Advertisement
E-Paper

আর ‘ধাম’ নয় দিঘার জগন্নাথ মন্দির! ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর আর্জি নিয়ে এলেন পুরীর সাংসদ, রাজি শুভেন্দু, ইতি পড়ল বিতর্কে

ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির চিঠি নিয়ে দূত হয়ে এসেছেন বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র। তার পরেই মন্ত্রিসভার সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ১৭:০২
দিঘার মন্দির নিয়ে ঘোষণা শুভেন্দু অধিকারীর।

দিঘার মন্দির নিয়ে ঘোষণা শুভেন্দু অধিকারীর। — ফাইল চিত্র।

দিঘার জগন্নাথ মন্দির আর ‘ধাম’ নয়। মঙ্গলবার ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জানালেন, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির চিঠি নিয়ে দূত হয়ে এসেছেন পুরীর বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র। পড়শি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মেনে নিয়েছে তাঁর সরকার। এখন দিঘার মন্দির কমপ্লেক্সের নাম হবে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’।

শুভেন্দু বলেন, ‘‘ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী পুরীর সাংসদ সম্বিতকে পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সকলেই চান পুজোপাঠ হোক। কিন্তু ধাম শব্দ সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’’ তার পরেই শুভেন্দু বলেন, ‘‘বিতর্ক আগেই ছিল। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করে দিঘার ওই ক্যাম্পাস থেকে ধাম শব্দ সরিয়ে দিচ্ছি।’’ নতুন নাম কী হবে, তা-ও জানিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘পুরো কমপ্লেক্সের নাম হবে শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। যে হেতু তাতেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন রয়েছে, হিডকোর টেন্ডার রয়েছে, সরকারি অর্থ হয়েছে। যেখানে ঠাকুরের পুজোপাঠ হয়, সেই স্থাপত্য মন্দির নামেই পরিচিত হবে। শ্রী জগন্নাথ দেব মন্দির নামে পরিচিত হবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, দিঘার মন্দিরে পুজোপাঠ ভারতীয় সংস্কৃতি, শাস্ত্রে জগন্নাথ দেবের পুজোপাঠের নিয়ম মেনে হবে। মন্দিরের পুরো এলাকাতেই সাত্ত্বিক ভাবে পুজো হবে। প্রসাদ হবে। পরিচালন ট্রাস্ট কমিটির বিষয়েও জানিয়ে দেওয়া হবে। ওয়েবাসাইটেও দেওয়া হবে।

দিঘা জগন্নাথ মন্দিরের ট্রাস্টি ও প্রধান পুরোহিত রাধারমণ দাস বলেন, ‘‘আমরা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিক ভাবে স্বাগত জানাই। এই বিষয়টি নিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগত ভাবে আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এখন থেকে এই মন্দির ‘দিঘা জগন্নাথ মন্দির’ নামে পরিচিত হবে।”

দিন কয়েক আগে শুভেন্দু মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, সেখানে রাধারমণের সঙ্গে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের নাম পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের পুজোর দায়িত্বে রয়েছে ইস্কন। তার পরেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করে শুভেন্দু বলেন, ‘‘মন্দিরের নামে ধাম লেখা ঠিক হয়নি। কাগজপত্র দেখেছি, কালচারাল সেন্টার হিসাবে গড়েছিল। দ্রুত ধাম শব্দ অপসারণ করব। সনাতন সংস্কৃতিতে যে অপমান আগের সরকার করেছে, এই সরকার তা করবে না।’’

