Review of Books

সংশয় না থাকলে বিশ্বাসের প্রকৃত পরীক্ষা হয় না

প্রথাগত জিসাস-ন্যারেটিভ এবং জুদার জোশুয়া-ন্যারেটিভের মধ্যে কয়েকটি বিন্দুতে কিছু আপাত-সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী
শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৬:২৮
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

এই বইয়ের লেখক কি ঔপন্যাসিক, না কি কাহিনির সূত্র ধরে বলা চলে এক অনুলেখক? বইয়ে যে ‘আমি’ গল্প বুনে চলেন নিরলস, তিনি জুদা-ইস-কেরিয়থের বিদেহী সত্তা— আমাদেরই সমষ্টিগত ঘৃণায় তিনি অমরত্বের অভিশাপপ্রাপ্ত। তাঁর দোষ? তিনি বিশ্বাসঘাতক— জোশুয়ার ক্রুশবিদ্ধকরণের অন্যতম কারিগর। সেই জুদা (মতান্তরে জুডাস) কিছু কথা বলতে চান এতদিন পর। চার্চ-প্রবর্তিত সাদা-কালো ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’-এর বিপরীতে এক ধূসর বিকল্প ভাষ্য গড়ে তুলতে চান। তাই ‘কোনো আত্মবিস্মৃত লিখিয়ে’কে দিয়ে তিনি রচনা করছেন আরও পূর্ণতর, প্রশ্নবিদ্ধ এক আখ্যান, তাঁর স্বতন্ত্র ‘গসপেল’।

প্রথাগত জিসাস-ন্যারেটিভ এবং জুদার জোশুয়া-ন্যারেটিভের মধ্যে কয়েকটি বিন্দুতে কিছু আপাত-সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। কিন্তু তার বিস্তারে জুদার কাহিনি যে জোশুয়াকে আমাদের মনে প্রতিষ্ঠা করে, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক খ্রিস্টধর্মের বাণীপ্রধান, চিরদুঃখী জিশুর চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন: আরও বেশি রক্তমাংসের, ফলত পূর্ণতর। যে দেশে, যে ভাষায় এই উপন্যাস রচিত, সেই ভারতবর্ষ এক ‘প্রফেট’প্রবণ দেশ, এখানে পুরাণে ও গণ-ইতিহাসে বার বার অবতীর্ণ হন যুগাবতাররা। জুদার ‘জোশুয়া’র মধ্য দিয়ে সন্মাত্রানন্দ কি এ দেশের পাঠকের কাছেও ‘প্রফেট’কে এক বিকল্প দৃষ্টিতে দেখার আবেদন রাখলেন, যেখানে বাস্তববিচ্ছিন্ন উপদেশসর্বস্ব কাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থেকে তাঁরা হয়ে উঠবেন সত্যিকারের ‘সহজ মানুষ’?

ফ্যারিসিদের একচেটিয়া আধিপত্য আর রোমানদের জুলুম, আর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ফুটিফাটা হয়ে যাওয়া, মেসায়া-পাগল ইহুদি জাতির ত্রাতারূপে ঈশ্বরপুত্র জিশুর যে কালানুগ কাহিনির সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার সূত্র তো এ উপন্যাসে আছেই, তদুপরি আছে এমন আখ্যানের প্রবলভাবে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠাও। জোশুয়ার মা মিরিয়মের মর্মস্পর্শী অনুভবরাশি পৃথিবীর সমস্ত নারীর চিরায়মানা ভাবনাস্রোত; মেরি ম্যাগডালিন বা জোহানার দুঃস্বপ্নপ্রতিম পূর্বজীবন দু’হাজার বছর পার করেও খুব সুদূর বা অলীক কোনও বিষয় নয় আজকের নারীজীবনে। ক্ষমতালোভী, স্বার্থপরদের বয়ানের যেমন কোনও তারতম্য ঘটেনি জোশুয়ার সময় ও আজকের সময়ের মধ্যে, তেমনই বদলায়নি ইতিহাসের চক্রবৎ গতিপথ। জোশুয়ার কণ্ঠে জন্ম নেয় ভবিষ্যতের পৃথিবীর এক ছবি, যা পড়তে পড়তে যুগপৎ অনুভব করা যায় বর্তমান সময়ের উষ্ণতা ও শীতলতা। অবশ্য কালের সীমানা মুছে দিয়ে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে অতীতের স্বর লেখকের কলমে নতুন নয়।

