Advertisement
০৫ ডিসেম্বর ২০২২
বাংলায়, উত্তর-পূর্বে অবাধ গতি ইরফানের

করাচিতে বসে চর-চক্রী দাদা

ইরশাদ আনসারি, ছেলে আসফাক ও শ্যালক মহম্মদ জাহাঙ্গির গ্রেফতার হওয়ার পরে খিদিরপুরে পাকিস্তানি গুপ্তচর চক্রের সন্ধানে নেমে ইরফান আনসারি নামে আরও এক ব্যক্তির কথা জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। এই ইরফান হল ইরশাদের সেজ দাদা।

জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা শেষ আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:১১
Share: Save:

ইরশাদ আনসারি, ছেলে আসফাক ও শ্যালক মহম্মদ জাহাঙ্গির গ্রেফতার হওয়ার পরে খিদিরপুরে পাকিস্তানি গুপ্তচর চক্রের সন্ধানে নেমে ইরফান আনসারি নামে আরও এক ব্যক্তির কথা জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। এই ইরফান হল ইরশাদের সেজ দাদা। গোয়েন্দাদের দাবি, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে আইএসআইয়ের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়ার মূল হোতা সে-ই। ধৃতদের জেরা করে প্রাথমিক ভাবে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে গোয়েন্দারা মনে করছেন, খিদিরপুরে নিজের ভাইয়ের পরিবারকে আইএসআই চক্রে যুক্ত করার পাশাপাশি ইরফান গত এক দশক ধরে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্যে অবাধে যাতায়াত করে আসছে। আইএসআইয়ের বহু মডিউল কাজ করছে ওই সব এলাকায়। এবং সেগুলি গড়ে তোলা ও চালানোর পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ইরশাদের এই দাদার।

Advertisement

ইরফান আনসারি এখন কোথায়?

সম্ভবত পাকিস্তানে, বলছেন তদন্তকারীরা। তার আদি নিবাস এই কলকাতাই। বছর চল্লিশ আগে শহর ছেড়ে সে করাচি চলে যায়। সেখানে আর এক ভাইয়ের সঙ্গে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করে। স্বরাষ্ট্র দফতরের খবর, আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে ইরফানের হাতেখড়ি ২০০০ সালের গোড়ায়। এবং তার হাত ধরেই ভাই ইরশাদ, ভাইপো আসফাক এবং ইরশাদের শ্যালক জাহাঙ্গির পাক এজেন্ট হিসেবে কলকাতায় কাজ শুরু করে। রবিবার ধরা পড়ার পর এই তিন জন এখন কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের হেফাজতে।

স্বরাষ্ট্র দফতরের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘‘ধর্মীয় আবেগ এবং টাকার লোভে কী ভাবে একটি পরিবার গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে, ইরশাদ-আসফাকদের গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গেই সেই সত্য সামনে উঠে আসছে। পুলিশ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলি তাই যে কোনও মূল্যে এই চক্রের পাণ্ডা ইরফানকে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গোয়েন্দাদের খবর অনুযায়ী, ইরফান আনসারি করাচিতেই নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছে।’’

Advertisement

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, টানা জেরার মুখে ইরশাদ, আসফাক ও জাহাঙ্গির তাদের আইএসআই চর হিসেবে জড়িয়ে পড়ার কথা কবুল করেছে। এই তিন জন জানিয়েছে, তারা বছর দশেক ধরে যে কাজ করছে সেই তুলনায় টাকা-পয়সা পায়নি। আসফাক গোয়েন্দাদের বলেছে, ‘বড় আব্বুই আমাদের টাকার অনেকটা মেরে দিয়েছে। আমরা এখন জেল খাটছি আর সে করাচিতে আয়েস করছে।’ তদন্তকারীদের কিন্তু ধারণা, আইএসআইয়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের ভাগ হিসেবে অন্তত ১০ লক্ষ টাকা হাতে এসেছে ইরশাদদের।

তদন্তকারী অফিসারদের একাংশ জানাচ্ছেন, খিদিরপুরের ইরশাদরা পাঁচ ভাই। খুব ছোট বয়সেই তাদের বাবা মারা যান। পাঁচ ছেলেকে নিয়ে মা কোনও মতে সংসার চালাতেন। ১৯৭৬ সালে ইরশাদের মেজ দাদা ইকবাল পাকিস্তানের করাচি চলে যান। সঙ্গে যায় সেজ দাদা ইরফানও। ইকবালের সঙ্গে সে-ও ভারতীয় পাসপোর্ট নষ্ট করে পাক নাগরিক হয়ে যায়। করাচিতেই দাদার সঙ্গে মিলে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করে। ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় হওয়ায় সেখানেই একটি ‘গারমেন্ট ফ্যাক্টরি’ খুলেছেন মেজ দাদা ইকবাল। পুলিশের খবর, ইকবালের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে গণ্ডগোলের জেরে ইরফান পরে নিজেই ব্যবসা শুরু করে। তাতেও খুব একটা উন্নতি করতে পারেনি। ২০০০ সালে আইএসআইয়ের খপ্পরে পড়ে ইরফান। তার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকায়নি সে।

