×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৫ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

পুনর্দখল অভিযান

লেঠেল বাহিনী নিয়ে বাস ছুটল টালিগঞ্জ থেকে

সুরবেক বিশ্বাস
কলকাতা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৩:৩৪

দূরত্ব কম-সে–কম ছ’কিলোমিটার।

সাতসকালে টালিগঞ্জ থেকে বাসে চড়ে অতটা পথ ঠেঙিয়ে তারাতলায় পৌঁছে যায় লেঠেল-বাহিনী। ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের তরফে বন্দরের জমিতে ফের দখলদারি কায়েম করতে। তাদের হামলার সামনে বন্দরের রক্ষীদের প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।

গত রবিবারের বন্দর-কাণ্ডের কাঁটা-ছেঁড়া করতে গিয়ে এমনই তথ্য বেরিয়ে এসেছে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের নিজস্ব অনুসন্ধানে। দখলদার বাহিনীর সিংহভাগ যে টালিগঞ্জ থেকে এসেছিল, লালবাজারের একাংশও তা মানছে। ‘‘স্থানীয় কিছু লোক আর ভেঙ্কটেশের কর্মী-টেকনিশিয়ানদের কেউ কেউ তো ছিলই। তবে দুষ্কৃতীদের বড় অংশ একটাই বাসে চড়ে টালিগঞ্জ থেকে এসেছিল।’’— বলছেন এক গোয়েন্দা অফিসার। তাঁদের ইঙ্গিত, ‘অভিযানের’ প্রস্তুতি আগেভাগে মোটামুটি সেরে রাখা হয়েছিল।

Advertisement

‘অভিযানের’ শুরু থেকে শেষ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণও পুলিশের কাছে মজুত। কী রকম?

পুলিশ-সূত্রের খবর, সে দিন ছুটির সকাল ভাল করে আড়মোড়া না-ভাঙতেই মোবাইলে নির্দেশ চলে আসে টালিগঞ্জের ওই তল্লাটে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পাণ্ডাদের হাঁকডাক— ‘অ্যাই, চল সব। দেরি করিস না। জলদি তারাতলা যেতে হবে।’

হুকুম শুনে দাঁড় করিয়ে রাখা বেসরকারি বাসে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ে জনা ষাট-সত্তর ছেলে। যাদের অনেকে চারু মার্কেটের ঝালার মাঠের বাসিন্দা, কেউ থাকে আনোয়ার শাহ রোড লাগোয়া বড়বাগান বস্তিতে। ২০০৮-এর পঞ্চমীর রাতে চারু মার্কেট থানায় তাণ্ডব ও পুলিশের গাড়ি জ্বালানোয় ওদের কেউ কেউ জড়িত ছিল বলে পুলিশ-সূত্রের দাবি। তবে রবিবার সকালে তারাতলা পি-৫১ হাইড রোড এক্সটেনশনে ‘কব্জা-অভিযানে’ রওনা করার আগে ‘দাদা’ তাদের পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, কিছু লোককে হঠিয়ে শুধু জমিটা উদ্ধার করতে হবে। ফালতু ঝুট-ঝামেলার দরকার নেই, পুলিশও মাথা গলাতে আসবে না।

টালিগঞ্জ সার্কুলার রোড হয়ে বাস নিউ আলিপুরে পৌঁছলে আরও ছেলে ওঠে। পিকনিকের মেজাজে হইহই করে আরোহীরা বাকি পথ পেরোয়।

পরবর্তী কাণ্ড গত চার দিন ধরে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। হামলাবাজদের কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র দেখা যায়নি। কিন্তু বাঁশ-লাঠিধারী ‘অভিযাত্রী’দের আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষায় পোর্ট ট্রাস্টের রক্ষীরা হকচকিয়ে যান। তাঁদের চড়চাপড় মেরে কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়ানো হয়। বন্দর-কর্তৃপক্ষ যাদের উচ্ছেদ করেছিলেন, ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে জমি ফের চলে যায় তাদেরই হাতে। আর ঘটনার খবর ও ছবি সংগ্রহ করতে যাওয়া কিছু সাংবাদিক-চিত্রসাংবাদিককে আটকে রেখে দুষ্কৃতীরা বেধড়ক পেটায়, প্রাণে মারার হুমকি দিতেও ছাড়েনি।

পোর্ট ট্রাস্ট সূত্রেরও দাবি, হামলার সময়ে ঘটনাস্থলে তারাতলা ও বন্দর অঞ্চলের কিছু ‘বাহুবলী’কে দেখা গেলেও মূল দলটা এসেছিল টালিগঞ্জ থেকে। তাদের ‘অভিযানের’ নেপথ্য কারিগর হিসেবে রাজ্যের এক মন্ত্রী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন বন্দরের কিছু কর্তা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর প্রভাব রয়েছে টলিউডে। আর তাঁর পরিজনটি টলিউডের টেকনিশিয়ানদের এক সংগঠনের মাথা। বন্দর-সূত্রের দাবি: জমি ভেঙ্কটেশের হাতছাড়া হওয়ার খবর পেয়ে ওঁরা নড়ে-চড়ে বসেন। মন্ত্রীর আত্মীয়টি টালিগঞ্জ ও চারু মার্কেট এলাকার মস্তানদের জড়ো করেন। ‘বাহিনী’কে তারাতলায় পাঠাতে তড়িঘড়ি বাসের বন্দোবস্ত হয়।

প্রসঙ্গত, কিছু মহলের অভিযোগ ছিল, বন্দর-কাণ্ডে রাজ্যের আর এক মন্ত্রী ফিরহাদ (ববি) হাকিমের ঘনিষ্ঠ লোকজন জড়িত। ববি অবশ্য তা অস্বীকার করে আসছেন। এমনকী ঘটনার পর দিন তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ‘‘যা হয়েছে, ঠিক হয়নি।’’

পাশাপাশি পুলিশের দিকে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। ‘‘লেঠেলদের রওনা করার খবর পুলিশকে জানিয়েছিল সংগঠকেরা। বলে দেওয়া হয়েছিল, অপারেশন শেষ হওয়ার আগে পুলিশ যেন না পৌঁছয়।’’— মন্তব্য এক বন্দর-কর্তার। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘‘তাই পুলিশ দেরিতে এসেছে। আমরা খবর দেওয়ার পৌনে এক ঘণ্টা বাদে তাদের দেখা মেলে। ততক্ষণে জমি বেদখল হয়ে গিয়েছে।’’ যদিও লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তার দাবি, ‘‘খবর পাওয়ামাত্র পৌঁছেছি।’’

ঘটনার সময়ে পুলিশ সক্রিয় ছিল নাকি নিষ্ক্রিয়, সে সম্পর্কে না হয় বিতর্ক। কিন্তু হামলাবাজির পরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ? ব্যবস্থার উদ্যোগ যে তেমন নেই, পুলিশের অন্দরের বার্তাতেই তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। ‘‘প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, মস্তানের দল টালিগঞ্জ থেকে এসেছিল। তখন প্রশ্ন ওঠে, কারা ওদের পাঠাল? সেই প্রসঙ্গে ঢুকে আর এগোতে পারলাম না!’’— আক্ষেপ লালবাজারের এক অফিসারের।

Advertisement