সম্বিত জানান, তিনি ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণের দূত হিসাবে শুভেন্দুর কাছে এসেছেন। তাঁর পাঠানো চিঠি তুলে দিয়েছেন। কেন ‘ধাম’ শব্দ নিয়ে তাঁদের আপত্তি, তা-ও জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলার তৎকালীন সরকার দিঘায় মন্দির উদ্বোধন করে। নাম দেয় জগন্নাথ ধাম। প্রভুর যত মন্দির হয়, ততই ভাল, হওয়াও উচিত। মন্দির তৈরিকে স্বাগত জানিয়েছি।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘সনাতনের পরম্পরা অনুসারে, চারটিই ধাম রয়েছে। তার মধ্যে একটি বিশেষ হল জগন্নাথ ধাম, যা রয়েছে ওড়িশায়, যেখানে নারায়ণের নিবাস রয়েছে। আদি শঙ্করাচার্য চারটি ধামের স্থাপন করেছিলেন। তাই ২০২৫ সালে যখন দিঘা হল (মন্দিরকে ধাম বলা হল), তাতে শুধু সাড়ে চার কোটি ওড়িয়া বন্ধু নন, বাংলায় যাঁরা জগন্নাথ দেবকে মানেন, তাঁদেরও কষ্ট হয়েছিল। শুভেন্দুদাও আক্রোশ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, সনাতনের সঙ্গে এ ভাবে খেলা যায় না।’’ এর পরেই শুভেন্দুকে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সম্বিত বলেন, ‘‘নতুন সরকার সনাতনকে সম্মান করে।’’

দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কেন ‘ধাম’ বলা হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অনেকেরই মতে, নানা অভিধান অনুসারে, ধামের অর্থ হল তীর্থস্থান বা আবাস। আবাস সাধারণ মানুষেরও হতে পারে। কিন্তু তীর্থস্থান হতে গেলে দেবতা বা মহাপুরুষের লীলা বা অধিষ্ঠানক্ষেত্র হতে হবে। ধাম কথার অর্থ তেজ, জ্যোতিও হয়। জয়তি কনকঃ ধামা কৃষ্ণ চৈতন্য নামে। অনেকের ব্যাখ্যা, তেজোদ্দীপ্ত কেউ জন্মগ্রহণ করলে কিংবা প্রতিষ্ঠা করলে সেটা ধাম হতে পারে। নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের জন্ম। তাই সেটি ধাম। ফলে এই সংজ্ঞায় দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে ধাম বলা যায় না। আবার পাল্টা অভিমতও রয়েছে। কারও কারও মতে, ধামন্ শব্দ থেকে ধাম শব্দটি এসেছে। তীর্থক্ষেত্র ছাড়াও ধাম গড়ে উঠতে পারে। যদি দিঘায় বিশেষ কিছু কর্ম হয়ে থাকে এবং অনেক মানুষের আগমন ঘটে, তা হলে জগন্নাথের মন্দিরকে ধাম বলতে আপত্তি নেই। তবে বিতর্ক থেকেই গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বার বার প্রশ্ন তুলেছিলেন রাজ্যের তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু।

ওই মন্দিরের দ্বারোদ্‌ঘাটনের দিন সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েত রাজেশ দয়িতাপতিকে। তাঁকে শো কজ় করেছে ওড়িশা সরকার। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতদের (দয়িতাপতি) মধ্যে কারা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং কোন কাঠ দিয়ে দিঘার মন্দিরের বিগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা জানতে ওড়িশা সরকার অভ্যন্তরীণ তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছিল। বিগ্রহে ব্যবহৃত কাঠ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। দিঘার মন্দির নিয়ে অভিযোগ, ২০১৫ সালে পুরীর মন্দিরের নবকলেবরে ব্যবহার করা ‘পবিত্র’ নিমকাঠের অবশিষ্টাংশ দিয়েই বানানো হয়েছে দিঘার জগন্নাথের বিগ্রহ। সেই নিয়ে পাল্টা কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘‘আমি দক্ষিণেশ্বরে স্কাইওয়াক করলে তা নিয়ে প্রশ্ন হয় না, কালীঘাট নিয়ে প্রশ্ন হয় না। আমি দুর্গাপুজো করি, কালীপুজো করি, প্রশ্ন হয় না। জগন্নাথধামটা গায়ে লেগেছে।’’ নিমকাঠ নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ওরা বলছে, আমি নাকি নিমগাছ চুরি করেছি। আমার বাড়িতেই তো চারটে নিমগাছ আছে! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত খারাপ সময় আসেনি যে নিমগাছ চুরি করতে হবে।’’

এ বার দিঘার সেই জগন্নাথ মন্দির থেকে সরে গেল ‘ধাম’ শব্দ। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মেনে জানিয়ে দিলেন শুভেন্দু।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy