Book Review

‘শান্ত নদীটি, পটে আঁকা’

‘প্রাণের বহবান’ ধারা নানা নামে ছিল আমাদের কাছে আপনার। নদীপাড়ের মানুষেরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তার প্রিয় নদীকে ডেকেছিল শ্বেতকৌষিকী (শ্বেত কোশি), সুন্দরীতমা (গোদাবরী), চিরজীবতী, এমন সব নামে।

সুপ্রতিম কর্মকার
শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৮

ছোটবেলা থেকেই শিশুমনে এঁকে দেওয়া হয় নদী নিয়ে ধারণা। সাত সমুদ্র তেরো নদীর গল্পগুলো মা-ঠাকুমার মুখে যখন কোনও শিশু শোনে, স্মৃতিপটে আঁকা হয়ে যায় নদী নিয়ে কল্পনার ছবি। যত সে বড় হয়, সেই কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের নদীর মিল খুঁজতে চায়। সেখানেই হয় ছন্দপতন। এমন অমিল হওয়ার তো কথা ছিল না!

‘প্রাণের বহবান’ ধারা নানা নামে ছিল আমাদের কাছে আপনার। নদীপাড়ের মানুষেরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তার প্রিয় নদীকে ডেকেছিল শ্বেতকৌষিকী (শ্বেত কোশি), সুন্দরীতমা (গোদাবরী), চিরজীবতী, এমন সব নামে। এমন সব প্রাণপ্রবাহিণী জীবনধারাকে আমরা ভাল রাখতে পারলাম না, নদীর জলকে বড় বাঁধের আগলে বেঁধে শাসন করতে চাইলাম। বন্যাকে শুধুই ক্ষতিকর ভেবে তাকে আটকাতে চাইলাম। বন্যা ভারতের মাটিতে নতুন ঘটনা নয়। প্রায় পাঁচশো কোটি বছর ধরে গঙ্গা-সিন্ধু-ব্রহ্মপুত্র ও তাদের উপনদীদের বয়ে আনা বন্যা ও পলিতেই এই বঙ্গভূমি ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের নির্মাণ। এমন সব নানা নদীজীবনের কথাতেই সেজে উঠেছে জয়া মিত্রের বইটি, যাঁর নাম নদী বিষয়ে চর্চার জগতে সসম্মানে উচ্চারিত হয়। নদী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে যিনি সমধিক পরিচিত ‘জলতুতো দিদি’ হিসাবে।

বৃষ্টিজল আর নদীজলের মধ্যে রয়েছে এক গভীর আন্তঃসম্পর্ক। এর গুরুত্ব কৃষিসভ্যতার ভারতভূমির মানুষেরা বুঝতেন দু’হাজার বছর আগে থেকেই। আজও গ্রামবাংলায় বর্ষার আগে জ্যৈষ্ঠের তীব্র গরমের দিনগুলোকে বলা হয় ‘নওতপা’। এ ছিল বর্ষার জন্য প্রার্থনার নয় দিন। সেই মানুষেরা জানতেন, নয় দিন তীব্র গরম সহ্য করলে আষাঢ়ের বর্ষণধারা বন্যা আনবে নদীতে, সঙ্গে ‘নদী বয়ে আনবে সৌভাগ্য’। ভারত জুড়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন বৃষ্টির অঞ্চল ও ভূমিরূপ। এ দেশে ভূ-পরিবেশের সঙ্গে মানিয়েই জল ব্যবহারের নানা পদ্ধতি ছিল। জলের ক্ষেত্রে ‘কর্তব্য ও অকর্তব্য’ দেশের মানুষদের অজানা ছিল না। এক কথায় নদীজপমালার ভারতে ভারতবাসীরা ছিলেন ‘জলসভ্য’। ছোট নদীর কাছ ঘেঁষে বসত, বড় নদীর কাছে খেত ও বসত। বসত তৈরি হত নদীর প্লাবনভূমিকে ছেড়ে। নদীর পাড়ে থাকা মানুষেরা চার-পাঁচ দশকের আগেও বন্যাকে সমস্যা হিসাবে দেখতেন না। চাষের ও বন্যার জলের জায়গা ছেড়ে নদীর কাছে বসতি গড়তেন।

জলমঙ্গল

জয়া মিত্র

২৯০.০০

প্রাচ্য পাশ্চাত্য

ভারতভূমিতে অনস্বীকার্য গঙ্গার অবদান। গঙ্গা কেবল এক নদী নয়, তার ধারা বিশ্বাস ও জলসমষ্টির নাম। গোমুখের হিমবাহ থেকে জন্ম নিয়ে গঙ্গাসাগরে এসে সমুদ্র ছোঁয়া পর্যন্ত ২৫২৫ কিলোমিটার এই দীর্ঘ পথের জলধারায় মেশে একাধিক নদী। উত্তর ভারতের সাতটি প্রধান নদী যাত্রাপথে গঙ্গায় মিলিত হয়। এই দেশ গঙ্গা নদীকে নিয়ে প্রকৃত অর্থে যাপন করে। তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। হিমাচল, উত্তরাখণ্ড অঞ্চলের যে কোনও স্রোতোধারাকে গঙ্গা বলে উল্লেখ করা হয়: বিষ্ণুগঙ্গা, লক্ষ্মণগঙ্গা, কেদারগঙ্গা, ফুলগঙ্গা, বিরহীগঙ্গা তার উদাহরণ। গোদাবরী হল ‘দক্ষিণের গঙ্গা’, মহানদী ও কৃষ্ণার গভীরতম অংশকে বলে ‘পাতালগঙ্গা’। কাবুল নদীর প্রাচীন নাম কুভা, আফগানিস্তানের পুরনো বইপত্রে কোথাও কোথাও তাকে বলা হয়েছে ‘কুভাগঙ্গা’।

