Review of Books

অতলের তলস্পর্শী অনুসন্ধান

দু’বছর ফেলে রাখার পরে বইটাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত লিখছি, ভেবে দেখলে, এই বইটার নিয়তি তো এমনই হওয়ার কথা।

অমিতাভ গুপ্ত
শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০৫

২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে অফিসের টেবিলের এক প্রান্তে পড়েছিল বইটা। তত দিনে তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদী। যত বারই বইটা নিয়ে লেখার কথা ভেবেছি, তত বারই মনে হয়েছে, এমন কী বা বলার আছে এই বইটা নিয়ে, যা এত দিনেও এই দেশ জানে না? আর, সে সব কথা জেনেও যখন তৃতীয় দফায় মোদীকে ক্ষমতায় ফেরাতে পারে এই দেশ, তখন কি এটাই ধরে নেওয়া ভাল নয় যে, সব অন্যায়ই ‘বৈধ’ হয়ে গিয়েছে দেশের নাগরিকদের একটা বড় অংশের কাছে? প্রায় পৌনে দু’বছরের দ্বিধা কাটিয়ে দিল ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের উচ্চবর্ণ, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সমাজের একটা বড় অংশের ‘বিকশিত’ হয়ে ওঠার উদগ্র বাসনা দেখে বিশ্বাস হল, ‘মোদীর গুজরাত’-এর চেহারাটা ঠিক কেমন ছিল, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার বড় রকম কারণ আছে। সেই গুজরাতে শুধু মুসলমানরা কোণঠাসা হননি, শুধু গরিবরা ভাতে মরেননি। ক্রিস্তফ জাফরেলো মনে করিয়ে দিয়েছেন, সে রাজ্যে তৈরি হয়েছিল এক ‘ডিপ স্টেট’— তার নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রের তোয়াক্কা করেনি, নাগরিকের মতামতেরও নয়।

দু’বছর ফেলে রাখার পরে বইটাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত লিখছি, ভেবে দেখলে, এই বইটার নিয়তি তো এমনই হওয়ার কথা। যদিও বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৪ সালে, জাফরেলো তা লেখা শেষ করেছিলেন ২০১৩-তে। কোনও প্রকাশক সে সময় বইটা ছাপতে রাজি হননি— তাঁদের আইনি পরামর্শদাতারা জানিয়েছিলেন, এই বই ছাপার ঝুঁকি আছে। যতখানি অংশ ফেলে দিলে তাঁরা বইটা ছাপতে সম্মত হতেন, জাফরেলো রাজি হননি তাতে। তার পরের এক যুগে নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে অজস্র বই— প্রবল প্রশস্তিসূচক থেকে কঠোর সমালোচনামূলক, সবই। জাফরেলোর নিজের বই মোদী’জ় ইন্ডিয়া প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১-এ। তার পরও এই বইটির গুরুত্ব তিলমাত্র কমেনি। বইটির বিশেষত্ব তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নয়— তথ্যের বিপুলতায়। নরেন্দ্র মোদীর ১৩ বছরের গুজরাত-শাসনের কার্যত প্রতিটি দিক সম্বন্ধে বিপুল তথ্য একত্রিত করেছেন জাফরেলো, বিবিধ সূত্র থেকে— এবং, সেগুলিকে ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠা করেছেন মোদীর ‘সুশাসন’-এর স্বরূপ। দেখিয়েছেন, ২০১৪-উত্তর ভারতে কী ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গুজরাত মডেল’। এবং, একের পর এক ঘটনার বিবরণ পাঠককে মনে করিয়ে দেবে যে, গত এক দশকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতেও বিভিন্ন মাপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গুজরাত মডেল’-এর প্রশাসনিকতা। সেই সাম্রাজ্য নতুনতর প্রান্তে বিস্তৃত হলে তার চেহারা কেমন হবে, আঁচ করা যায়। এবং, সেই অনুমান সুখপ্রদ নয় কোনও মতেই।

বইটি মোট পাঁচ পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে জাফরেলো দেখান, হিন্দু সনাতনী রাজ্য থেকে গুজরাত কী ভাবে জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের পথ বেয়ে ‘হিন্দুত্বের গবেষণাগার’-এ পরিণত হল। রাজনৈতিক হিন্দুত্বের স্বরূপ উন্মোচনে এই বিশ্লেষণ জরুরি। কোনও জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি অনুগত হওয়া মানেই যে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বিষ্ট হবে, এমন সরলরৈখিক সমীকরণ নেই— তা নির্মাণ করে রাজনীতি। জাফরেলো দেখিয়েছেন, গুজরাতে নরেন্দ্র মোদী কী ভাবে নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে বিশ্বাসকে বিদ্বেষে পরিণত করেছিলেন।

গুজরাত আন্ডার মোদী: দ্য ব্লুপ্রিন্ট ফর টুডে’জ় ইন্ডিয়াক্রিস্তফ জাফরেলো

৮৯৯.০০

কনটেক্সট

দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা সে রাজ্যে আইনের শাসন ভেঙে পড়া নিয়ে। জাফরেলো লিখছেন— “২০০২-এর দাঙ্গার পরেই মোদী সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, তারা কী ভাবে চলতে চায়: রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পরও মুখ্যমন্ত্রী বললেন, পুলিশ নিজের দায়িত্ব পালন করেছে; এবং, আইনরক্ষার দায়িত্ব থাকা পুলিশের এক জন কর্তাকেও বদলি করা হল না, বা নিলম্বিত করা হল না। বরং, কিছু অভিযুক্তের পদোন্নতি হল।” সুশাসনই বটে। দাঙ্গার সময় আমদাবাদের পুলিশ কমিশনার ছিলেন পি সি পাণ্ডে। ২০০২ সালেই তিনি দিল্লিতে সিবিআই-এর অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল পদে নিযুক্ত হলেন; তার পর ফিরে এলেন রাজ্যে, পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল পদে। অবসর গ্রহণের পরে গুজরাতের স্টেট পুলিশ হাউজ়িং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হলেন। এবং, তার পর যোগ দিলেন আদানি গোষ্ঠীতে।

‘ফেক এনকাউন্টার’ নামক অসাংবিধানিক, বেআইনি রাষ্ট্রীয় দমননীতি নিয়েও বিস্তারিত লিখেছেন জাফরেলো। সে বর্ণনা ভারত খানিক জানে। কিন্তু, এই বইয়ে জাফরেলো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি লিখছেন, “ফেক এনকাউন্টারগুলি গুজরাতিদের সর্বদাই নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বেগে রাখত, এবং মোদীকে তাঁদের রক্ষাকর্তা হিসাবে তুলে ধরেছিল— শুধু মুসলমান সন্ত্রাসবাদীদের থেকেই নয়, যারা মোদীর বিরোধিতা করে এমন সেকুলার হিন্দুদের থেকেও।” ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির যে বয়ান নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক ভাষ্যের অপরিহার্য অঙ্গ, তার মূলে রয়েছে এমন বিপদের আশঙ্কা নির্মাণ করা, এবং মোদীকে সেই বিপদ থেকে নিস্তারের একমাত্র মসিহা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’-এর যে বুলি ভক্তরা প্রাণপণে আওড়ে চলেন, তা এই প্রকল্পের মোক্ষম উদাহরণ। কী ভাবে গুজরাতের বিচারব্যবস্থার উপরেও প্রতিষ্ঠিত হল রাজনীতির পূর্ণগ্রাস, আলোচনা করেছেন জাফরেলো।

তৃতীয় পর্বে এসেছে অর্থনীতির প্রসঙ্গ— আর্থিক বৃদ্ধি বনাম উন্নয়নের দ্বন্দ্ব। ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাত’ নামক যে সম্মেলনটি মোদীকে সর্বভারতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষী জনগোষ্ঠীর নয়নের মণি করে তুলেছিল, তার সূচনার কথা অনেকেরই হয়তো মনে নেই। ২০০২-এর দাঙ্গার পরে গুজরাত বিষয়ে সর্বভারতীয় শিল্পমহলের মনোভাব বেশ নেতিবাচক ছিল। তারই প্রতিক্রিয়ায় কিছু গুজরাতি শিল্পপতি দাঁড়িয়েছিলেন মোদীর পাশে— ‘গুজরাতি অস্মিতা’র জিগির তুলে বলেছিলেন, শিল্পমহলের এই মনোভাব আসলে গুজরাতের বিরোধিতা। মোদীর পাশে থাকা শিল্পপতিদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন অম্বানী ভ্রাতৃদ্বয়, এসার গোষ্ঠীর প্রধান শশী রুইয়া, এবং তখন রাজ্যের শিল্প-মানচিত্রে নবাগত গৌতম আদানি। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁরা বিলক্ষণ উপকৃত হয়েছিলেন— জাফরেলো পরিসংখ্যান দিয়েছেন, ২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর মার্কেট ক্যাপিটালাইজ়েশন বেড়েছে ১,৩৫৭ শতাংশ; এসার গোষ্ঠীর ৪,৫০৭ শতাংশ; এবং আদানি গোষ্ঠীর ৮,৬১৫ শতাংশ। মোদী মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনই তাঁর একাধিক বিদেশ সফরে ব্যক্তিগত অতিথি হিসাবে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন গৌতম আদানি— মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেও ছবিটি পাল্টায়নি। এবং, মোদীর কার্যত প্রতিটি বিদেশ সফরের পরেই আদানি সে দেশে নতুন কোনও বাণিজ্যিক বরাত পেয়েছেন— অন্যতর প্রমাণের অভাবে আপাতত এই ঘটনাকে ‘সমাপতন’ হিসাবেই নাহয় দেখা যাক। তবে যা সমাপতন নয়, তা হল মোদীর শাসনকালে গুজরাতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাবদ আদানি গোষ্ঠী জলের দরে জমি পেয়েছে, এবং সে জমি অগ্নিমূল্যে ভাড়া দিয়েছে অন্য সংস্থাকে, তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘ইন্ডিয়ান অয়েল’ও রয়েছে। অবশ্য, জাফরেলোর দাবি যে, দুর্নীতির আনুকূল্য কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর কুক্ষিগত ছিল না— গুজরাতে জমি থেকে পরিবেশ ছাড়পত্র, সবই পাওয়া যেত নির্দিষ্ট কাঞ্চনমূল্যে; শুধু জানতে হত, সে নৈবেদ্য কোন দেবতার সামনে পেশ করতে হবে।

মোদীর আমলে গুজরাতের আর্থিক উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয়নি, জানিয়েছেন জাফরেলো। তাঁর বিদ্যুৎক্ষেত্রে সংস্কারের ফলে গ্রামীণ গুজরাতে বিদ্যুতের দাম বেড়েছিল বিপুল হারে। আবার, কর্মক্ষেত্রে বিপুল ‘ক্যাজুয়ালাইজ়েশন’ ঘটে— শিল্পক্ষেত্রে কর্মরত নাগরিক ক্রমে পরিণত হন ঠিকা শ্রমিকে। মোদীর আমলেই শ্রমিকের মজুরির নিরিখে গুজরাত পৌঁছেছিল দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন স্তরে। ‘উন্নয়ন’-এর গতি কোন দিকে, খেয়াল করা ভাল।

চতুর্থ পর্বে জাফরেলো আলোচনা করেছেন ‘মোদীত্ব’-র ধারণা নির্মাণ নিয়ে। কী ভাবে এক জন ব্যক্তি ক্রমে নিজেকে রাষ্ট্রের সমনামী করে তুললেন, সে আখ্যান মনোগ্রাহী। তবে, এ ক্ষেত্রে অন্তত দু’টি অন্য বইয়ের কথা বলতে হয়— একটি জাফরেলোরই মোদী’জ় ইন্ডিয়া, আর অন্যটি শশী তারুরের দ্য প্যারাডক্সিক্যাল প্রাইম মিনিস্টার। পঞ্চম পর্বে রয়েছে মোদীর সমর্থক, এবং বিরোধীদের কথা— ভারতীয় গণতন্ত্রকে তিনি কোন অতলে নিয়ে গিয়েছেন, তার গভীর বিশ্লেষণ।

নরেন্দ্র মোদীকে ১২ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখার পরও যাঁরা ‘সুদিন’-এর আশায় তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন, এই বইটি তাঁদের অবশ্যপাঠ্য।


আরও পড়ুন