লোকসভায় তৃণমূল হাতছাড়া হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অধিকাংশ দলীয় সাংসদই মমতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ অবস্থায় বিদ্রোহীদের নামে ‘কুৎসা’ করতে নামলেন মমতা-অনুগত সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহীদের বিঁধে তাঁর দাবি, “ওদের নেতা পাল্টে গিয়েছে। ওদের নেতার নাম নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু ডাইরেক্টলি বলতে পারছে না যে বিজেপি করি।” কল্যাণের আক্রমণের জবাব দিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম ‘মুখ’ কাকলি ঘোষ দস্তিদারও।
বিদ্রোহী শিবিরের কেউ যেন নিজেদের তৃণমূল সাংসদ বলে পরিচয় না-দেন, সেই ‘পরামর্শ’ও দেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। সোমবার লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন ধরেছে। ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা চাইছেন শাসকজোট এনডিএ-তে যোগ দিতে। এই বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন বারসতের সাংসদ কাকলি এবং বীরভূমের শতাব্দী রায়। অন্য দিকে যে আট জন এখনও মমতার অনুগত রয়ে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কল্যাণ।
মঙ্গলবার সকালে মমতা-অনুগত শিবিরের অপর সাংসদ কীর্তি আজাদকে নিয়ে দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে বসেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। সেখান থেকেই বিদ্রোহীদের তোপ দাগেন, “যদি রাজনৈতিক নৈতিকতা থাকে, যদি সৎ হন, তবে (নিজেদের) বলবেন না তৃণমূলের সাংসদ।” ওই বিদ্রোহীদের সাংসদ পদ ছেড়ে দেওয়ার জন্যও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে রাজ্যসভার সাংসদ পদে ইস্তফা দেওয়া বিদ্রোহী সুখেন্দুশেখর রায়ের কথাও উল্লেখ করেন কল্যাণ। সুখেন্দু যে বিদ্রোহী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল এবং দলের দেওয়া সাংসদ পদ উভয়েই ছেড়েছেন— তা বাকি বিদ্রোহীদের কাছে উদাহরণস্বরূপ বলে মনে করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ।
কল্যাণের ক্ষোভ, বিদ্রোহীদের কারও কোনও অভিযোগ থাকলে তা দলকে চিঠি বা ইমেলে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু এমন কোনও অভিযোগ দলের কাছে জমা পড়েনি বলে মনে করেন কল্যাণ। বিদ্রোহীরা কবে কখন কাকে সেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন, সেই চিঠি বা ইমেলের প্রতিলিপি প্রকাশ্যে আনার দাবি জানান তিনি। এই কথা প্রসঙ্গেই বিদ্রোহী মহিলা সাংসদদেরও নিশানা করেন তিনি। কল্যাণ বলেন, “দিদি কী সুন্দর তোমার শাড়ি বলেছে। কী সুন্দর তোমার শাড়ির পাড় বলেছে। কিন্তু কোনওদিন কোনও অভিযোগ জানায়নি।” বিদ্রোহী হয়ে ওঠা তারকা সাংসদদেরও নিশানা করেন তিনি। বলেন, “ফিল্মস্টাররা হচ্ছে সব ভিন্দেশি তারা। এদের ধারণা হল, যেহেতু পাবলিক আমাদের দেখে দৌড়ে আসে, সংসদে সবাই আমাদের পিছন পিছন দৌড়ে যাবে। কেষ্ট (অনুব্রত মণ্ডল) না থাকলে ২০০৯ সালে শতাব্দী রায় জিততে পারতেন না।”
আরজি কর-কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে বিদ্রোহী দুই চিকিৎসক-সাংসদ কাকলি এবং শর্মিলা সরকার কবে রাস্তায় নেমেছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন কল্যাণের। কাকলি এবং শতাব্দীকে বিঁধে শ্রীরামপুরের সাংসদ বলেন, “যখন উনি (কাকলি) চিফ হুইপ ছিলেন এবং শতাব্দী ডেপুটি লিডার ছিলেন, তখন অধিবেশনে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আমি জানতে চেয়েছি, তোমাদের ইনস্ট্রাকশন কী! বলে, ‘আমাদের কাছে তো কোনও ইনস্ট্রাকশন নেই। অভিষেক তো কিছু বলেনি। কাকলি ঘোষ দস্তিদার বারবার বাইরে দৌড়ে যেত। অভিষেক কী বলবে তা জেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। সময় খুব দামি। তখন আমি এবং মহুয়া নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করেছি।” উল্লেখ্য, নদিয়ার কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও বর্তমানে রয়েছেন মমতা-অনুগত শিবিরে। তাঁর সঙ্গে কল্যাণের সম্পর্ক কতটা ‘মধুর’, তা সর্বজনবিদিত। গত বছরে এক সমাজমাধ্যম পোস্টে নাম না-করে ‘নারীবিদ্বেষ’ নিয়ে কল্যাণকে নিশানা করেছিলেন মহুয়া। জবাবে কল্যাণও বলেছিলেন, “আমি সব নারীকে সম্মান করি, কিন্তু মহুয়া মৈত্রকে ঘৃণা করি।”
বিদ্রোহীদের যদি মমতা এবং অভিষেকের বিরুদ্ধে সত্যিই ক্ষোভ থাকে তবে নির্বাচনী প্রচারে দলের নেতৃত্বের হয়ে কেন এত প্রশংসা করেন তাঁরা, সেই প্রশ্নও তোলেন মমতা-অনুগত শিবিরের এই সাংসদ। কল্যাণের কথায়, “এদের সকলের ১৫ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে বলে, আজও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকতে চাইছে। এদের ক্ষমতা চাই। প্রতিমুহূর্তে ক্ষমতা চাই।” তবে বিজেপি ওই বিদ্রোহীদের দলে নেবে না বলেই মনে করেন তিনি। “বিজেপি ওদের খুব ভাল করে চেনে। আমার চেয়ে ভাল করে চেনে। বিজেপি কলঙ্কিত লোকেদের নেবে না”, বলেন কল্যাণ। বিদ্রোহীদের নিশানা করে কল্যাণ আরও বলেন, “এরা দোআঁশলা, বিশ্বাসঘাতক, গদ্দার। এরা সুখের পায়রা। কাকলি ঘোষ দস্তিদার ছাড়া সকলে ২০১১ সালের পর দলে এসেছে। এরা কেউ লড়াই করেনি।”
কল্যাণের এই আক্রমণের জবাবে কাকলিও বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না। বারাসতের সাংসদ বলেন, “আমি শুরু থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলাম। ২০০১ সালে আমি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কাউন্সিলর হিসেবে লড়েছিলাম। আমি একটি রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছি।” এর পরেই তিনি বলেন, “মেরা সর কাটেগা লেকিন ঝুঁকেগা নেহি (আমার মাথা কাটা যেতে পারে, কিন্তু আমি মাথা নত করব না)। আমি অনেক সহ্য করেছি। এই ধরনের লোকদের কথায় আমার কিছুই যায় আসে না।”
কেন তিনি ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছেন, সেই ব্যাখ্যাও দেন কাকলি। বিদ্রোহী সাংসদের কথায়, “প্রচুর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, যা আজ প্রমাণিত হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সিনেমার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভাল ছিল না। নির্দিষ্ট কিছু নেতা নিজেদের ইচ্ছামাফিক কাজ করার জন্য সরকারি আধিকারিকদের উপর চাপ দিলেন। এটা রাজ্যের উন্নয়নের জন্য অনুকূল নয়।”