Review of Books

এক অনন্য সুর-ইতিহাস

সঙ্গীত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও ছিল না তাদের। প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধনে আলাউদ্দিন গড়ে তুললেন পাশ্চাত্যের ব্যান্ড-কুশলতা।

দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৬:২৩
ঐকতান: মাইহার ব্যান্ড, আশির দশকে কালীঘাট মন্দিরে।

ঐকতান: মাইহার ব্যান্ড, আশির দশকে কালীঘাট মন্দিরে।

মাইহার। সুরসাধক আলাউদ্দিন খাঁর তালিম-তরিকায় মধ্যপ্রদেশের সে শহর সমার্থক হয়ে উঠল হিমালয়ের শিখর-পেরোনো সাঙ্গীতিক উচ্চতার। এলাহাবাদ থেকে সাতনার মাঝপথে টিলা-জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট এই শহরে আলাউদ্দিনের প্রথম পদার্পণ ১৯১৮-য়। প্রথম রাজদর্শন খুব সুখকর হয়নি। কিন্তু দরবারে থাকা সমস্ত বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শিতা দেখে মহারাজ ব্রিজনাথ সিংহ গুরু হিসাবে বরণ করে নেন উস্তাদ আলাউদ্দিনকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-শেষে প্লেগের মড়ক লাগল মাইহারে। শিষ্য-মহারাজের অনুরোধে মারি-জয়ী জীবন্ত অনাথ শিশুদের নিয়ে তৈরি করলেন ‘মাইহার ব‍্যান্ড’। আলাউদ্দিন-সঞ্জাত বাদ্যবৃন্দে কলাকুশলী হিসাবে যোগ দিলেন নিতান্তই অজ্ঞ আর অনাথ কিশোর-কিশোরীর দল।

সঙ্গীত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও ছিল না তাদের। প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধনে আলাউদ্দিন গড়ে তুললেন পাশ্চাত্যের ব্যান্ড-কুশলতা। বাবা আলাউদ্দিনের রাগ-অনুরাগে ‘শিশু ভোলানাথ’-এর দল সুরঝঙ্কারে মাতিয়ে তুলল মাইহার ব্যান্ড। ব্যান্ডের যন্ত্রানুষঙ্গে প্রচলিত সেতার-এসরাজ-সারেঙ্গি-বেহালা-হারমোনিয়াম-ব্যাঞ্জো-চেলো-ঢোলক-তবলার সঙ্গী হল উস্তাদ-সৃষ্ট নবীন যন্ত্র নলতরঙ্গ। মাইহার-মহারাজ তাঁর সঙ্গীতগুরুর সঙ্গে মেতেছিলেন এক চায়ের মজলিশে। আলাপ চলছিল সুরসপ্তকের। হঠাৎই মহারাজের এক রক্ষী-সৈন্যের হাত থেকে বন্দুক পিছলে গড়িয়ে যায় সিঁড়ির ধাপে ধাপে। ক্ষুব্ধ হৃতমান মহারাজা শাস্তিবিচার করলেও সৈন্যটি রেহাই পান গুরু আলাউদ্দিনের আবদারে। গুরু আর্জি জানান আরও গোটা বিশেক বন্দুকের। রাজশিষ্য অবাক হলেও নীরবে মানলেন গুরুনির্দেশ। আলাউদ্দিনের সৃষ্টি-মেধায় খণ্ডিত বন্দুকের নানান মাপের অংশে সুরের যন্ত্র-জন্ম নিল নলতরঙ্গ। কামারশালায় রকমফের ঠোকাঠুকির ঝঙ্কারে সুরতরঙ্গের লহর বইল বন্দুক-কাটা যন্ত্রে।