জুডাস প্রণীত জোশুয়া বিষয়ক সুসমাচার

সন্মাত্রানন্দ

৬০০.০০

ধানসিড়ি

বহুলপরিচিত খ্রিস্টীয় এই আখ্যানের বিকল্পকথনের কেবল অভিনবত্বের জায়গাটিও যদি বিচার করা যায়, উপন্যাসে নজর কাড়ে ‘গুফ বানুই’ ধারণার সংযোজন। ক্রুশবিদ্ধকরণের পর জোশুয়ার ‘রেজ়ারেকশন’-এর যে কিংবদন্তি, তাকে যেন কিছুটা বাস্তবসম্মত, যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলে এই তত্ত্ব। উচ্চস্তরের সাধকের যোগৈশ্বর্য-সৃষ্ট ‘লুকঅ্যালাইক’-এরই আর এক নাম ‘গুফ বানুই’। জুদা-প্রণীত জোশুয়া-আখ্যানে এটি একটি দ্বিফলা অস্ত্র যেন— তার একটি মুখ ক্রুশবিদ্ধ জোশুয়া-সত্তাকে আরও রহস্যমেঘাবৃত করে, অন্যটি জুদার প্রশ্নাতুর মনে যুক্তির ‘আফিম’রূপে কাজ করে। প্রসঙ্গত, জোশুয়ার জীবনচর্যার আড়ালে জুদাই হয়ে ওঠেন কাহিনির মুখ্য চরিত্র, আমাদের একান্ত আপন। তাঁর চির-সংশয়ী, সন্দিগ্ধ মন যেন আমাদেরই প্রতিরূপ। প্রশ্নহীন আনুগত্য জুদার পথ নয়, তাই জোশুয়ার ‘অন্য অন্য ঘরের কথা’র সব ক’টিকে তিনি গ্রহণ করতে পারেন না; প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেন নিজেকেই। এতে নিজে ক্ষতবিক্ষত হলেও তাঁর প্রতি জোশুয়ার অকৃত্রিম ভালবাসা দেখে সিদ্ধান্তে আসেন— “বিশ্বাস… সংশয়কেই বিশেষভাবে ভালোবাসে। সংশয় না-থাকলে বিশ্বাসের পরীক্ষা হয় না।” জুদার সঙ্গে আমাদেরও বিশ্বাসের ঘরে পৌঁছনোর পথটি আগুনে পুড়ে সোনা হয়ে ওঠে।

দেশ-কালের অতীত যে সত্য মানবাত্মার পরম ধন, তা-ই যুগে যুগে প্রতিধ্বনিত দ্রষ্টাদের কণ্ঠে। হয়তো সে কারণেই র‍্যাবাই জোশুয়াকে কেন্দ্রে রেখে তাঁর ভাবকে রূপ দিয়ে চলে বহু শতাব্দী আগের ও পরের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত। জুদা-বর্ণিত জোশুয়ার সমাধি-পরবর্তী অবস্থার সঙ্গে মিলে যায় শ্রীরামকৃষ্ণের অর্ধবাহ্যদশা। জোশুয়া যখন তাঁর শিষ্যদের বলেন সবারই বুকের মধ্যে আছে অনন্ত স্বর্গরাজ্য, মনে পড়তে পারে কথামৃতের উচ্চারণ: ‘অন্তরে সোনা আছে, খবর পাও নাই।’ ভিন্ন সময়ের দুই কণ্ঠে একই ঈশ্বর যেন বলে উঠছেন: কত লোক কাম, খ্যাতি, ধনসম্পদে পাগল হচ্ছে, ‘তুই নাহয় আমার জন্যে পাগল হবি।’ সেই ঈশ্বরই কখনও জোশুয়ার কণ্ঠে বলেন, ‘তুই সব ছেড়ে আমার উপর নির্ভর কর’, কখনও গীতায় বলেন ‘সর্বধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’।

তবে শেষাবধি আখ্যানেরও ঊর্ধ্বে লেখক এক সচেতন প্রশ্ন রাখেন পাঠকের প্রতি: মহামানবের জীবনে কোনটি প্রণিধানযোগ্য? তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা নানা লৌকিক-অলৌকিক গল্প? নাকি মানবতা ও সত্যের পক্ষে তাঁর আজীবন সংগ্রাম? কাহিনিতে এই প্রশ্ন জোশুয়া রাখেন জুদার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের মনে পড়ে যায় আলাসিঙ্গা পেরুমলকে লেখা চিঠিতে শ্রীরামকৃষ্ণ-বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি, “ওয়ার্ক ফর দি আইডিয়াল, নট দ্য ম্যান।” জোশুয়া ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরেও কী ভাবে নবজন্মপ্রাপ্ত হলেন, হজরতকে গাব্রিয়েল দেখা দিয়েছিলেন কি না, বাবরি মসজিদ সত্যিই রামজন্মভূমির উপরেই নির্মিত কি না— এ-সব আলঙ্কারিক নিরর্থক তর্কে প্রবৃত্ত হওয়ার চেয়ে তাঁদের জীবনচর্যা ও আদর্শের পাঠ ও প্রয়োগ জরুরি।


আরও পড়ুন