Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

আইএস-এর বিরুদ্ধে কীসের যুদ্ধ এখানে, উদাসীন বাহরাইন

সুরবেক বিশ্বাস
মানামা (বাহরাইন) ০৩ মার্চ ২০১৫ ০৩:২৬

প্রথম দর্শনে কে বলবে, ন’মাস ধরে চলা এক যুদ্ধের এটা অন্যতম প্রধান ঘাঁটি! তা-ও আবার বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশের!

কী বিমানবন্দর, কী রাস্তাঘাট, কী হোটেল, ট্যাক্সিচালকের কথাবার্তা কিছুতেই বোঝার কোনও উপায় নেই যে, ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিসলভ’ নামে স্থল-জল-অন্তরীক্ষ জুড়ে পুরোদস্তুর এক সামরিক অভিযানের অনেকটাই চলছে বাহরাইনের মাটি ও সমুদ্রকে ব্যবহার করে।

এ দেশের জাতীয় পতাকায় দু’টো রং লাল আর সাদা। কলকাতা থেকে দুবাই হয়ে রবিবার বিকেলে বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে দেখা গেল, লালের উপরে সাদায় আরবি ও ইংরেজি হরফে চতুর্দিকে লেখা ‘মারহাবা’। স্বাগতম। কিন্তু বাহরাইনে নৌসেনার ঘাঁটি তৈরি করে ও বাহরাইনের সমুদ্র ব্যবহার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার সহযোগী দেশগুলো যে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তাকে এই দ্বীপরাষ্ট্রের মানুষ স্বাগত জানাচ্ছেন তো?

Advertisement

আমেরিকার পঞ্চম নৌবহর তথা মার্কিন নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কম্যান্ড-এর সদর দফতর এই বাহরাইনে। সামগ্রিক ভাবে উপসাগর, লোহিত সাগর ও আরব সাগর এবং অংশত ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দায়িত্বে রয়েছে এই পঞ্চম নৌবহর।

বাহরাইনের সমুদ্রেই নোঙর করা রয়েছে আমেরিকার এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার ‘কার্ল ভিনসন’। যে রণতরী থেকে উড়ে গিয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের খতম করতে প্রায়শই আঘাত হানছে আমেরিকার এফ-১৫ ঈগল, এফ-১৬ ফ্যালকন কিংবা এফ-এ১৮ হর্নেট-এর মতো বোমারু। প্রায় ছ’হাজার মার্কিন সেনার ঠিকানা এখন বাহরাইন।

আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটে বাহরাইনে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলি সফরে মার্কিন বিদেশ দফতরের আমন্ত্রণে এ দেশে আসা। আনন্দবাজার-সহ চারটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে ‘কে’ হোটেলে। বিমানবন্দর থেকে জমজমাট তল্লাট আল জুফের-এর এই হোটেলে ট্যাক্সিতে পৌঁছতে সময় লাগল মেরেকেটে পনেরো মিনিট। এর ঠিক পরের ব্লকেই মার্কিন নৌসেনার ঘাঁটি।

কিন্তু আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে কেমন একটা উদাসীন ভাব দেশটার মধ্যে। রেশমের মতো মসৃণ রাস্তাগুলোর বেশির ভাগ বুলেভার্ডেই সবুজ ঘাসের দু’দিক লাল-সাদা ফুলে শোভিত। এতটাই পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন দেশ এই বাহরাইন। যে দেশের ঘাঁটি থেকে প্রতিনিয়ত এমন মরণপণ যুদ্ধ চলছে, সেই দেশ এত সাজানো-গোছানো হয় কী করে! কেমন যেন মনে হচ্ছে, ‘আমেরিকা এখান থেকে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল তো আমাদের ভারী বয়েই গেছে’ ভাব বাহরাইনের সর্বত্র। ওই লাল-সাদা ফুলগুলোর মধ্যেও।

ঢাকার শরিফুল ইসলাম বাহরাইনে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন প্রায় এক যুগ। শরিফুলের কথায়, “বাহরাইনের ঘাঁটি থেকে আমেরিকা ইরাক আর সিরিয়ার বিরুদ্ধে কী যুদ্ধ করছে, সে সব নিয়ে এ দেশের আমজনতার কোনও হেলদোল নেই। রোজ বিভিন্ন ধরনের যাত্রী আমার ট্যাক্সিতে ওঠেন। কই, আমি তো কিছু টের পাচ্ছি না।” গোলপার্কের অভিজিৎ সেনগুপ্ত বাহরাইনের একটি চারতারা হোটেলে সুপারভাইজার পদে চাকরি করছেন পাঁচ বছরেরও বেশি হয়ে গেল। অভিজিৎবাবুও বললেন, “না, না, আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে বাহরাইনের সাধারণ মানুষ আদৌ ভাবিত বলে মনে হয় না।”

এমনকী, আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা নেতৃত্বাধীন জোটে যে বাহরাইনও পড়ছে, সেটাও বহু মানুষ জানেন না। অথচ গত বছর সেপ্টেম্বরে আইএস জঙ্গিদের নিকেশ করতে সিরিয়ায় হানা দিয়েছিল ১৬টি যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে দু’টি ছিল বাহরাইনের।

সাধারণ বাহরাইনিদের এই উদাসীনতার কারণের একটা ব্যাখ্যা দিলেন ইয়াসার। বছর একত্রিশের এই যুবক ব্যাঙ্ক অব বাহরাইন অ্যান্ড কুয়েত-এর ম্যানেজার পদে কর্মরত। মাসে বেতন পান দু’হাজার বাহরাইনি দিনার। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকারও বেশি।

বাহরাইনেরই নিউ ইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ফাইন আর্টস-এর স্নাতক ইয়াসারের বক্তব্য, “পরিষ্কার কথা বলছি শুনুন, উপসাগরে সমস্যা জিইয়ে রাখতে পারলে আমেরিকার আখেরে লাভ। আমাদের মতো দেশে আমেরিকা অস্ত্রশস্ত্র বেচতে পারবে, আবার আমাদের তেলের উপরেও দখল রাখতে এদের সুবিধে হবে। একই সঙ্গে ইজরায়েলের দিক থেকে আরব দুনিয়ার নজর ঘোরানো যাবে অন্য দিকে।” ইয়াসারের সাফ কথা, তাঁরা পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করেন। কে ‘নিজের ধান্দায়’ কোন যুদ্ধ করবে, সে সব নিয়ে তাঁদের ভাবার দরকার কী!

এত মানষের শিরশ্ছেদের মতো মারাত্মক ঘটনা যারা ঘটিয়ে চলেছে, তারা কি তা হলে নিন্দনীয় নয়! ইয়াসারের বক্তব্য, “আমরা কখনও আইএস-কে সমর্থন করছি না। এ সব অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু দাদাগিরি আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়!”

আরও পড়ুন

Advertisement