সুরবাদ্যের অভিনব উদ্ভাবনের সাথসঙ্গে প্রচলিত ধ্বনিযন্ত্রের প্রকরণে আলাউদ্দিন মেলালেন রাগ-তাল-ছন্দের ধ্রুপদী বর্ণ-বহুত্ব। মহারাজের নজরানায় রাজমহলের পরিগমে উস্তাদ গড়ে তুললেন স্ত্রীর নামাঙ্কনে জীবনের স্থায়ী আস্তানা ‘মদিনা মঞ্জিল’। সেই থেকেই তাঁর সঙ্গীত-সৃজনে ঘর ও ঘরানার মহা-আলয় হল মাইহার। আগরতলার আলাউদ্দিন সুর সাধলেন মাইহারে। শৈশবের ইতিকথায় আমার জিবনী-তে (বানানটি এ রকমই ছিল) উস্তাদ উবাচ, “আমার পিতা সাধু খাঁ আগরতলাতেই সদা সর্বদা থাকিতেন। বাড়িতে যখন আসিতেন সেতার রেয়াজ করিতেন। তখন আমি শিশু। স্তন পান করি। মা বলতেন বাবার সেতার শুনে মায়ের বুকে তবলা বাজাতাম বাবা যে গৎ বাজাতেন তখনই শুনে শুনে মুখে গেয়ে গেয়ে খেলা করতাম। শিশুকালের গৎ এখনও আমার স্মরণ আছে।”

মাইহারনামা: মাইহার ব্যান্ড উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও মাইহার ঘরানার বিকাশে উত্তরসূরিরা

কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়

১০০০.০০

৯ঋকাল

শিশুকাল থেকেই বহু রাজ্যসীমা পেরিয়ে আহমেদ আলি খাঁ-ওয়াজির আলি-গোপাল চক্রবর্তী (নুলো গোপাল)-হাবু (অমৃতলাল) দত্ত-লোবো— আরও কত সঙ্গীতবিদের শিক্ষা-দীক্ষায় সরোদ-সেতার-বেহালা-সুরশৃঙ্গার তথা যন্ত্র ও কণ্ঠের বহুধা বৈভবে উস্তাদ আলাউদ্দিন একার্থ হয়ে গেলেন সঙ্গীতের। সঙ্গে সমার্থক হয়ে গেল তাঁর স্বকীয় ঘরানা— মাইহার। মাইহার ঘরানার সার্বিক সঙ্গীত-পরিক্রমা ঘিরে ‘মিথের অলিগলিতে বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনার পারম্পর্যে’ কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গ্রন্থনির্মাণ। গ্রন্থটি সঙ্গীত-ইতিহাসের প্রায়-অজানা বিস্তারের এক-একটি অধ্যায় নির্মাণ। ‘প্রাক্-আলাউদ্দিন খাঁ: ভারতীয় যন্ত্রসংগীত চর্চা’ থেকে শুরু করে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রাক্-মাইহার সাঙ্গীতিক জীবন, মাইহার ঘরানার সূত্রপাত, মাইহারে শিক্ষাদানের পর্যায়ক্রম, উত্তরপর্বে মাইহার ঘরানার বিস্তার এবং তৃতীয় প্রজন্মে মাইহারের নানান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তথা আলাউদ্দিন-পরিকর বিভিন্ন সঙ্গীতব্যক্তিত্বের সৃষ্টিবহুল ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সঙ্গে আছে তাঁর সপক্ষে সমসাময়িক রচনা-বিবৃতি-নথিপত্র-প্রতিবেদন-পত্রাবলির বাছাই সঙ্কেত, যা ইতিকথাকে তথ্যগত নির্ভরতা দিয়েছে। অধ্যায়ের সুচিন্তিত বিন্যাসে পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিভাত আলাউদ্দিন-নিয়ন্ত্রণে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলা মাইহারের সঙ্গীত-তরিকা, বাদ্যি-বাজ দস্তুরের বাঁকবদলের পন্থা।

লেখকের দাবি, “উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ... তাঁর জীবদ্দশাতেই গুরু হিসাবে প্রায় কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। ফলত, তাঁর প্রকৃত শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যা অনেক ছিল। কিছু প্রতিভার তারতম্যের কারণেই হোক বা তালিমের অপ্রতুলতার জন্য শিল্পী হিসাবে কিছু পরিচিতি পেলেও ভারতীয় সঙ্গীতের বিকাশ বা আন্তর্জাতিকীকরণে এঁদের সকলের অবদান নেই। এখানে তাঁর বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান শিষ্য-শিষ্যার নামের উল্লেখ করা হয়েছে, এবং কেবল তাঁদের সম্পর্কেই বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে উল্লিখিত অবদানগুলি লক্ষ করা যায়।” সেই সঞ্চালনে গ্রন্থকারের অধ্যায়-ক্রম ‘মাইহার ঘরানার বিস্তার: উত্তরপর্ব’। ধারাবাহী আলোচনায় সবিস্তার আলাউদ্দিন-শিষ্যকুল। গুরু-বয়ানে, “সংগীত আসে হৃদয়ের পবিত্রতম জায়গা থেকে। তারই অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে শ্রোতাদের মধ্যে।” শিক্ষা-সাধনা-পরিবেশনায় তিমিরবরণ-রবিশঙ্কর-আলি আকবর-অন্নপূর্ণা দেবী-পান্নালাল ঘোষ-নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়-যতীন ভট্টাচার্য-বিষ্ণুগোবিন্দ যোগ-রবীন ঘোষ-বাহাদুর খাঁ-আশিস খাঁ— আরও অনেক অনেক আলাউদ্দিন-উত্তরসূরির মাইহার ঘরানার জগৎ-মাতানো প্রচার-প্রসার গ্রন্থের পর্যায়ে-পর্যায়ে সুবর্ণিত হয়েছে লেখকের কলমে।

কৌশিকের কাজে চটজলদি বাজার ধরার চেষ্টা নেই। প্রামাণ্য গ্রন্থের নানা তথ্যের প্রাসঙ্গিক প্রকরণের এ এক স্বস্তিকর উদাহরণ। ইতিহাস-মার্গে প্রাক্-আলাউদ্দিন-কাল থেকে তাঁর সমসময় পেরিয়ে উত্তরকালের কালোয়াত তথা নির্মাণ-কারুকারদের দুর্লভ চিত্রাবলি, কালান্তরের সরোদ-সেতার-সুরশৃঙ্গার যন্ত্রাদির নানান রদবদলি রূপ-স্বরূপ, আলাউদ্দিন-সৃষ্ট রাগরাগিণীর বিবিধ বাণী-বন্দিশের বিরল স্বরলিপি এমনকি নাট্যসঙ্গীতের দুষ্প্রাপ্য লিপিও গ্রন্থবদ্ধ করেছেন।

তবে যন্ত্রানুষঙ্গে আলাপ-জোড়-ঝালার বাদ্যক্রম-প্রবর্তকের গুরুত্ব অনুচ্চারিত কেন? ঘটনা-বাহুল্যে পৌনঃপুনিকতার ভারে গ্রন্থটি কিছুটা ক্লিষ্ট। রয়ে গেছে কিছু মুদ্রণপ্রমাদ। এত বড় কাজে অবশ্য তা উপেক্ষণীয়। পার্থ দাশগুপ্তের অনুভবে নাছ-মলাটের পূর্ণাবয়ব আলাউদ্দিন সমুখপ্রচ্ছদে হয়তো পূর্ণতা পেত আরও বেশি। লেখকের লেখায় আলাউদ্দিন-সর্জন মাইহার ঘরানার পুরাবৃত্ত হানা দেবে প্রবীণদের মনে আর গবেষণার টানে বিস্মৃতির জগতে পরিচিত হবেন নবীনরা। মাইহারের ইতিহাস-পাঠে এই উদ্যোগ একটা শূন্যস্থান পূরণ করবে: যা আমরা অদ্যাবধি ভাবিনি, কখনও আলোকপাতও করিনি।

আরও পড়ুন