বাংলার মানুষ নদীকে ব্যবহার করতে জানতেন। ছোট ছোট নদীগুলোকে সুখা মরসুমে কৃষকেরা ব্যবহার করতেন। আশপাশের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ছোট নদীর বুকে আড়াআড়ি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হত, কাদামাটি ও ঘাস দিয়ে। বৃষ্টির জল নদীপথ ধরে গড়িয়ে অস্থায়ী বাঁধের উজানে জমা হত। সেই জমে ওঠা জলই সেচের কাজে ব্যবহার করতেন স্থানীয় কৃষকের। বড় নদীগুলোয় কোনও বাঁধ দেওয়া হত না। বড় নদীর জল কাছাকাছি এলাকা পর্যন্ত খাল কেটে নিয়ে যাওয়া হত। বন্যার জল ব্যবহারের নানা রকম নদী-উপযোগী পদ্ধতি জানতেন আমাদের পূর্বজরা। নদীর চলার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার কারণেই বন্যাতে তত ক্ষয়ক্ষতি হত না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বা তার পর থেকে এ ব্যবস্থার ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। ঔপনিবেশিক ধারণার উপরে ভিত্তি করে শুরু হয় পাড় বাঁধ, রিং বাঁধ দিয়ে নদী শাসন। ফলাফল নদী ও নদীতীরের মানুষের অন্তহীন দুর্দশা। এই কথাগুলোই লেখিকা তুলে ধরেছেন চমৎকার ভাবে, তাঁর ‘নদী শিক্ষা’ নদীপাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতার স্পর্শে ঋদ্ধ যে!

বইটির দু’টি পর্ব। প্রথমটির শীর্ষক ‘নদী ও বাঁধ’, সেখানে ২৩টি নিবন্ধ। দ্বিতীয় পর্বের শীর্ষক ‘দীঘি-পুকুর’, রয়েছে ১০টি নিবন্ধ। দ্বিতীয় পর্বে এসে আমাদের একটু থমকে যেতে হয়। বাংলায় পুকুর তৈরি বরাবর পুণ্যকাজ বলেই বিবেচিত হত। বাংলা জুড়ে ঘুরলে দেখা যেত, প্রত্যেকটি গ্রামে অনেকগুলো করে পুকুর। কিছু পুকুর থাকত বারো মাস জলে ভর্তি। আবার কোনও পুকুর ফাল্গুন মাসেই শুকিয়ে যেত। বাংলার মানুষেরা চড়কের পুজোর আগে পুকুরের পাঁক কাটিয়ে খেতের উপরে সেই মাটি ফেলতেন, তাতে চাষের জমি উর্বর হত। পুকুরের পাঁক কাটার আগে উৎসবের মতো সবাই মেতে উঠতেন ‘পুকুর ঘোলা’ করতে। দল বেঁধে অনেকে মিলে পুকুরে নামা হত; হুড়ো পাড়া, ঝাঁপান-ঝাঁপাই করে পুকুরের জল ঘোলা করা হত। পুকুরে থাকা মাছগুলোও ধরা পড়ত তাতে। গ্রামের ভূস্বামীরা কিংবা গ্রামের মানুষেরা এই কাজটি করতেন। লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা যেগুলোকে নষ্ট করল তার মধ্যে ছিল গ্রাম-সমাজের সঙ্গে ভূস্বামীদের জলাশয় রক্ষণাবেক্ষণের বন্ধুতার সম্পর্কটিও। যে পুকুরকে আমরা অবহেলা ও অযত্নে রাখি, সেই জল যে আমাদের বড় কাছের বন্ধু, নিবন্ধগুলো সে কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরে। বাড়ির পাশের পুণ্যিপুকুর কিংবা মণিপুরের নুংজেম পোখরি— ভারতবর্ষের পুকুরগুলো এমন ভাবেই ভাস্বর হয়ে উঠেছে লেখিকার লেখায়।

এক কথায় এই বই— নদী ও জলকে ভালবাসতে শেখানোর বই। বইয়ের শেষে সংযোজিত নির্দেশিকা, তার প্রচ্ছদ ও বাঁধাই সুন্দর। জলের মঙ্গল কামনার এ রকম বই পাঠকের আগ্রহকে বাড়িয়ে দেবে নদী ও পুকুর নিয়ে— এই ভরসাটুকু এই বইয়ের উপরে রাখাই যায়।

আরও পড়ুন