপে। অন্য দিকে, পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা রফা করে টিকিট বন্টন করেন স্নেহেশবাবু এবং বাবলু সিংহ। এর পরেই বিরোধ ক্রমশ বাড়তে শুরু করে স্নেহেশবাবুর নিজের শিবিরে। এক সময় নব পাল, গোপে দত্তর সঙ্গে বাবলু সিংহের সর্ম্পক ছিল অহিনকুল। পঞ্চায়েত ভোটের পরে অবশ্য তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। স্নেহেশবাবুর বিরোধিতায় তৃণমূলের ‘তিন মূর্তি’ নব পাল, গোপে দত্ত, বাবলু সিংহ এক হয়ে যান। গত লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই পাত্রসায়রে স্নেহেশবাবুর বিরোধী গোষ্ঠী ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তার জেরেই সংঘাত বেড়েছে।

কিন্তু এই অশান্তি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি দলের উচ্চ নেতৃত্বের ভূমিকাতে ক্ষুব্ধ নিচুতলার কর্মীরা। তাঁদের অনুযোগ, এক এক গোষ্ঠীর নেতা তাঁর খাপের জেলা নেতাকে ধরে রেখেছেন। রাজনীতির স্বার্থে ওই নেতা তাঁর অনুগত নেতার গোষ্ঠীকে তোল্লা দিচ্ছেন। ফলে বিরোধ আর মিটছে না। পুলিশও হাত গুঁটিয়ে থাকছে। যদিও জেলা পুলিশের এক কর্তার দাবি, “সব অভিযোগেরই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অশান্তি আটকাতে পাত্রসায়রে টহলও বাড়ানো হয়েছে।”

তাতে অবশ্য তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ কমছে না। দলের এক ব্লক নেতার আক্ষেপ, “উচ্চনেতৃত্ব বিরোধ মেটাতে উদাসীন। তারই মাসুল গুনতে হচ্ছে এলাকার মানুষকে। এখন তৃণমূলের রাজত্বে আমরা তৃণমূলের কর্মীরাই আতঙ্কে রয়েছি। আর বিরোধী সিপিএমের লোকেরা বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সিপিএমের লোকদের সঙ্গে নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে খানাপিনা করছেন আমাদের দলেরই একাধিক নেতা। আর দলের কর্মীকে কার্যালয়ে ঢুকিয়ে মারছে দলেরই নেতারা! পুলিশও পাছে নেতাদের কোপে পড়েন, এই ভয়ে হাত গুটিয়ে দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে।” জেলা তৃণমূলের এক নেতার আক্ষেপ, “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে দলের নেতা কর্মীদের ‘তোলা’ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আর পাত্রসায়রে একাধিক নেতার বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ উঠছে। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারছে না। আসলে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাধার লোকের যে বড়ই অভাব।”

যদিও স্নেহেশবাবু, নববাবু, বাবলুবাবু ও তাঁদের অনুগামীরা তোলাবাজি বা দলের প্রভাব খাটিয়ে বেনিয়ম করার অভিযোগ মানতে চাননি। নব পাল বলেন, “সিপিএমের লোকেরা দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, জরিমানা করা-সহ নানা অপপ্রচার ধারাবাহিক ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কেউ ওসব করে না।” তবে তাঁর অনুগামীদের অভিযোগ, স্নেহেশবাবু ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে দলের জেলা নেতৃত্বের কাছে অভিযোগও করা হয়েছে। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ চোখ পড়েনি।

যদিও স্নেহেশবাবু ও তাঁর অনুগামীরা তা মানতে নারাজ। স্নেহেশবাবুর পাল্টা দাবি, “অন্যায় কাজকে আমি সমর্থন করি না, তা দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং এলাকার বাসিন্দারা ভাল করেই জানেন। দলের নাম ভাঙিয়ে কয়েকজন নেতা-কর্মীই বরং ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ করছে। উন্নয়নের কাজে তারা বাধা দিচ্ছে। সিপিএমের সঙ্গে তারা হাত মিলিয়ে প্রকৃত তৃণমূল কর্মীদের মারধর করে অশান্তি ছড়াচ্ছে।” তাঁর সংযোজন, দুর্দিনে পাত্রসায়রে দলের সকলেই তাঁর ছাতার তলায় ছিলেন। এটা ভুললে চলবে না।

তৃণমূলের বাঁকুড়া জেলা সভাপতি অরূপ খাঁ-ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা মানতে চাননি। অরূপবাবুর দাবি, “দলের স্থানীয় স্তরে কয়েকজনের মধ্যে হয়তো মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু তাকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বলা যায় না। সব মতবিরোধ মিটিয়ে দেওয়া হবে। তোলাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।” বাঁকুড়া জেলা সভাধিপতি অরূপ চক্রবর্তী অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, পাত্রসায়রের পরিস্থিতির উপর তাঁর নজর রয়েছে। তিনি বলেন, “দলের জেলা কমিটি গঠনের পরেই ব্লক কমিটি গঠন করা হবে। যাঁরা এখন দলবিরোধী কাজ করছেন, তাঁরাই ভুগবেন। দল ঠিক কড়া ব্যবস্থা নেবে।” গত কয়েক বছর ধরে এমনই আশ্বাস শুনে আসছেন পাত্রসায়রের বাসিন্দারা ও তৃণমূল কর্মীরা। তাঁদের প্রশ্ন, গোষ্ঠী কোন্দলে আদৌ রাশ টানা হবে তো?



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement