ফলতায় বিজেপির জয়ের পূর্বাভাস অনেকেই দিয়েছিলেন। জয় যে বড় ব্যবধানে হতে চলেছে, তা নিয়েও সংশয় কমই ছিল। কিন্তু ভোটগণনা শেষ হওয়ার পরে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডার জয়ের ব্যবধান যা দাঁড়াল, তা ক’জন কল্পনা করেছিলেন বলা শক্ত। এক লক্ষ ন’হাজারেরও বেশি ভোটে ফলতায় জিতলেন বিজেপি প্রার্থী। কিন্তু বিজেপির জয়ের ব্যবধানের চেয়েও চমকপ্রদ হল তৃণমূলের ফলাফল। মাত্র দু’বছর আগে ‘কুখ্যাত ডায়মন্ড হারবার মডেলে’ সওয়ার হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ফলতা থেকে বিজেপি-কে এক লক্ষ ৬৮ হাজার ভোটে পিছনে ফেলেছিলেন, সেই ফলতাতেই এ বার অভিষেকের দল বিজেপির চেয়ে প্রায় এক লক্ষ ৪২ হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়ল।
ফলাফল বলছে, প্রদত্ত ভোটের ৭১ শতাংশ গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। ২০২৪ সালে ফলতায় এক শতাংশ ভোট পাওয়া সিপিএম উঠে এসেছে ১৯ শতাংশে। আর ২০২৪ সালে ৮৯ শতাংশ ভোট পাওয়া তৃণমূল নেমে এসেছে মাত্র চার শতাংশে।
২০২৪ সালে ডায়মন্ড হারবারের ভোট এবং ফলাফল নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন উঠেছিল। অভিষেক জিতেছিলেন প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার ভোটে। যথেচ্ছ বুথদখল, ভোটারদের বুথে আসতে না-দেওয়ার অভিযোগ চাপা পড়ে গিয়েছিল তৃণমূলের বিজয়রথের উড়িয়ে দেওয়া ধুলোয়। কিন্তু সেই চাপা ক্ষোভ যে ফলতা তথা ডায়মন্ড হারবারের মাটিতে ধিকিধিকি করে জ্বলন্ত ছিল তা স্পষ্ট হল রবিবার ফলপ্রকাশের পর।
ফলতায় যে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হল, সে নির্বাচনে রিগিং বা কারচুপির অভিযোগ কেউ তোলেননি এখনও। নির্বাচন কমিশন বলেছিল— অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন সুনিশ্চিত করতেই ফলতার ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোট নেওয়া হবে। সেই পুনর্নির্বাচনে যে দল দ্বিতীয় হল, সেই সিপিএমের প্রার্থী প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন, আগে ফলতায় অবাধে প্রচারের পরিবেশ ছিল না। গত ৪ মে-র পর থেকে অবাধে প্রচার করতে পেরেছেন। ভোটের দিন সাধারণ জনতাকেও মোটামুটি উৎসবের মেজাজে বুথমুখী হতে দেখা গিয়েছিল। দিনের শেষে ভোটদানের হার পৌঁছে যায় ৮৮ শতাংশের উপর।
ফল স্পষ্ট হতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘‘প্যারাশুটে নেমে সেনাপতি আখ্যা পাওয়া এক জালিয়াত, এমন কোনও অপরাধ নেই, যা সংগঠিত করেনি। নিজের অপরাধ সিন্ডিকেটকে প্রতিষ্ঠিত করতে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতেও কোনও কসুর করেনি এই বাঘের ছাল পরিহিত বেড়াল।’’ নিশানা যে অভিষেক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সহ-পর্যবেক্ষক অমিত মালবীয় লিখেছেন, ‘‘২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কী ঘটেছিল, কেউ ভোলেননি। অজস্র ভোটযন্ত্রে বিজেপির প্রতীক ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কেউ বিজেপি-কে ভোট দেওয়ার সুযোগই না পান। আজ সেই ফলতা বিধানসভাই বাস্তবটা দেখিয়ে দিয়েছে।’’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, “এই ভোটের ফলাফল প্রমাণ করছে, ভাইপোর ডায়মন্ড হারবার মডেল ছিল আসলে লুটের মডেল। এই ফলাফল প্রমাণ করছে তৃণমূল কখনওই বিজেপির বিকল্প ছিল না। বামপন্থীরাই আগামী দিনে বিজেপি-কে রোখার প্রশ্নে যা করার তা-ই করবে।”
ফলতায় গত ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিনেও (যে ভোট পরে বাতিল হয়) বিজেপির প্রতীক ঢেকে দেওয়া, বিজেপির বোতামে আতর লাগিয়ে রাখা, ভোটকক্ষে গোপন নজরদারি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা, ছাপ্পার ছবি লুকোতে সিসিটিভি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া, বিরোধী দলের সমর্থক হিসাবে পরিচিতি পরিবারগুলিকে সন্ত্রস্ত করে ভোট দিতে যাওয়া আটকানো ইত্যাদি অজস্র অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে উঠেছিল। সে সবের প্রেক্ষিতেই ফলতার ভোটগ্রহণ বাতিল করে পুনরায় ভোট নেওয়ার নির্দেশ জারি হয়।
হুগলির আরামবাগে বা পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে এক কালে সিপিএমের বিরুদ্ধে হুবহু এই ধরনের অভিযোগ উঠত। সিপিএম সে সময়ে দাবি করত, ওই সব এলাকা দলের ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’, ওই সব এলকায় ‘অপরাজেয় সংগঠন’ রয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্য জুড়ে ধাক্কা খাওয়ার পরে নিজেদের সেই তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’ বা ‘অপরাজেয় সংগঠন’-এর কোনও প্রমাণ আর সিপিএম দেখাতে পারেনি। বরং ২০১১ সাল থেকে রাজ্যের মধ্যে ওই সব এলাকাতেই সিপিএমের দশা সবচেয়ে করুণ হতে শুরু করে। আজও সেই পরিস্থিতিই বহাল।
২০০১ সাল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের সঙ্গে মোকাবিলা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের। টানটান উত্তেজনার সে নির্বাচনে কেশপুর বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী নন্দরানি ডল জিতেছিলেন ১ লক্ষ ৮ হাজারেরও বেশি ভোটে। আজ থেকে ২৫ বছর আগের সে নির্বাচনে জনসংখ্যা তথা ভোটারসংখ্যা এখনকার চেয়ে অনেকটাই কম ছিল। তাই সে সময়ের নিরিখে কেশপুরে সিপিএমের জয়ের ব্যবধান এক নজির হয়ে উঠেছিল। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, গোটা দেশেই নানা রাজনৈতিক তর্কে কেশপুরে জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের কথা উঠে আসত। অভাবনীয় রিগিং-এর দৃষ্টান্ত হিসাবে কেশপুরের ফলাফলকে তুলে ধরা হত।
আরও পড়ুন:
কেশপুরে নন্দরানির একলাখি জয়ের তিন বছরের মাথায় আরামবাগ লোকসভায় কেন্দ্রেও একই রকম ঘটনা। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হুগলি জেলার দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা অনিল বসু আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হন ৫ লক্ষ ৯২ হাজারেরও বেশি ভোটে। ভোট পড়েছিল ন’লক্ষ ৬৪ হাজারের কিছু বেশি। তার মধ্যে সাত লক্ষ ৪৪ হাজারের বেশিই গিয়েছিল সিপিএমের ঝুলিতে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সে নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যেই আরামবাগের ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বেশি। বলা বাহুল্য, সিপিএমের বিরুদ্ধে বল্গাহীন রিগিং-এর অভিযোগ সে বারও ছিল।
ফলতার ফলের সঙ্গে কেশপুর-আরামবাগের তুলনা করতে সিপিএম অবশ্য রাজি নয়। সিপিএমের একাধিক নেতাকর্মী মনে করাচ্ছেন যে, বাম জমানায় কেশপুর বা আরামবাগের নির্বাচন নিয়ে যতই বিতর্ক থাক, ফলতায় তৃণমূলের এই ফলাফলের সঙ্গে কেশপুর বা আরামবাগে সিপিএমের ফলাফলের কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ২০০১ সালের পরে, ২০০৪ সালের লোকসভা এবং ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও কেশপুরে বড় ব্যবধানে বামেরা জয় পেয়েছিল। আরামবাগেও অনিলের বিতর্কিত জয়ের তিন বছর পরে সিপিএম প্রার্থী শক্তিমোহন মালিক দু’লক্ষের বেশি ভোটে দলের জয় ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে নিজের তথাকথিত ‘গড়’ ফলতায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে বিপুল ‘লিড’ নিলেন, ২০২৬ সালের ৪ মে-র পরে তা রাতারাতি উধাও হয়ে গেল! আরামবাগে বা কেশপুরে সিপিএমের পরাজয় এত দ্রুত আসেনি।
বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক তথা বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও ভিন্ন দিক থেকে সিপিএমের আরামবাগ এবং তৃণমূলের ফলতাকে এক করে দেখতে রাজি নন। তাঁর কথায়, ‘‘এই নির্বাচনে যে কোনও কারণেই হোক আমাদের প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই স্বাভাবিক কারণেই আমরা ভোট পাইনি। ওই দুটি বিষয়কে কখনওই এক করে দেখা উচিত হবে না বলে আমি মনে করি।’’
আরামবাগ, কেশপুরে সিপিএমের যে দশা হয়েছিল, ফলতায় তৃণমূলের সেই দশাই হল। আরও দ্রুত হল। দলের এই হাল শুধু ফলতায় সীমাবদ্ধ, না কি গোটা ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র জুড়েই এই অবস্থা তৈরি হয়ে গিয়েছে, তা পরখ হওয়া এখনও বাকি। রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলছেন, ‘‘অতিরিক্ত অত্যাচারের পথ যারা নেয়, গণতন্ত্রে তাদের এই হালই হয়। বিজেপি যে জনাদেশ পেয়েছে, তা হল তৃণমূলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ রায়। এই ফলতায় তথা ডায়মন্ড হারবারে একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূল মানুষকে ভোটই দিতে দেয়নি। তার ফল তৃণমূল হাতেনাতে পেল।’’ সুকান্তের সংযোজন, ‘‘হয়তো আগামী দিনে বিজেপি-কে অনেক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়তে হতে পারে। কিন্তু বিজেপি অবাধ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই সে লড়াই লড়বে। কখনও তৃণমূলের পথ ধরে ভোট জেতার চেষ্টা করবে না।’’