ইরশাদ-আসফাক জেরায় জানিয়েছে, বাড়ির সঙ্গে ইকবালের তেমন যোগাযোগ না থাকলেও ইরফানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয় ২০০৫ সাল নাগাদ। ইরফানের বাঙালি যোগাযোগের সুবাদে তাকেই পূর্ব ভারতে নেটওয়ার্ক ছড়ানোর দায়িত্ব দেয় পাক গুপ্তচর সংস্থা। দেশ ছাড়ার পর ২০০৫ সালে ফের ঢাকা হয়ে কলকাতা আসে ইরফান। তার পর গত দশ বছরে অন্তত ১২-১৩ বার কলকাতা এসে ভারতের নানা প্রান্তে গিয়েছে সে। খিদিরপুরেও কাটিয়েছে অনেকটা সময়।

গোয়েন্দারা জেনেছেন, ২০০৫ সালে কলকাতায় এসে ইরফান তার ভাই ইরশাদকে আইএসআইয়ের হয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। তার দু’বছর আগে গার্ডেনরিচ শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)-এ ঠিকা শ্রমিকের কাজে যোগ দিয়েছিল ইরশাদ। আইএসআইয়ের প্রশিক্ষণ পাওয়া ইরফানের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ভাইকে গুপ্তচরবৃত্তিতে নামাতে পারলে ভারতীয় নৌবাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি মিলতে পারে। ইরশাদকে বলা হয়, এই কাজের জন্য তাকে মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। খিদিরপুরে বাড়িও বানিয়ে দেবে ইরফান। ইরশাদ গোয়েন্দাদের বলেছে, ‘সে সময় দিনে ১১৯ টাকা মজুরিতে কাজ করছি। স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ের সংসারে বাড়তি ১০ হাজার টাকা এলে তো ভালই। তাই প্রস্তাবটা লুফে নিই।’

জেরায় ইরশাদ জানিয়েছে, ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৯৬ সালে মা মারা যান। অভাবের সংসারে ফের স্বচ্ছলতা ফেরাতে পাক এজেন্ট দাদার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় সে। ২০০৫ সাল থেকে তার গুপ্তচরবৃত্তির নতুন জীবন শুরু হয়। একের পর এক অতি গোপন নথি পাচার করতে থাকে সে। ২০০৮ সাল নাগাদ ইরশাদকে একটি ক্যামেরা-মোবাইল কিনে দেয় ইরফান। তার পর থেকে নথি পাচারের কাজ আরও সহজ হয়ে যায়। শুধু নথি পাচারই নয়, দাদার হুকুমে (মেরঠ থেকে গ্রেফতার হওয়া) কালামের দেখভালের ভারও নিজের কাঁধে নিয়েছিল ইরশাদ ও তার ছেলে।

বিনিময়ে তারা কী পেয়েছে?

আলাদা আলাদা জেরায় তদন্তকারীদের কাছে মহম্মদ জাহাঙ্গির দাবি করেছে, ইরফানের কাছ থেকে সে সাকুল্যে ১০ হাজার টাকা পেয়েছে। আসফাকের দাবি, তাদের পরিবার পেয়েছে মাত্র ৬০ হাজার টাকা। আর ইরশাদ জানিয়েছে, দাদার কাছ থেকে দশ বছরে তার হাতে এসেছে ৮০ হাজার টাকার মতো।

তদন্তকারীরা অবশ্য জেনেছেন, লেনদেন ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয়নি খুব একটা। নথি নিয়মিত পাঠানো হলেও ইরফান যখন কলকাতায় আসত, অথবা ইরশাদ, আসফাকদের মধ্যে কেউ ঢাকা গেলে তখন তাদের হাতে নগদে টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে। এবং ধৃতেরা অন্তত ১০ লক্ষ টাকা পেয়েছে আইএসআইয়ের কাছ থেকে।

যদিও ইরশাদদের দাবি, ইরফান যে টাকা দেবে বলেছিল, তা দেয়নি। জেরার মুখে আসফাক বলেছে, ‘বড় আব্বু আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বাড়ি বানিয়ে দেবে বলেছিল। দশ বছরে তার কিছুই হয়নি। এখন বড় আব্বু বলছে বোনের বিয়ের টাকা দেবে।’ ইরশাদ নিজেও জেরায় স্বীকার করেছে, যে টাকা তাদের প্রাপ্য ছিল, তার কণামাত্র পাওয়া যায়নি। ইরশাদের ধারণা, তথ্য দেওয়ার জন্য সেজ দাদা আইএসআই থেকে যে টাকা পেয়েছে তার বেশির ভাগটা সে নিজেই রেখে দিয়েছে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.